গবেষণা হল লালুর মুদির দোকানে : ”পূর্ণেন্দুর মা রেগুলার রাধাগোবিন্দর মন্দিরে প্রণাম করতে যান, রেগুলার বাড়িতে সত্যনারায়ণের পুজো দেন। ও বাড়ি ঘিরে আছে দেবতার রক্ষাকবচ, ল্যাংড়া ভোলাফোলার ক্ষমতা কি ওখানে ট্যাঁফোঁ করে? গোবিন্দজি নিজে থাপ্পড় মেরেছেন শান্টুকে, ব্যাটা ভাগ্যবান।”
আলোচনা হল দশরথ হেয়ার কাটিং সেলুনে: ”আমার বউ বলল, উঠোনে যখন কাপড় শুকোতে দিচ্ছে তখন বিশাল একটা চাকতির মতো কী যেন নিঃশব্দে উড়ে গেল পূর্ণেন্দুর বাড়ির দিকে খুব নিচু দিয়ে, আর তাই থেকে লাঠির মতো সবুজ একটা আলো হঠাৎ একবার বেরোল। বউ নিজের চক্ষে দেখল আলোর লাঠিটা আধ সেকেন্ড জ্বলেই নিভে গেল। লোকে বলে এসব গাঁজাখুরি গপ্পো, আরে বাবা, আমার বউ তো গাঁজা খায় না, খবরের কাগজও পড়ে না, তা হলে সে কী করে বলল ফ্লাইং সসার উড়ে যেতে দেখেছে? লেসার বিম দিয়ে শান্টুকে যে হিট করেছে মঙ্গল গ্রহের ইউ ফো তাতে কোনও সন্দেহ নেই।”
শান্টুর অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ার পেছনে কী রহস্য রয়েছে তাই নিয়ে যখন দুধঘাটে নানারকম গালগল্প চলছে তখন বাইগাছি স্টেশনে এক সকালে বোমা, পাইপগান, লোহার রড আর ভোজালি নিয়ে ঘণ্টাদুয়েক ধরে যুদ্ধ হয়ে গেল ল্যাংড়া ভোলার দলের সঙ্গে বাপির দলের। ভোলার দলের ‘খুনি’ দুটি ছেলে মারা গেল এবং তাকে তল্লাট ছেড়ে পালাতে হল, যদিও তার বাড়ি বাইগাছিতেই। পালাবার আগে সে বলে গেছে, ”শিগগিরি ফিরে আসছি, দেখে নেব বাপিকে।” এখন বাইগাছি স্টেশন রোডের ব্যবসায়ী ও দোকানদারদের থেকে মাসিক তোলা আদায় করে শুধু বাপির গুন্ডারা, বাপি এখন সাইকেল ও ভ্যানরিকশা ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট।
পূর্ণেন্দু এখন নিশ্চিন্তে অফিস যাচ্ছে। দুধঘাট স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে, বাসু কিন্তু নিয়মিত সকালে আসে বাড়িতে কষা অঙ্ক পঞ্চাননকে দেখাতে এবং নতুন অঙ্ক শিখে নিতে। দিলুর পায়ের নখ ঢাকা ব্যান্ড—এডটা খোলা হয়েছে, নতুন নখ গজাচ্ছে। পঞ্চাননকে সে বলল, ”দাদু এখন তো সাঁতারটা শিখে নেওয়া যায়।”
তার নখ পরীক্ষা করে পঞ্চানন জানালেন, কাল থেকে বাসুর ট্রেনিংয়ে সে সাঁতার শিখবে। পরদিন দিলু জীবনে প্রথম কোনও জলাশয়ে নামল। বাড়িতে বরাবর শাওয়ারে স্নান করেছে। এক পা এক পা করে সিঁড়ির ধাপ মাড়িয়ে কোমর জল পর্যন্ত গিয়ে পিছু ফিরে ঘাটের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা দাদুর দিকে সে তাকাল।
পঞ্চানন চে�চিয়ে বললেন, ”জলে না নামিলে কেহ শিখে না সাঁতার। আরও নামো, বাসু ওকে একটু ঠেলে দে তো।”
