”বড় তিনটে ডাল কেটেছে, এখন বোধ হয় মাথাটা কাটছে। গাছের মালিক যদি গাছ বিক্রি করে দেয় আমরা কী করতে পারি।” হতাশ দেখাল বাসুকে।
”পুলিশ খবর দিতে পারি।”
”কোনও লাভ হবে না। পুলিশ ডায়রি নেবে না। নিলেও একটা পুলিশ আসবে চার ঘণ্টা পর, ততক্ষণে গাছ কাটা হয়ে যাবে। পুলিশের ওপর ভরসা নেই বলেই তো লোকেরা ডাকাত গুণ্ডা ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলে। তুমি কি জানো সেই লালু ছেলেটাকে, যাকে পুলিশ অজ্ঞান অবস্থায় পূর্ণেন্দুদার বাড়ি থেকে সেদিন নিয়ে গেল, সে এখন বাইগাছিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন সে ল্যাংড়া ভোলার দল ছেড়ে বাপির দলে। পুলিশকে বলে গাছ রক্ষা করতে পারবে না, করতে হলে নিজেদেরই করতে হবে।”
বাসুর কথা শুনতে শুনতে দিলু অবাক হল, ঘৃণায় রি রি করে উঠল তার মন। অবশেষে বলল, ”চলো তো একবার দেখি কী করা যায়। চড় মারা বের করছি।”
হুঁশিয়ার করে সুলেখা বললেন, ”কোনও গণ্ডগোল পাকিও না যেন। মুখে যা বলার ভালভাবে বলবে। মামা আসুক, যা করার তিনিই করবেন।”
হর্ষ বলল, ”গাছ কেটে ফেলার পর আর কী করার থাকবে বউদি? চল আমিও তোদের সঙ্গে যাব।”
তিনজনে মিলে রওনা হল ছোট হুড়ার দিকে, ছ’—সাত মিনিট হনহনিয়ে হাঁটার পর শুরু হল পাকা বাড়িগুলোর শেষ প্রান্ত। এবার দেখা যেতে লাগল বাঁশের দরমা আর খড়ের চালের বাড়ি। বড় রাস্তা থেকে দূরে বড় বড় গাছ আর তার আড়ালে গ্রামের আভাস। হর্ষ আর বাসু ডান দিকে গোরুর গাড়ি চলার মতো একটা ভাঙাচোরা রাস্তায় নামল। দিলু তাদের পেছনে। সে এধার—ওধার তাকিয়ে হর্ষ আর বাসুর অলক্ষ্যে ইটের দুটো টেনিস বল সাইজের টুকরো চট করে কুড়িয়ে পকেটে রাখল।
”ওই দেখো আমাদের ঘর আর ওই দেখো বিন্দুপিসির ঘর, ওর পেছনেই শিমুল গাছটা,” বাসু আঙুল তুলে দেখাল যেখানে দাঁড়িয়ে সেখানে একটা খালি গোরুর গাড়ি দাঁড়িয়ে। কাছেই একটা খেজুর গাছে দুটো বলদ দড়ি দিয়ে বাঁধা। গাড়োয়ানকে দেখা গেল না। রাস্তাতেও লোকজন নেই। রাস্তার ধারের জলায় একটা ছোট মেয়ে কলমি শাক তুলছে।
বাসু বলল, ”গাড়িটা এনেছে কাটা গাছ নিয়ে যাওয়ার জন্য।”
ওরা আর একটু এগোল। এবার গাছটার ওপরের দিক স্পষ্ট দেখা গেল বিন্দুপিসির ঘরের চালের ওপর দিয়ে। খালি গায়ে লুঙ্গি গুটিয়ে নীচের ডালে দাঁড়িয়ে একটা লোক বড় দা দিয়ে ওপরের ডাল কোপাচ্ছে।
”তোমরা এগিয়ে গিয়ে কথা বলো, আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি। বাসু ওই লোকটাই কি তোমার গলায় দা ঠেকিয়েছিল?”
