আহত লোকটার জ্ঞান ফিরে আসছে। উঁ উঁ শব্দ বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে। যতীন ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল, ”কেমন আছিস রে বেচু, খুব যন্তাোন্না হচ্ছে?”
কোনওক্রমে বেচু বলল, ”কী হয়েছে আমার?”
যতীন বলল, ”কী আবার হবে, বেম্মদত্যির গাঁট্টা খেয়ে পড়ে গেছিস।”
.
বাড়ি থেকে দুধঘাট স্কুল এক মাইল। বাসুর সঙ্গে দিলু বিকেলে হাজির হল স্কুলের মাঠে। স্কুলের যে এতবড় ঘাসে ঢাকা মাঠ থাকতে পারে, দিলু তা ভাবতে পারে না। মাঠের মাঝখান থেকে তুলে পঞ্চাশ—ষাট মিটার বল মারলে ওভার বাউন্ডারি হবে। কলকাতায় তার স্কুলের কোনও খেলার জায়গা নেই, আছে একটা ছোট উঠোন। তাতে বড়জোর একটা বাস্কেটবল কোর্ট হতে পারে। তাকে খেলতে হয় পাড়ার পার্কে। সেখানে ঘাসের বালাই নেই, জমি এবড়োখেবড়ো। দুধঘাট স্কুলের মাঠ দেখে তার চোখ জুড়িয়ে গেল।
”বাসু, মাঠটা এত সুন্দর করে রেখেছে কী করে?” দিলু জিজ্ঞেস করল, ”মাঠের মালিক তো স্কুল নিশ্চয় অনেক টাকা খরচ করে।”
বাসু বলল, ”কত খরচ করে তা আমি জানি না, সেটা বলতে পারবেন তোমার মামা, হেডসার।”
মাঠের তিনধারে সার দেওয়া নারকেল আর সুপুরি গাছ, মামার বাড়ির পুকুরের ধারে যেমনটি, তবে এখানে গাছের সংখ্যা অনেক বেশি। চোখ বুলিয়ে দিলুর মনে হল, সব মিলিয়ে অন্তত একশো সুপুরি আর নারকেল গাছ রয়েছে।
”এখানে খেলাধুলোর জন্য যা খরচ হয় তা দেয় এরা।” বাসু আঙুল তুলে গাছগুলোকে দেখাল। ”স্কুলবাড়ির পেছনে আছে দিঘি, বড় বড় মাছ, তারাও দেয় খরচের টাকা। স্কুলের আর আশপাশের গ্রাম থেকে যারা খেলতে আসে তারা একটা পয়সাও দেয় না, শুধু দেয় পরিশ্রম। প্রতি মাসে একটা ছুটির দিনে শ’দুয়েক ছেলে নেমে পড়ি মাঠে। দিঘি থেকে জল পাম্প করে মাঠে ছিটোই, ঘাস লাগাই, চারপাশের আগাছা সাফ করি, মাঠে একটা ইটের টুকরোও পাবে না। হেডসার নিজে একটা চেয়ারে বসে থাকেন, আমরা কাজ করি।”
দিলুর এখন মনে পড়ল তাদের ক্লাসের নীলমণির কথা। বাংলার সেরা জুনিয়ার দাবাডু, জাতীয় জুনিয়ার চ্যাম্পিয়ানশিপ খেলতে কোজিকোড় গিয়ে তেরো দিন স্কুল কামাই হয়। রানার্স হয়ে ভারতের দু’নম্বর হয়েছে। নীলমণির বাবাকে ডেকে হেডমাস্টার বলেন, ‘হয় দাবা খেলুক নয়তো স্কুল ছাড়ুক। স্কুলে কামাই করে দাবাটাবা খেলা চলবে না।’ নীলমণি স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। এখন সে দিনরাত দাবা খেলে, দাবার বই পড়ে, দাবার কথা ভাবে। সে গ্র্যান্ড মাস্টার হবেই হবে।
বাসুর গর্বে ঝলমল করা চোখের দিকে তাকিয়ে দিলুর খুব ভাল লাগল। নিজের হাতে যারা মাঠের যত্ন করে, সেবা করে, তারা মাঠকে ভালবাসবে, এ আর নতুন কথা কী। ভাল মাঠ না পেলে ভাল খেলা হয় না, দিলু তা নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে জানে। কলকাতায় ভাল মাঠই তো নেই। বিশেষ করে বর্ষাকালে যা অবস্থা হয়। চটি খুলে হাতে নিয়ে দিলু বলল, ”চলো ঘাসের ওপর দিয়ে একটু হাঁটি। কলকাতায় তো এমন ঘাসের ওপর হাঁটা হয় না।”
মখমলের মতো নরম ঘাসে পা ডুবিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার শরীর শিরশির করে উঠল। সুন্দর একটা আমেজ তার শরীর ভরিয়ে দিল। মাঠের ধারে একটা পাকা ঘর, সেটা দেখিয়ে দিলু জানতে চাইল, ”ওটা কী?”
