দিলু ঘাটে ফিরল। তবে সাঁতরে নয়, বাসুর পিঠে চড়ে। দু’হাত দিয়ে দু’পাশে জল সরিয়ে সরিয়ে বাসু এগিয়ে চলল। দিলু আলতো করে তার দুটো কাঁধ শুধু ধরে রইল। তাকে ঘাটে পৌঁছে দিয়ে বাসু আপন খুশিতে সাঁতার কেটে পুকুরের অপর প্রান্তে প্রায় পঞ্চাশ মিটার চলে গেল।
”দাদু, আমি কবে ওপারে যেতে পারব?” দিলু উন্মুখ আশা নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
”আজ তো সবে হাতেখড়ি হল। অ আ হস্যই দিঘ্যির ওপর দাগা বুলোও কিছুদিন। অধৈর্য হলে চলে?”
দাগা বুলোতে হলে তো মামার বাড়িতে বেশ কিছুদিন থেকে যেতে হবে। সাঁতার শেখার এমন সুযোগ ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় ফেরা যায় না। পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর আগে পুকুরের ওপারে যাবে এমন একটা প্রতিজ্ঞা মনে মনে করে ফেলল। ক্লাস নাইনে পৌঁছনোর থেকেও তার কাছে এখন পুকুরের ওপারটাই একমাত্র লক্ষ্য। তা ছাড়া মাছ ধরাটা, বিশেষ করে হুইল ছিপ দিয়ে বড় বড় রুই—কাতলা খেলিয়ে খেলিয়ে তোলা, দাদু বলেছেন টেস্ট ম্যাচে ছক্কা মারার মতো ব্যাপার। দু—তিনটে ছক্কা না মেরে কি দুধঘাট থেকে যাওয়া যায়!
তা ছাড়া নারকেল গাছে ওঠা, গাছ থেকে পুকুরে ঝাঁপ। এই মজাটা সে কলকাতায় কোথায় পাবে। কলকাতার ছেলেকে ডাউন দেওয়ার জন্য বাসুর বাহাদুরি দেখানোর জবাব দিয়ে যেতে হবে। দিলু মনে মনে বলল, দাঁড়াও। সাঁতার আর গাছে চড়াটা শিখে নি। দাদু তো হাতে করে শেখাবেন না, শেখাবে বাসু। ছেলেটা সত্যিই ভাল, সবসময় হাসে, ওর নাম হওয়া উচিত ছিল হাসু। ওর একটাই দোষ, বড্ড বেশি বই পড়ে, অঙ্ক কষে। দাদু বলেছিল গরিবের ছেলে, মানুষ হয়ে উঠতে হলে তো পড়াশুনো করতেই হবে। কিন্তু বাসু তো মানুষই, তা হলে মানুষ হয়ে ওঠাটা আবার কী জিনিস? দিলু কিছুক্ষণ ভেবে ধাঁধাটার উত্তর বের করতে পারেনি।
বাসু প্রতিদিন সকালে ছোট হুড়া থেকে দু’ মাইল হেঁটে এসে পঞ্চাননের কাছে পড়তে বসে এবং প্রতিদিনই দিলু ঘুম ভেঙে বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। বাইরে দালানে বেরোলেই তো দেখতে হবে দাদু বাসুকে হয় ব্যাকরণ ধরছেন নয়তো রচনা লেখা শেখাচ্ছেন। আর তাকে দেখলেই বলবেন, ‘এই যে দাদু ঘুম ভাঙল’—শুনতে এত খারাপ লাগে। তার চেয়ে বরং যদি বলেন, ‘আজ উঠতে দেরি করে ফেলেছ। যাও চট করে মুখ ধুয়ে এসে পড়তে বসে যাও’—এইরকম কিছু বললে বাসুর সামনে লজ্জায় পড়তে হয় না। কিন্তু পড়ার জন্য দাদু আজ পর্যন্ত একটা কথাও বলেননি। অবশ্য পরীক্ষার পর মামার বাড়ি এসে কেউ লেখাপড়া করতে বসেছে বলে সে শোনেনি। ‘মামার বাড়ি ভারী মজা কিল চড় নাই’ কথাটা তা হলে তৈরি হয়েছে কী জন্য!
