দিলু জিজ্ঞেস করল, ”কে প্রতাপদা, কোচ?”
”হ্যাঁ। রঞ্জি ট্রফি শেষ, খেলেছেন আট বছর আগে, স্পিন বোলার ছিলেন। মোটরবাইক অ্যাক্সিডেন্টে পা ভেঙে যাওয়ার পর খেলা ছেড়ে দেন, বারাসাতে থাকেন, চাষের সার আর বীজের ব্যবসা, ওখান থেকেই বাইকে আসেন।”
”আমি ফিল্ডিং প্র্যাকটিস করব, তুমি প্রতাপদাকে একবার বলবে?”
”কাল সকাল ছ’টায় আমি মাঠে হাজির থাকব, কিন্তু তুমি কি ওই সময় আসতে পারবে? তোমার তো ঘুম ভাঙে—।”
বাসুর কথা শেষ করতে না দিয়ে দিলু তাড়াতাড়ি বলল, ”না, না, খুব ভোরে আমি উঠব, তুমি দেখে নিও।”
দিলু কথা রেখে ভোরে বিছানা ছাড়ল। স্কুলের গেটে পৌঁছে দেখল বাসু দাঁড়িয়ে আছে, তাকে দেখে হাসল। হাসিটার অর্থ বুঝতে দিলুর অসুবিধে হল না—তা হলে সত্যি—সত্যিই ঘুম ভেঙেছে দেখছি।
মাঠটাকে পাক দিয়ে সাতটি ছেলে জগ করছে। দিলু হাওয়াই চটি খুলে বলল, ”চলো, আমরাও ওদের সঙ্গে জগ করি।”
ছেলেগুলির পেছন পেছন ওরাও জগিং শুরু করল। বাসুকে ওরা চেনে কিন্তু নতুন ছেলেটি কে? কৌতূহলে ওরা বারবার পেছন ফিরে তাকাতে লাগল। ওদের মধ্যে সর্দার ছেলেটি, যার পরনে সাদা হাফপ্যান্ট সাদা টি—শার্ট আর ক্রিকেট বুট, মাথা ন্যাড়া, সে সবার আগে ছুটছে। দিলু চারপাক সবে শেষ করেছে তখন ন্যাড়ামাথা হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে বলল, ”এবার স্ট্রেচিং।”
মাঠের ধারে ওরা ব্যায়াম শুরু করল। দিলু দেখল একটি ছেলে ফিসফিস করে বাসুকে কী জিজ্ঞেস করল বাসুও চাপাস্বরে জবাব দিল। দিলু জানে বাসু কী বলল—হেড সারের ভাগ্নে, কলকাতায় থাকে বেড়াতে এসেছে। ব্যায়ামরত ছেলেদের ফিটনেস দিলুকে অবাক করল। এভাবে সে আগে কখনও ব্যায়াম করেনি। ছেলেদের শরীরের নড়াচড়া দেখে বুঝে গেল সে যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে।
ব্যায়ামের পর শুরু হল ক্যাচ লোফা, গ্রাউন্ড ফিল্ডিং, উইকেটকিপারকে বল ছোড়া। মাঠের মাঝে একটা স্টাম্প পোঁতা, সেখানে প্যাড—গ্লাভস পরে দাঁড়িয়ে একটি ছেলে, তার পাশে ব্যাট হাতে ন্যাড়ামাথা। সে ব্যাট দিয়ে প্রথম বলটা তুলে মারল, বল নারকোল গাছের মাথা ছাড়িয়ে উঠে প্রায় আকাশ ছুঁয়ে ফেলার মতো উচ্চচতায় উঠে গেছে। দিলুর ডান দিকে পাঁচ গজ দূরে যেটা ডানহাতি ব্যাটসম্যানের লং অফ, দাঁড়ানো ছেলেটির দিকে বল নামছে। সে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলটা লক্ষ করতে করতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তিন পা পিছিয়ে গেল। বল এবার জমিতে পড়বে। চিলের শিকার ধরার মতো ঝাঁপিয়ে ছোঁ মেরে ডান হাতের তালুতে বলটা ধরেই একপাক গড়িয়ে ছেড়ে দেওয়া স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠেই ছুড়ল উইকেটকিপারকে। বলটা জমি না ছুঁয়ে সোজা এসে লাগল সেই একমাত্র স্টাম্পটিতে।
সবারই চোখ কপালে উঠল। গত পাঁচ সেকেন্ডে তারা যা দেখল বিশ্বাস করতে পারছে না। একজন তো বলেই উঠল, ‘আনতাউড়ি হয়ে গেছে, ফ্রুক।” ন্যাড়ামাথা চেঁচিয়ে বলল, ”আর একবার করে দেখাতে পারবে?”
