পঞ্চানন শান্তস্বরে বললেন, ”বুঝলাম, তা আমার কাছে কেন, আমি তো আর ব্যাট করব না।”
”ওকে আমার ক্লাব উত্তরপল্লীতে খেলাতে চাই। ক্লাবটা বরানগরে। ফার্স্ট ডিভিশনে গড়ের মাঠে খেলে। বাচ্চচা ছেলে, ওর অভিভাবকদের অনুমতি নেওয়া উচিত বলে মনে হল, তাই আপনার কাছে এসেছি। বেশিরভাগ বাবা—মাই তো পড়াশুনো ফেলে খেলাধুলো পছন্দ করেন না।”
”আমি ওর বাবা নই, মা’ও নই। তুমি তাদের কাছেই যাও।”
”ছেলেটিকে আমি এখানে রাখতে চাই। এখানকার এত ভাল মাঠ, অফুরন্ত প্র্যাকটিসের সুযোগ, আর এত ছেলে, এ—সবই সম্ভব হয়েছে দুধঘাট স্কুল আর তার হেডমাস্টারের জন্য। এই স্কুল তো কলকাতার কোনও স্কুলের চেয়ে লেখাপড়ায় কম নয়। আমি বলি কী, দিলু মামার বাড়িতে থেকে পড়াশুনো করুক আর ক্রিকেটটা কলকাতায় আমার ক্লাবের হয়ে খেলুক।” প্রতাপ হাত জোড় করে প্রার্থনার ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল।
পঞ্চাননের ঠোঁটে একচিলতে হাসি খেলে গেল। বললেন, ”দিলু যদি এখানে থাকে তা হলে আমি খুশিই হব, কিন্তু ওর বাবা—মা সেটা চাইবে কিনা তা আমি জানি না। আমার ছেলের সঙ্গে কথা বলে দেখতে হবে।”
যাওয়ার আগে প্রতাপ বলে গেল, ”আমি কলকাতায় গিয়ে দিলুর বাবার সঙ্গে কথা বলব।”
একটু পরেই দিলু ফিরল। দাদুকে বেগুন খেতে টুলে বসে থাকতে দেখে সে কৌতূহলে এগিয়ে গেল। রিদু উবু হয়ে খুরপি দিয়ে গাছের গোড়ার মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে সরে যাচ্ছে করলার মাচার দিকে।
”তুমি নাকি অসাধারণ ফিল্ডিং করো, মাঠের যেখান—সেখান থেকে বল মারো স্টাম্পে!” পঞ্চানন বললেন, ”অবিশ্বাস্য কাণ্ড করেছ স্কুলের মাঠে।”
দাদু এরই মধ্যে জেনে গেছে, তার মানে ইতিমধ্যেই প্রতাপদা এসে বলে গেছে। দিলু প্রশংসা শুনলে আড়ষ্ট বোধ করে, লজ্জাও পায়। প্রসঙ্গ ঘোরাবার জন্য বলল, ”দাদু, ওই কুমড়ো দুটো তো পেকে গেছে, কাটবে না?”
পঞ্চানন মুখ ফিরিয়ে করলার মাচার নীচে কুমড়োদুটোর ওপর চোখ রাখতেই চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। মাচা থেকে একটা সাপ ঝুলছে, ফণা তুলে রয়েছে রিদুর মাথার একহাত ওপরে। রিদু পাশের বেগুনগাছের দিকে সরার জন্য নড়লেই ছোবল মারবে।
দাদু কথা না বলে একদৃষ্টে সামনে তাকিয়ে রইল কেন জানার জন্য দিলুও তাকাল। সাপটার ফণা অল্প অল্প দুলছে। শিরশির করে উঠল তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত। সাক্ষাৎ যম রিদুদার মাথার ওপর।
”গোখরো।” পঞ্চানন ফিসফিসিয়ে বললেন, তারপর কুড়ি হাত দূরে উবু হয়ে বসা রিদুকে চাপা গলায় হুঁশিয়ার করলেন, ”রিদু যেমনটি আছিস ঠিক তেমনিই থাক, নড়বি না, তোর মাথার ওপর সাপ ঝুলছে।”
