প্রতাপের মুখ গম্ভীর থমথমে হয়ে উঠল উত্তেজনা চাপার চেষ্টায়। হাতের আঙুল কাঁপছে। একটা অসাধারণ আবিষ্কার তার চোখের সামনে। মনে মনে বলল, বারোবার পরীক্ষায় এগারোটাতে সফল, এটা কি আবিষ্কার নয়? বাংলা কি ভারত ছেড়েই দিলাম, পৃথিবীতেও কি একটা এমন ফিল্ডার এখন আছে? জন্টি রোডস। দুর, দুর বারোটায় বড়জোর পাঁচটা কি ছ’টা লাগাতে পারবে। ছেলেটাকে হাতছাড়া করা যাবে না। ও বোধ হয় জানে না কী ঈশ্বরদত্ত প্রতিভা ওর মধ্যে রয়েছে। দিলুর সঙ্গে সে কথা শুরু করল:
”কলকাতায় তুমি থাকো কোথায়??”
”মৌলালিতে।”
”কোনও ক্লাবে কি খেলো?”
”অ্যালবার্ট স্কোয়ারে বিজয়ী সঙ্ঘ ক্লাবে।”
”ওখানে বলাই মিত্তির আছে না?”
”হ্যাঁ। বলাইদা আমাদের স্কোরার।”
”ময়দানে কখনও খেলেছ?”
”না। আমাদের ক্লাবের ময়দান পর্যন্ত যাওয়ার ক্ষমতা এখনও হয়নি।”
”যদি তোমাকে ময়দানের কোনও ক্লাব ডাকে, যাবে?”
চকচক করে উঠল দিলুর চোখ। ময়দান মানে সি এ বি লিগের ক্লাব। তারপর বেঙ্গল টিমে, তারপর ইন্ডিয়া টিমে। উত্তেজনা দমন করে স্বাভাবিক স্বরে সে বলল, ”আমায় ডাকবে কেন, কী এমন খেলেছি!”
প্রতাপ মনে মনে বলল, ‘যা দেখলুম তার অর্ধেকও যদি দেখাতে পারো তা হলে তোমায় নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যাবে।’ কিন্তু মুখে সে বলল, ”কলকাতায় কবে ফিরছ? কোন স্কুলে কোন ক্লাসে পড়ো?”
উত্তর দিতে দিলু ইতস্তত করল। পরীক্ষার ফল বেরোতে এখনও সাতদিন বাকি। তার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। সে নব্বুইভাগ নিশ্চিত, পাশ করতে পারবে না। দাদাদের কিংবা বাবার মতো তার মগজ পড়াশুনোর জিনিসপত্রে ভরা নেই, এটা সে মাকে অনেকদিন আগেই জানিয়ে রেখেছে। মা শুধু বলেছিলেন, ‘নীচের ক্লাসের ছেলেদের সঙ্গে বসতে তোর লজ্জা করবে না?’
তার মনে এল বোকামামার কথাটা : ‘ভাল লাগলে দিলু এখানেই থেকে যাবে।’ এ—কথা শুনে সেদিন সে মনে মনে হেসেছিল। মায়ের সঙ্গে ছেলেবেলায় মামার বাড়িতে এসে নিঃসঙ্গ বোধ করত কিন্তু এবার সে করছে না, বরং ভালই লাগছে। এই ক’দিনে এমন কয়েকটা ব্যাপার ঘটে গেছে যাতে সে মজা পেয়েছে, অবাক হয়েছে, সবচেয়ে বড় কথা, এমন তকতকে একটা মাঠে খেলার সুযোগ আর খেলার জন্য এত ছেলে সে কোথায় পাবে?
”সরস্বতী ইনস্টিটিউশনে। ক্লাস এইটে পরীক্ষা দিয়েছি। কলকাতায় ফিরব কবে ঠিক নেই।” একটু আনমনা দেখাল দিলুকে।
প্রতাপ বলল, ”এখানে থাকলে তুমি সারা বছরই খেলার সঙ্গে যোগ রাখতে পারবে আর কলকাতাও তো বেশিদূর নয়, বরানগর থেকে বাসে ময়দানে পৌঁছতে যে সময় লাগবে এখান থেকেও ততটাই লাগবে। তুমি দুধঘাট স্কুলে ভর্তি হয়ে যেতে পারো, কলকাতার যে—কোনও ভাল স্কুলের থেকে একটুও খারাপ নয়। আচ্ছা, তোমার বয়স কত, তোমার গার্জেন কে, বাবা?”
