”তোমায় কে বলল আমি দাবা খেলতে জানি!”
”বাসু। ও তোমার কাছে শিখেছে বলল।”
”দাবার বোর্ড আর ঘুঁটি বাসুকে দিয়ে দিয়েছি। কাল বাইগাছি বাজার থেকে কিনে এনে দেবে। ওখানে স্পোর্টস কর্নার নামে দোকানটায় পাওয়া যাবে। হঠাৎ দাবা শেখার ইচ্ছা হল যে?”
”আমার ধৈর্য কম সেটা তো বন্দুক ছোড়া দেখেই বুঝেছ। টিপ করার জন্য সময় না দিয়েই ফায়ার করেছি।”
”আর তাতেই এঁচোড় পড়ে গেল। আমার কী মনে হয় জানো দাদু, তুমি যদি সময় নিয়ে টিপ করে গুলিটা ছুড়তে তা হলে এঁচোড়টা গাছেই থেকে যেত। ধৈর্য কম বলে নয়, এটাকে তোমার গুণই বলো আর দোষই বলো তুমি জন্মগতভাবে পেয়েছ। বাসু খুব ব্রিলিয়ান্ট নয় কিন্তু খুব পরিশ্রমী, ও ভাল রেজাল্ট করে খাটুনির জোরে। যতটুকু ট্যালেন্ট আছে সেটাকে ও ডিসিপ্লিন দিয়ে গুছিয়ে নিয়ে কাজে প্রয়োগ করে এটা ও জন্মগতভাবে পেয়েছে।” পঞ্চানন এই পর্যন্ত বলে চুপ করলেন। কথাগুলো দিলু বুঝতে পারল বলে তার মনে হল না। প্রসঙ্গ বদল করে তিনি বললেন, ”দাবা খেলা শিখতে চাও কি ধৈর্য বাড়াবার জন্য?”
”হ্যাঁ, ব্যাটিংয়ের জন্য।”
”সুনীল গাওস্কর ছশো মিনিট আটশো মিনিট ব্যাট করত কি দাবা খেলে?” পঞ্চানন গম্ভীর স্বরে কথাটা বলে নিঃশব্দে হাসতে শুরু করলেন, অন্ধকারে দিলু তা দেখতে পেল না।
”জানি না দাবা খেলত কি না।”
”যতদূর জানি ক্রিকেট ছাড়া গাওস্কর আর কোনও খেলা খেলত না। যদি ব্যাটিংয়ে উন্নতি করতে চাও তা হলে মনপ্রাণ ঢেলে ব্যাটটাই করে যাও। দাবা খেলাটা শেখো, খেলো, এটা মাথার খেলা, ক্ষতিকর নয়। দাবাতে শুধু বুদ্ধির লড়াই হয় না এতে যুক্তি আর বিচারক্ষমতাও বাড়ে।”
”তা হলে কর্মনাশা বলে কেন?”
”যারা খেলাটা জানে না তারাই বলে। আসলে বহু বছর আগে যেসব লোকের কাজকম্মো ছিল না, কাজ করার দরকার হত না, তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে দাবা খেলে সময় কাটাত। এটা প্রায় একটা নেশার মতো। এই নিয়ে নানান গল্প আছে। একটা লোক দুপুরে বউকে ভাত বাড়তে বলে তেল মেখে গামছা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোল নদীতে গিয়ে চান করবে বলে। যাওয়ার পথে দেখল তার দুই পড়শি বাড়ির দাওয়ায় বসে দাবা খেলছে। দেখে লোকটা ওদের পাশে বসে পড়ল আর বাড়ি ফিরল পরদিন সকালে। এইবার বুঝলে তো দাবার নেশা কী মারাত্মক। ঘরসংসার, খিদে—তেষ্টা সব ভুলিয়ে দেয়।”
”ওরে বাবা, না দাদু, দাবা খেলা আমার দ্বারা হবে না। মাথার খেলা মাথাতেই থাকুক, তুমি অন্য কোনও খেলার কথা বলো যাতে আমার সময় কাটে। বড্ড একঘেয়ে লাগছে। পুঁটিমাছ কতক্ষণ ধরব বলো তো, আর সাঁতার তো সারাদিন ধরে কাটা যায় না।”