”ওখানে খেলার জিনিসপত্তর থাকে। গোলপোস্টের জাল, ক্রিকেটের নেট, ব্যাট বল প্যাড, উইকেট, ভলিবলের নেট, এইসব। মেডিকেলের কিট ব্যাগও আছে। আমাদের কোনও মালি নেই, হেডসার বলেছেন যেদিন মালির দরকার হবে সেদিনই স্কুলে খেলা বন্ধ করে দেবেন।”
উত্তরদিকের গোলপোস্টের পেছনে কবাডি আর ভলিবল কোর্টে তখন খেলা চলছে। দুটো কোর্টের ধারে জনা চল্লিশ বয়স্ক দর্শক, দুধঘাটেরই লোক। ওরা দু’জন সেদিকে এগিয়ে গেল। ফুটবল ক্রিকেট কেউ খেলছে না দেখে দিলু অবাক হল। তার কৌতূহল মেটাতে বাসু জানাল, ফুটবলাররা আজ মছলন্দপুরে গেছে টুর্নামেন্ট খেলতে, আর মাটি খুঁড়ে নতুন মাটি ফেলা হয়েছে প্র্যাকটিস পিচে গোবর সার দিয়ে ঘাস বোনা হচ্ছে, তারপর রোল করে নেট পড়বে। ওদিকে দক্ষিণদিকের গোলপোস্টের পেছনে, বর্ষা কেটে গেলে পুজোর আগেই হয়তো প্র্যাকটিস শুরু হবে। কথা হচ্ছে কংক্রিটের পিচ করার, তা হলে সারা বছরই প্র্যাকটিস করতে পারবে।
বাসুর কথা শুনতে শুনতে দিলুর হাত নিশপিশ করে উঠল। সে ব্যগ্রস্বরে জিজ্ঞাসা করল, ”এখানে রোজ খেলা হয়?”
”রোজ হয়। স্কুল ছুটির পরই শুরু হয়, যারা দূরে থাকে তারা খেলেটেলে বাড়ি ফেরে। ছুটির দিনে তো সকাল থেকে শুরু হয়ে যায়। তখন একটা দেখার মতো দৃশ্য, একসঙ্গে চার—পাঁচ রকমের খেলা মনে হবে খেলার হাট বসে গেছে। তুমি খেলতে না জানলেও তখন তোমার ইচ্ছে করবে ছুটে গিয়ে কোনও একটা খেলায় নেমে পড়ি। দাদু বলেন এজন্যই স্কুলের রেজাল্ট এত ভাল হয়।”
দিলু মনে মনে আক্ষেপ করল, তার যে এমন দাদু আর মামা আছে এটা সে আগে কেন জানত না! জানলে কী করত? তা হলে কি মামার বাড়িতে এসে থাকত? প্রশ্নটা তাকে দোনামনা অবস্থার মধ্যে ফেলে দিল।
বাড়ি ফেরার পরে দিলু বলল, ”আচ্ছা বাসু, ব্যাট বল নিয়ে খেলা নয় এখন বন্ধ, কিন্তু ফিল্ডিং প্র্যাকটিস তো করতে পারে।”
”পারে মানে!” বাসু থমকে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে তাকাল। ”রোজ করে, প্রত্যেককে ব্যায়াম করতে হয়, দৌড়তে হয়, তারপর ফিল্ডিং, আজ সকালেও করেছে। প্রতাপদা না এলেও রোজ সকালে এসব করতেই হবে।”