বয়স বলতে গিয়ে দিলু বরাবরই লজ্জায় পড়ে যায়। তার দেহের আকার দেখে বেশিরভাগ লোকই ধরে নেয় সতেরো—আঠারো।
”পনেরোয় পড়ব দু’ মাস পর।” তারপরই সে তাড়াতাড়ি যোগ করল, ”আমাদের বংশের সবাই খুব লম্বাচওড়া, বাবা সওয়া ছ’ফুট, পঁচানব্বুই কেজি, আমার গার্জেন।”
প্রতাপ কী যেন ভাবল, তারপর বলল, ”আগে হেডসার হরিসাধনবাবুর সঙ্গে কথা বলি।”
বাসু এতক্ষণ অন্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছিল। এবার বলল, ”হেডসারের সঙ্গে নয় প্রতাপদা, আগে কথা বলুন দিলুর দাদুর সঙ্গে, উনি খেলা খুব ভালবাসেন।”
”এখুনি যাচ্ছি।” প্রতাপ তখনি বাইকে উঠে রওনা হল দিলুর মামাবাড়ির উদ্দেশ্যে, বাড়িটা সে চেনে, আগে দু—তিনবার গেছে। পুকুরধারের বেগুন খেতে পঞ্চানন তখন একটা টুলে বসে রিদুকে দিয়ে গাছগুলোর গোড়ায় মাটি খুঁড়িয়ে সার দেওয়ার কাজ দেখছিলেন, চার বছর আগেও তিনি এই কাজ নিজের হাতে করেছেন। এমন সময় হাজির হল প্রতাপ। পঞ্চানন তাকে দু’বার দেখেছেন এই বাড়িতে, হেডমাস্টারের সঙ্গে কথা বলতে এসেছিল। প্রতাপ পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবে ঠিক করেই রেখেছিল এবং তাই করল। পঞ্চাননের মুখে দেখে মনে হল খুশি হয়েছেন, সে আশ্বস্ত হল।
”আমার নাম প্রতাপ লাহিড়ি, আমি—”
পঞ্চানন হাত তুলে বললেন, ”জানি, তুমি তো এ বাড়িতে আগে এসেছ, ছেলেদের ক্রিকেট শেখাও। বোকা তো এখন বাড়ি নেই।”
”আমি এসেছি আপনার কাছেই, আপনার নাতির খেলার ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে।” এই পর্যন্ত শান্তভাবে বলেই প্রতাপ উচ্ছ্বসিত হয়ে দু’হাত ঝাঁকিয়ে বলল, ”কী বলব আপনাকে, অদ্ভুত, আউট অব দিস ওয়ার্ল্ড, কখনও দেখিনি—”
পঞ্চানন চোখ পিটপিট করে বললেন, ”ব্যাপার কী, দিলু করেছে কী?”
”অসাধারণ, অবিশ্বাস্য ফিল্ডার। মাঠের যেখান—সেখান থেকে বল ধরেই বিদ্যুৎগতিতে ছুড়ে স্টাম্পে মারছে, একটা স্টাম্পে।”
”তাতে হয়েছে কী?” পঞ্চানন বুঝতে পারছেন না স্টাম্পে বল মারার মধ্যে অসাধারণত্বের কী আছে।
”হয়েছে কী!” প্রতাপ উত্তেজিত হতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ”মাঠে এইরকম একটা ফিল্ডার থাকলে ব্যাটসম্যানের অবস্থাটা কী হবে একবার ভেবে দেখুন। একটা রান নেওয়ার আগে চোদ্দোবার তাকে ভেবে দেখতে হবে, দুটো রান নেওয়ার আগে—নাহ, দ্বিতীয় রানটা নিতেই যাবে না যদি দেখে দিলু বলটা ফিল্ড করতে যাচ্ছে। এরকম একটা ফিল্ডার মাঠে থাকলে অপোনেন্টের রান কত কমে যাবে ভাবতে পারেন। রান আউট হয়ে যাওয়ার ভয়ে ক্রিজ ছেড়ে বেরোবেই না। যেদিকে দিলু থাকবে সেদিকে স্ট্রোক নেবেই না, আর অন্যদিকে মারতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনবে। এবার বুঝতে পারছেন আপনার নাতি কী জিনিস?”
