”বলাই তোদের ক্লাবে দিলীপ কর নামে একটা ছেলে খেলে, ওর বাবাকে চিনিস?”
বলাই অবাক হল, এমন একটা প্রশ্ন প্রতাপ প্রথমেই করায়।
”ব্যাপার কী বল তো হঠাৎ দিলুর খোঁজ? ওকে তোদের ক্লাবে নিতে চাস বুঝি?”
”না, না, তেমন কিছু নয়, মানে—” প্রতাপ বলাইয়ের কৌতূহলটায় বিব্রত হয়ে পড়ল। তার এই খোঁজ নেওয়ার আসল কারণটা জানাজানি হয়ে গেলে অনেক ক্লাবই দিলুর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে এটা সে জানে।
”তুই ওকে খেলতে দেখেছিস?” বলাই চোখ সরু করে তাকাল।
”না।”
”তা হলে ওর সম্পর্কে ইন্টারেস্ট নিচ্ছিস কেন?” বলাইয়ের ভ্রূ কুঁচকে উঠল।
”ওর ফিল্ডিং প্র্যাকটিস দেখেছি।” যা বলতে চায়নি অবশেষে প্রতাপ সেটাই বলে ফেলল।
”আহহ তাই বল। প্রতাপ লাহিড়ি কেন দিলুর বাবার খোঁজ নিচ্ছে এবার সেটা বুঝতে পারলুম। ওর বাবা তরুণ কর খুব বড় উকিল, প্রচুর পয়সা, থাকে এগারো নম্বর রিপন রো—এ, পাশের পাড়ায়। দিলু পড়াশুনোয় একদমই ব্রাইট নয়, ওর বাবা তাই খেলাধুলোর ওপর হাড়ে চটা। আমরা তো ওকে টিমে নিই শুধু ওর ফিল্ডিংটার জন্য। অন্তত তিনটে ক্যাচ নেবে কি রান আউট করবেই। যদি একটু ধরে ব্যাটটা করতে পারে তা হলে খুব তাড়াতাড়ি উঠে আসবে।”
প্রতাপ উঠে পড়ল। তার যা জানার জানা হয়ে গেছে, এবার তাকে তরুণ করের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তালতলায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে সময় কাটিয়ে রাত আটটা নাগাদ সে পৌঁছল রিপন রো—এ দিলুদের বাড়ি। সেখানে চারজন মক্কেল তখন অপেক্ষা করছে। তরুণ করের ক্লার্ক জানাল, ঘণ্টাখানেকের আগে দেখা করা সম্ভব হবে না। প্রতাপ একটা চেয়ারে হতাশ হয়ে বসে পড়ল। ঘরের দরজা দিয়ে বাড়ির অন্দর থেকে বেরিয়ে সদর দরজায় যাওয়ার পথটা দেখা যাচ্ছে, প্রতাপ সেইদিকে তাকিয়ে আকাশ—পাতাল ভেবে যাচ্ছে।
একসময় বাড়ির ভেতর থেকে দু’জন মহিলা বেরিয়ে সদর দরজার দিকে গেলেন। প্রতাপ শুনতে পেল—”খুব ভাল লাগল, কতদিন পরে এলে, আবার কিন্তু এসো।” দামি জরিপাড় হলুদ শাড়ি পরা মহিলা অন্দরের দিকে ফিরে যাচ্ছেন, প্রতাপের মনে হল ইনি এ—বাড়ির গিন্নি, দিলুর মা। সে লাফ দিয়ে ঘরের বাইরে এসে বলল, ”আপনি কি দিলুর মা?’
মল্লিকা ঘুরে অবাক হয়ে বললেন, ”হ্যাঁ, আপনি?”
নমস্কার করেই প্রতাপ তাড়াতাড়ি বলল, ”আমি দুধঘাট থেকে আসছি, হরিসাধনবাবু, পঞ্চাননবাবু আমাকে ভালই চেনেন। আমি আপনার কাছে একটা আর্জি নিয়ে এসেছি দিলুর সম্পর্কে।” এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলার পরই তার মনে পড়ল নিজের পরিচয়টা দেওয়া হয়নি। ”আমার নাম প্রতাপ লাহিড়ি, আমি দুধঘাট স্কুলের মাঠে ক্রিকেট কোচিং করি।”
মল্লিকাকে কৌতূহলী দেখাল, ”দিলুর সম্পর্কে কী বলবেন?”