বাসু তার পাশেই কোমর জলে। দিলু বাধা দেওয়ার আগেই সে মুচকি হেসে তার পিঠে একটা ছোট্ট ঠেলা দিল। টলমল করতে করতে দিলু জলে পড়ে গেল। দাঁড়াবার চেষ্টা করে পায়ের তলায় ঠাঁই পেল বটে কিন্তু তখন মাথার ওপরে চার আঙুল জল। আঁকুপাকু করে মাথাটা তুলে ”হাফফ হাফফ” শব্দ মুখ দিয়ে বের করে আবার সে জলের নীচে নেমে গেল। এইভাবে পাঁচবার ওঠানামা করার পর পঞ্চানন হাঁক দিলেন, ”বাসু তোল।”
বাসু জলে নেমে দিলুর পেছনে গিয়ে পিঠে ঠেলা দিল। পায়ের নীচে সে সিঁড়ি পেল। হাত বাড়িয়ে দিলুকে টেনে কোমর জলে দাঁড় করাল। থমথমে রাগী মুখে দিলু সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসে পঞ্চাননকে বলল, ”এটা কী হল দাদু, আমাকে নাকানি চোবানি করে জল খাওয়ালে।”
উৎসাহ ভরে পঞ্চানন বললেন ”তুমি তো সাঁতারের অর্ধেক শিখে ফেললে। জলের সঙ্গে পরিচয় তো হয়ে গেল, এবার ভাব জমাও। যাও যাও, আবার নামো।”
”না।” মুখগোঁজ করে দিলু বসে পড়ল।
”ক্রিকেট বল কখনও পায়ে হাতে মাথায় লেগেছে?” পঞ্চানন জানতে চাইলেন।
”অনেকবার।”
”সেজন্য তুমি কি ক্রিকেট খেলা বন্ধ করে দিয়েছ?”
দিলু কয়েক সেকেন্ড সময় নিল দাদু কী বলছে চাইছেন সেটা বুঝে নিতে। তারপরই উঠে দাঁড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। বাসু হাত বাড়িয়ে দিল।
”হাত—পা ছুড়ে যেমন—তেমন করে হোক ঘাটের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করো। আমি পাশে পাশে থাকব। ভয়ের কী আছে।” বাসু শান্ত গলায় ভরসা দিল।
ঘাটের শেষধাপ থেকে হাত দশেক দূরে বাসু তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে বলল, ”যাও এবার।”
ভয়ে দিলুর বুকের মধ্যেটা হিম হয়ে রইল তিন—চার সেকেন্ড। ডুবে যাব, ডুবে যাব। বাঁচতে হবে, আমাকে বাঁচতে হবে। দিলুর বুকের মধ্যে কে যেন চিৎকার করে উঠে বলল, ”চেষ্টা করো দিলু, বাঁচার চেষ্টা করো।’
হাত—পা ছুড়ে সে ঘাটের দিকে নিজেকে টেনে নিয়ে গিয়ে বুকজলে দাঁড়িয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে সাফল্যের আনন্দে হাসিতে মুখ ভরিয়ে ফেলল।
”শাবাশ দাদু, শাবাশ।” দিলু মুখ তুলে পঞ্চাননকে বুড়ো আঙুল দেখাল।
”আর একবার হবে নাকি?” বাসু জলের মধ্যে দশ হাত দূরেই রয়েছে। সেখান থেকেই দিলুকে ডাক দিল।
”হবে। তুমি ওখানেই থাকো, আমি তোমার কাছে যাব।” চেষ্টা করে দশহাত যেতে পেরেছে, উত্তেজনা আর উৎসাহে এখন সে টগবগ করে ফুটছে। দিলু দু’হাত ছুড়তে ছুড়তে জল ঠেলে এগিয়ে গেল বাসুর দিকে। বাসু তিন—চার হাত পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়সাঁতার কেটে অপেক্ষা করছে। হাঁসফাঁস করতে করতে দিলু বাসুর কাছে পৌঁছেই প্রাণপণে তার গলা জড়িয়ে ধরল।
”আরে ছাড়ো ছাড়ো, এভাবে ধরলে ডুবে যাব যে। পেছন দিকে এসে আমার কাঁধ ধরে একটু জিরিয়ে নাও, তারপর আবার যাবে।” বাসু যথারীতি শান্ত অনুত্তেজিত স্বরে বলল, ”জোরে আঁকড়ে ধরবে না, তা হলে দু’জনেই ডুবব।”