একদিন সাঁতার কেটে উঠে বাসু বলল, ”তুমি দাবা খেলতে পারো?”
দিলু বলল, ”না। তাস দাবা পাশা, তিন কর্মনাশা। যেসব খেলা বসে বসে খেলতে হয় তা আমার ভাল লাগে না।”
”বসে ধৈর্য ধরে খেলতে হয় বলে তোমার ভাল লাগে না কিন্তু কর্মনাশা বলছ কেন? পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ লোক দাবা খেলছে, তাদের কি কর্মনাশ হচ্ছে? ঠাণ্ডা মাথায় হিসেব কষে যুক্তি দিয়ে দাবা খেলায় জিততে হয়। লুডো কি পাশার মতো এতে ভাগ্যের হাত নেই। সেইজন্যই তো দাদু আমাকে দাবা খেলা শিখিয়ে দিয়েছেন, যাতে ব্রেনের কাজ করার ক্ষমতা বাড়ে। দুধঘাটে তো দাবা কম্পিটিশন হয়, দাদু তিনবার জিতেছেন, কাপ পেয়েছেন, তুমি জানো না?” বাসু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
দাদুর এহেন গুণপনার কথা না জানার জন্য দিলু অপ্রতিভ বোধ করল কিন্তু মুখভাবে তা ফোটাল না। বলল, ”কতদিন আগে কাপ জিতেছেন? কই ঘরে তো কোনও কাপটাপ দেখিনি!”
”বছর দশেক আগে শেষ জিতেছেন। লোকজনকে দেখাবার জন্য কাপ মেডেল সাজিয়ে রাখা, সার্টিফিকেট বাঁধিয়ে রাখা দাদু একদম পছন্দ করেন না। বলেন, বিশ্ব কি ভারত চ্যাম্পিয়ান হওয়া তো নয়, দুধঘাট চ্যাম্পিয়ান। এ আর লোককে দেখাব কী! কাপগুলো আলমারির মাথায় পড়ে থেকে থেকে ধুলো জমছিল, মামি সেগুলো ঝেড়েমুছে নিজের ঘরে আলমারিতে সাজিয়ে রেখেছেন, তুমি দেখে এসো।”
দিলু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে নিচু স্বরে বলল, ”ধৈর্য আমার সত্যিই কম। ক্রিজে গিয়েই দুমদাম ব্যাট চালাই, লাগে তুক না লাগে তাক। আমার হায়েস্ট কত জানো—আট বলে পঁয়ত্রিশ তাতে পাঁচটা সিক্সার, একটা ফোর একটা সিঙ্গল। আমাকে নেয় শুধু ফিল্ডিংয়ের জন্য।”
”শুধু ফিল্ডিং দিয়ে কতদিন আর চান্স পাবে, সেইসঙ্গে ব্যাটিং বা বোলিংয়ের একটা তো চাই।”
দিলু মাথা নাড়ল ম্লান হেসে।
”তুমি কখন দাবা খেলো, কার সঙ্গে?”
”রোজ খেলি না, পড়তে পড়তে যখন মাথা ভার হয়ে যায় একঘেয়ে লাগে তখন বিশালাক্ষী মন্দিরে গিয়ে ওখানকার পুরুতমশাই গোবিন্দ ঠাকুরের সঙ্গে ঘণ্টাখানেক খেলি। উনি খুব ভাল খেলেন, একবারও ওঁকে হারাতে পারিনি।”
”আচ্ছা বাসু, আর কতদিনে পারব ওপারে যেতে। কলকাতায় ফেরার আগেই পুকুর পার হতে চাই।” দিলু উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করল উত্তরের জন্য।
বিব্রত মুখে বাসু বলল, ”তোমার দেখছি তর সইছে না। শ্বাস নেওয়া আর ছাড়াটা এখনও ঠিক হয়নি। মাঝপুকুরে দম ফুরিয়ে গেলে বিপদে পড়বে।”
”তুমি তো আমার পাশে পাশে থাকবে।”
রাত্রে অন্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে দিলু চাপাস্বরে বলল, ”দাদু দাবা খেলাটা শিখিয়ে দেবে?”