”বাসুকে বলব তোমাকে স্কুলের মাঠে নিয়ে যেতে। পরীক্ষা শেষ, এখন ছেলেরা খেলতে নেমে পড়েছে, ফুটবল ক্রিকেট ভলি কবাডি সব পাবে।”
পরদিন বাসুর সঙ্গে দিলু সাঁতার কেটে মাঝপুকুর পর্যন্ত গেছে, তখন বাসু বলল, ”এবার ফেরো, আজ এই পর্যন্ত।” দু’জনে যখন ঘাটের কাছাকাছি তখন হর্ষ হন্তদন্ত হয়ে ঘাটে এসে চেঁচিয়ে বলল, ”অ বাসু তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখ তো বিন্দুপিসির বাড়ির পেছনের বিশ্বাসদের শিমুল গাছটা কারা যেন কেটে ফেলছে। বুড়ি মানুষ হাঁপাতে হাঁপাতে এসে খবর দিল।”
বাসু ঝটপট হাত চালিয়ে ঘাটে পৌঁছল। হর্ষ তখনও বলে চলেছে, ”গাছটা নাকি ওরা বিক্রি করে দিয়েছে। আহা পঞ্চাশ—ষাট বছরের কতবড় গাছ, টাকার লোভে বিক্রি করে দিল! তুই দৌড়ে গিয়ে বিশ্বাসদের মেজো কত্তাকে গাছকাটা বন্ধ করতে বল।”
বাসু শুকনো প্যান্ট শার্ট পরে নিয়েই ছুটল বাড়ির দিকে। হর্ষ ছলছল চোখে বলল, ”লাল টকটকে ফুল মাটিতে পড়ে থাকত, ফুল কুড়োতুম, তুলো বের করে জমিয়ে জমিয়ে পুতুলের বালিশ—বিছানা করতুম, ও গাছ কি আজকের, জম্মো থেকে দেখছি।”
হর্ষর মুখের দিকে তাকিয়ে দিলুর মনে হল বাল্যসঙ্গী শিমুল গাছটার অপমৃত্যু ঘটছে শুনে খুবই আঘাত পেয়েছে। এখন তার মনে পড়ল খবরের কাগজে মাসছয়েক আগে একটা খবর বেরিয়েছিল, কলকাতায় একটা লোক তার বাড়ির সামনে রাস্তার একটা গাছের ডাল কাটিয়েছিল সেজন্য তার জরিমানা হয়। তাই নিয়ে বাবা আর দাদা বলাবলি করেছিল, অনুমতি ছাড়া গাছকাটা এখন বারণ। পরিবেশরক্ষার জন্য এই আইন করা হয়েছে। যদি কাটতেই হয় তা হলে সেখানে নতুন গাছের চারা লাগিয়ে কাটতে হবে।
দিলুর ইচ্ছে করল ছুটে গিয়ে আইনের কথাটা বিশ্বাসদের মেজো কর্তাকে বলে আসে। বাসুর সঙ্গেই তার ছুটে যাওয়া উচিত ছিল। বাসু কি জানে কাজটা বেআইনি। এতক্ষণে হয়তো গাছটা কেটে ফেলেছে।
আধঘণ্টার মধ্যে বাসু ফিরে এল। মুখ থমথমে। এক চোখে আগুন, অন্য চোখে জল।
”কী হল, গাছকাটা বন্ধ করেছে?” দিলু ব্যগ্রস্বরে জানতে চাইল।
”না, করল না। আমি বারণ করলুম, যে লোকটা গাছ কিনেছে সে আমাকে চড় মেরে বলল, ”তুই কে রে? যা ভাগ, পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে গাছ কিনেছি, তোর কথায় কাটব না? দুটো লোক গাছে উঠে মোটা মোটা ডালগুলো দা দিয়ে কাটছিল। একজন নেমে এসে গলার কাছে দা ঠেকিয়ে বলল, ”মাথা নামিয়ে দোব যদি আর একটা কথা বলেছ।’ আমি তখন মেজো কত্তার খোঁজে গেলুম। ওঁর বাড়িতে বলল উনি কলকাতা গেছেন, আমি চলে এলুম।”
”গাছ কতটা কেটেছে?” দিলু উত্তেজিত স্বরে বলল, ”তোমার মাথা কেটে দেবে বলল, স্পর্ধা তো কম নয়!”