শোনামাত্র নিথর হয়ে গেল রিদু। বছর চল্লিশ বয়স। জীবনে সে অনেক সাপের মুখোমুখি হয়েছে। সে জানে এইরকম মুহূর্তে কী করতে হয়। দিলু জানে সাপের কান নেই, কিন্তু চোখ আছে, শুনতে পায় না কিন্তু দেখতে পায়। সে নীচে তাকিয়ে পায়ের কাছে দেখতে পেল একটা শক্ত মাটির ঢেলা। খুব ধীরে ধীরে হাঁটু ভেঙে ডান হাতটা নামিয়ে কুড়িয়ে নিল ঢেলাটা। স্ট্রোক নেওয়ার আগে ব্যাট পেছনে তোলার মতো সাপটা ফণা একটু পিছিয়ে নিল। পঞ্চানন একদৃষ্টে সাপের দিকে তাকিয়ে, তার কণ্ঠনালী নড়ে উঠল ঢোক গেলার জন্য। দিলু মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে চোখের কোণ দিয়ে তাকাল একবার, আর মুহূর্তের মধ্যে বাঘের লাফের মতো ঝলসে উঠল তার ডান হাত।
দু’হাত লম্বা সাপটা ছিটকে পড়েছে জমিতে, রিদুর সামনে। ছটফটাচ্ছে, পাকিয়ে পাকিয়ে মোচড়াচ্ছে শরীরটা। মাথাটা থেঁতলে রক্তাক্ত। পঞ্চানন তাকিয়ে রইলেন নাতির দিকে, ঢেলাটা যে সাপের মাথায় লাগল সেটা তিনি দেখেছেন এবং কে সেটা ছুড়ল তাও বুঝেছেন, তাঁর মুখে কথা সরল না। দিলুর মুখ নির্বিকার।
”রিদু, তুই যমের বাড়ি থেকে ফিরে এলি।” পঞ্চাননের মুখ দিয়ে বেরোনো এটাই প্রথম কথা। রিদু বাঁশের একটা খেটো দিয়ে সাপটাকে পিটিয়ে মারতে মারতে বলল, ”বড় কত্তা, সাপের এমন দশা হল কী করে বলো তো? খুব বাঁচা বেঁচে গেছি, এ তো গোখরো সাপ গো।” রিদু শিউরে উঠল।
দিলু বলল, ”দাদু, বাসু বাড়ি চলে গেছে, আজ আমি একাই পুকুরের ওপারে যাব।” এই বলে সে ছুটে বাড়ির মধ্যে চলে গেল।
পঞ্চানন রিদুকে বললেন, ”বাড়ি যা, আজ আর কাজ করতে হবে না। পরে বলব সাপটার দশা এমন হল কী করে।”
তেল মাখতে মাখতে দিলুকে পুকুরঘাটের দিকে যেতে দেখার পর বাড়িতে এসে পঞ্চানন সুলেখাকে বললেন, ”বউমা, আজ দুটো রহস্যের সমাধান করেছি, সেই লাল গুণ্ডার অজ্ঞান হওয়ার, আর গাছ কাটতে কাটতে লোকটার পরে যাওয়ার। বাড়ির বাইরের কাউকে যদি না বলো, হষ্যকেও নয়, তা হলে রহস্যটা ফাঁস করতে পারি।”
সুলেখা কথা দিলেন, কাউকে কিছু বলবেন না। পঞ্চানন তখন পুত্রবধূর কানে কানে বললেন, ”এসব দিলুর কাণ্ড।” তারপর তিনি বউমাকে জানালেন প্রতাপের কাছে যা শুনেছেন আর নিজের চোখে সাপটাকে যেভাবে মরতে দেখেছেন তার বিবরণ। অবশেষে বললেন, ”আমার এখন মনে হচ্ছে আগের ঘটনা দুটোও দিলুর কীর্তি। লেখাপড়ায় ওর মন নেই। শুধু ক্রিকেট খেলতে চায়, তাই খেলুক। প্রতাপ চাইছে ওকে এখানে এনে পড়াশুনো করাতে, তাই করাব।”
প্রতাপ একটা দিনও দেরি করতে রাজি নয়, পরের দিনই সে কলকাতায় গিয়ে বলাই মিত্তিরের খোঁজ নিল অ্যালবার্ট স্কোয়ারে। সেখানে একটি ছেলে বলে দিল তার বাড়িটা কোথায়। সে বাড়িতেই বলাইকে পেয়ে গেল। তাদের পরিচয় বহুদিনের। বলাই একসময় কালীঘাট ক্লাবে কয়েক সিজন উইকেট কিপিং করেছে, প্রতাপও তখন কালীঘাটে।