”আপনার ছেলে অসাধারণ প্রতিভাবান। ওর মতো ফিল্ডার পৃথিবীতে এখন আছে কিনা আমার জানা নেই।” প্রতাপের স্বর গদগদ পর্যায়ে পৌঁছল। ”ওকে আমাদের ক্লাবে খেলাতে চাই।”
”আপনি ঘরে এসে কথা বলুন।”
তরুণের চেম্বারের পাশের ঘরের দরজা খুলে ধরল মল্লিকা। কার্পেটে—সোফায় সাজানো বসার ঘর। দু’জনে মুখোমুখি বসল।
”আর্জিটা কী?” মল্লিকা সোজাসুজি কথা পাড়লেন।
”দিলুর ক্রিকেট ভবিষ্যতের কথা ভেবে বলছি ওকে এখানে না রেখে মামার বাড়িতে রাখুন। ওখানে খেলার ব্যবস্থা আর সুযোগ কলকাতার চেয়ে অনেক ভাল।”
”আমি আর দিলুর বাবা চাই আমার দাদা, জ্যাঠামশাইয়ের কাছে দিলু থাকুক, তবে শুধুই লেখাপড়ার জন্য, খেলার জন্য নয়। ওখানে গিয়েও যদি এখানকার মতো দিনরাত খেলা—খেলা করে তা হলে যাওয়ার কোনও মানেই হয় না। লেখাপড়ায় দিলু ভাল নয়, আর দুধঘাট স্কুলের সুনামের কথা আমরা জানি। দাদাও চান ওকে লেখাপড়া শেখার জন্য ভর্তি করে নিতে। হয়তো দিলু পৃথিবীর সেরা ফিল্ডার, জানি না কী দেখে পৃথিবীর সেরা বলে দিলেন, তবু মুখ্যু সেরা—ফিল্ডারের বাবা—মা হতে আমরা চাই না, ধরে নিতে পারেন এটা ওর বাবারও কথা। এবার আপনি আসতে পারেন।” মল্লিকা উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানালেন। ওঁর দৃঢ় স্বর আর কঠিন ভঙ্গি প্রতাপকে আর কথা বাড়াতে সাহস জোগাল না।
কিন্তু প্রতাপ নাছোড়বান্দা। তার ধারণা, সে একটা বিরাট উপহার ভারতকে দিতে পারবে, দিলুর অবিশ্বাস্য ফিল্ডিং প্রতিভাকে তুলে ধরে। বাবা—মায়ের আপত্তিকে যেভাবেই হোক পাশ কাটিয়ে দিলুকে ময়দানে নামাবে এই প্রতিজ্ঞা করে প্রতাপ পরদিনই দেখা করল পঞ্চাননের সঙ্গে।
বিকেলে দোতলার বারান্দায় বসে দু’জনে যখন কথা বলছিল দিলু তখন স্কুলের মাঠে ফিল্ডিং অনুশীলন করায় ব্যস্ত।
”মলু বলল, মুখ্যু সেরা—ফিল্ডারের মা—বাবা তারা হতে চায় না, তা হলে কী হতে চায় সেটা কি বলেছে?” পঞ্চানন শীতল দৃষ্টিতে প্রতাপের দিকে তাকালেন।
”না, সেটা স্পষ্ট করে বলেননি, তবে বলেছেন, শুধুই লেখাপড়া করুক এটাই তিনি চান, আর সেজন্যই ওকে এখানে রাখতে রাজি।”
”লেখাপড়া বলতে আমরা যা বুঝি তা হল একটা ভাল চাকরি পাওয়া, নয়তো কোনও পেশায় যাওয়া। লক্ষ্যটা টাকা রোজগার, এর বাইরেও অবশ্য কেউ কেউ ব্যবসা—বাণিজ্য করে। কিন্তু লেখক হয়ে, গান গেয়ে, সেতার কি তবলা বাজিয়ে, ছবি এঁকে, মূর্তি গড়ে এমনকী খেলাধুলো করেও যে প্রচুর টাকা, নাম যশ খ্যাতি অর্জন করা যায়, এটা আর বাবা—মায়ের মাথায় ঢোকে না। এইসব লোকেদের কিন্তু আমাদের খুব দরকার। দিলুর মতো ছেলেদের তো এগিয়ে দিতে হবে, ওরা যা হয়ে উঠতে চায় তাই হয়ে উঠুক। দেখো বাবা, আমি কিন্তু মলুর চিন্তার সঙ্গে একমত নই। আমি পুরনো ধারার মানুষ কিন্তু মলু তো দেখছি একেবারে মান্ধাতার আমলে পড়ে রয়েছে, কী যে লেখাপড়া শিখল!” পঞ্চানন মাথা নামিয়ে আক্ষেপে নাড়লেন।