”হ্যাঁ। আর চড় মেরেছিল যে, সে নীচে দাঁড়িয়ে।”
হর্ষ আর বাসু এগিয়ে গেল। দিলুর থেকে গাছের লোকটা মিড অন থেকে স্ট্রাইকারের উইকেটের দূরত্বে। লোকটা মাথা নিচু করে নীচের দিকে তাকাল, বোধ হয় দু’জন নতুন লোককে দেখার জন্য। দিলু হর্ষমাসির তীক্ষ্ন গলার স্বর শুনতে পেল। কথা—কাটাকাটি শুরু হয়েছে। দিলু পকেটে হাত ঢুকিয়ে বিন্দুর ঘরের চালের ওপর দিয়ে লোকটির মাথাটুকু দেখতে পাচ্ছে।
লোকটা দা হাতে নিয়েই মাটিতে পড়ল ”বাবা গো” বলে পাকা বেলের মতো। দিলু আর এক সেকেন্ড না দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে ছুটে গোরুর গাড়ির কাছে এসে একটা বলদের গলায় হাত বুলোতে শুরু করল। একটা হইচইয়ের শব্দ তার কানে আসছে। বলদটা আরামে চোখ বুজিয়ে ফেলল।
একটু পরেই দুটি লোক একজন অজ্ঞান রক্তাক্ত লোককে চ্যাংদোলা করে নিয়ে এল। লোকটার মাথায় বাঁধা গামছা, তাদের পেছনে হর্ষ এবং বাসু। বহনকারীদের একজন গাড়োয়ান। সে ব্যস্ত হয়ে বলদ দুটিকে গাড়িতে জুততে শুরু করল।
দিলু অবাক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ”বাসু, হয়েছে কী?”
বাসু বলল, ”লোকটা গাছের ওপর ছিল, হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেল।”
প্যান্ট আর বুশশার্ট পরা বেঁটে গোলগাল গড়নের মাঝবয়সী লোকটিকে দেখে দিলুর মনে হল এই বোধ হয় সে—ই, যে গাছটা কিনেছে এবং বাসুকে চড় মেরেছে। লোকটি চোখেমুখে উদ্বেগ, বিরক্তি, ভয় আর উত্তেজনা নিয়ে বলল, ”কী গেরোর ফেরে পড়লুম এখানে কোথায় ডাক্তার কোথায় ওষুধপত্তর, সেই বাইগাছি যেতে হবে। হাত—পা ভাঙলে তো হাসপাতাল ছাড়া গতি নেই। সেও সাত—আটমাইল, কত খরচ হবে কে জানে! দশ বছর ধরে অন্তত চারশো গাছ কেটেছে, একবারও পড়েনি আর আজই—ওরে যোতনে একটু তাড়াতাড়ি কর বাবা, মরেটরে গেলে বহু টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।”
হর্ষ বলল, ”পড়ে গেছে না অপদেবতায় ঠেলে ফেলে দিয়েছে। ও গাছে তেঁনার বাস আমার জন্মের আগে থেকে। তাঁকে বাসের ঘর থেকে উচ্ছেদ করলে তিনি সহ্য করবেন কেন।” দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে হর্ষ অবদেবতার উদ্দেশে প্রণাম জানাল।
”অপদেবতা!” লোকটি চমকে উঠল, ”তার মানে ভূত?”
”বেম্মদত্যি! সাদা ধুতি চাদর, এই মোটা পৈতে, পায়ে খড়ম। কতদিন রাতে খটমট আওয়াজ যে শুনেছি।”
”যোতনে তাড়াতাড়ি কর। ব্যাটাকে গাড়িতে তুলে শোয়া।” দু’জনে ধরাধরি করে আহত লোকটিকে তুলল। ”এই যাঃ, গাছ কাটার দা—টা তো ওখানেই পড়ে আছে, যোতনে দৌড়ে গিয়ে নিয়ে আয় না বাবা।”
যতীন একগুঁয়ের মতো ঘাড় বেঁকিয়ে বলল, ”আমি এখন গাছতলায় যেতে পারব না। আপনি গিয়ে নিয়ে আসুন।”
লোকটি কাঁচুমাচু মুখে বাসুকে বলল, ”খোকা তুমি যাবে আমার সঙ্গে?”
বাসু বলল, ”চলুন।”
ওরা দু’জন এগিয়ে যেতেই হর্ষ ফিসফিস করে দিলুকে বলল, ”কেমন ভয়টা দেখালুম বলো তো। ওই গাছটার ধারেকাছে জীবনে আর আসবে না।”