”চেষ্টা করে দেখব।” বলার পরই দিলুর চোয়ালের পেশি দপ করে উঠল।
ন্যাড়ামাথা বলটা তুলে ব্যাট দিয়ে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করল। বল উঠল একস্ট্রা কভারে দিলুর থেকে পনেরো গজ পেছনে। তিরাশির বিশ্বকাপ ফাইনালে ভিভ রিচার্ডসের ক্যাচ ধরার জন্য কপিলদেব যেভাবে বলের দিকে তাকিয়ে ছুটেছিল, দিলু প্রায় সেইভাবেই কভার থেকে ছুটে বাঁ কাঁধের কাছে বলটা লুফেই শরীর ঘুরিয়ে ডান হাতে ছুড়ল। আগের মতোই বল এসে স্টাম্পে লাগল।
চোখগুলো কপালে না উঠে ছানাবড়ার আকার নিল। কারও মুখে কথা নেই, শুধু বাসু ছুটে গিয়ে দিলুকে জড়িয়ে ধরল। ”অদ্ভুত, অদ্ভুত! পরপর দু’বার! তুমি তো অর্জুনের মতো লক্ষ্যভেদ কর দেখছি।”
এমন সময় মোটরবাইকে প্রতাপ লাহিড়ি গেট গিয়ে ঢুকল। ছিপছিপে লম্বা, গোলগলা লাল রঙের গেঞ্জিপরা। বয়স বোঝা যায় না, দেখে মনে হয় পঁয়ত্রিশ, আসলে চল্লিশ। পায়ে স্নিকার। প্রতাপ কলকাতায় উত্তরপল্লী সঙ্ঘের ক্রিকেট সচিব, তারা সি এ বি লিগের প্রথম ডিভিশনে খেলে।
”কীসের লক্ষ্যভেদ রে?” প্রতাপ ওদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল।
একজন উত্তেজিত গলায় বলল, ”এই যে এই ছেলেটা, আজই প্রথম এসেছে। বাসু বলল হেডসারের ভাগ্নে কলকাতায় থাকে, নাম দিলু, দিলীপ। দুটো দারুণ ক্যাচ নিয়েই নিমেষে বল ছুড়ে স্টাম্পে দু’—দু’বার মারল ওই ওখান থেকে।” ছেলেটি আঙুল দিয়ে দেখাল দিলু যেখান থেকে বল ছুড়েছে।
প্রতাপের ভ্রূ কুঁচকে উঠল। বল ছোড়ার দূরত্বটা চোখ দিয়ে মাপল। ওরা দাঁড়িয়ে ডীপ একস্ট্রা কভারে। প্রতাপ বলটা হাতে নিয়ে লং অফের দিকে তাকিয়ে আচমকা বলটা জোরে গড়িয়ে দিল, যেখানে স্কোয়ার লেগ আম্পায়ার দাঁড়ায় সেইদিকে। চিৎকার করে উঠল, ”গোওও, রান।”
দিলু ধনুক থেকে বেরোনো তিরের মতো ছুটে গিয়ে শর্ট স্কোয়ার লেগের কাছে জমি থেকে বলটা কুড়িয়েই শরীর মুচড়ে সেই একমাত্র স্টাম্পের দিকে ছুড়ল। প্রতাপ হতভম্ব হয়ে দেখল স্টাম্পটা ছিটকে চারহাত দূরে গিয়ে পড়েছে। সে বিড়বিড় কল, ”অবিশ্বাস্য, অবিশ্বাস্য, হতে পারে না। তা হলেও ভালভাবে দেখে নেওয়া দরকার।”
এবার ব্যাট হাতে নিল প্রতাপ। স্কোয়ার লেগ থেকে পয়েন্ট, আধখানা মাঠে তুলে তুলে এলোমেলো বল মারল। দিলু প্রত্যেকটা ক্যাচ ধরে স্টাম্পে ছুড়ল, এগোরোবার স্টাম্প ফেলে দিল, শুধু একটি সোজা জমা পড়ল উইকেটকিপারের গ্লাভসে।
