ক্যাপটা মাথা থেকে উড়ে গিয়ে বেরিয়ে পড়ল টাক। চশমাটা দু’ টুকরো। নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল। লোকটা রীতিমত শক্তসমর্থ, অন্য কেউ হলে মুখ চেপে বসে পড়ত, তা না করে সে ছুটে রাস্তায় বেরিয়ে এসে মোটরবাইকে উঠে স্টার্ট দিল।
দিলুও তাড়া করে গেট দিয়ে বেরিয়ে এল। বেরোবার মুখে ছোঁ মেরে জমি থেকে পেয়ারাটা কুড়িয়ে নিয়েছিল। বাইকটা বারো—চোদ্দো মিটার এগিয়ে গেছে, দিলু তখন মাথা লক্ষ্য করে পেয়ারাটা ছুড়ল। টাকের ধারে লেগে পেয়ারাটা ছিটকে গেল। লোকটা মাথা নিচু করে নিয়ে উধাও হয়ে গেল প্রচণ্ড স্পিড তুলে।
বোমাটা গ্রিলের লোহায় লেগে ফেটেছে। বন্দুক হাতে মেঝেয় উপুড় হয়ে থাকা পঞ্চানন অক্ষত এবং হতভম্ব, কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। এমন একটা মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হবে এবং বেঁচে যাবেন সেটা স্বপ্নেও ভাবা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
”বাঁচান বাঁচান, খুন করে ফেলল….ছুটে আসুন, ডাকাত পড়েছে।” পূর্ণেন্দু ঘর থেকে বেরিয়ে এসে চিৎকার করে যাচ্ছে। চোঙাটা হাতে ঝুলছে।
”মুখে চোঙাটা লাগিয়ে চেঁচাও।” পঞ্চানন ধমকে উঠলেন।
পূর্ণেন্দুর চিৎকারে নয়, বোমার শব্দেই আশপাশ থেকে কয়েকজন ছুটে এল। তারা এসে দেখল একটা ছেলে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে, পাশে একটি থলি, বন্দুক হাতে পঞ্চানন, চোঙা হাতে পূর্ণেন্দু আর ঝাঁকড়া চুলের কৃষ্ণবর্ণের একটি কিশোর শান্ত চোখে একটা পেয়ারা নিয়ে লোফালুফি করছে।
একজন উত্তেজিত হয়ে বলল, ”গুলি করেছেন জ্যাঠামশাই, গুলি। কোথায় মেরেছেন, পেটে না মাথায়?”
পঞ্চানন অবাক হয়ে বললেন, ”গুলি করব কী, হতভাগাটা কি আমাকে টাইম দিল। ভাগ্যিস গ্রিলে লেগে ফেটে গেল, যদি ফোকর দিয়ে গলে ভেতরে এসে ফাটত, তা হলে,” পঞ্চানন শিউরে উঠে যোগ করলেন, ”বোমাটা ছোড়ার জন্য হাতটা তুলেছে দেখেই আমি তো মেঝেয় শুয়ে পড়েছিলুম মাথায় হাত চেপে।”
” তা হলে ডাকাতটা এভাবে পড়ে আছে কেন। দেখুন তো প্রণববাবু ওর কী হয়েছে।” লুঙ্গির কষি আঁটতে আঁটতে এক প্রৌঢ় বললেন।
”আমি কেন, আপনিই দেখুন না। আমাকে এখুনি কলেজে যেতে হবে।” বলতে বলতে প্রণববাবু পিছু হটে গেট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
”এখন ওঁর পড়াতে যাওয়ার কথা মনে পড়ে গেল।” লুঙ্গি পরা প্রৌঢ় বিড়বিড় করে কথাগুলো বলে গুণ্ডাটাকে চিত করে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে বললেন, ”কই কোথাও তো রক্তটক্ত দেখছি না। তবে কপালের বাঁ দিকটা রক্ত জমে ফুলে রয়েছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা দিয়ে মারা হয়েছে। কিন্তু মারল কে?”
ভিড়ের মধ্য থেকে একজন বলল, ”এখন এটাকে নিয়ে কী করা হবে। অজ্ঞান অবস্থায় গণপ্রহার করা মনে হয় উচিত হবে না, বরং থানায় ফোন করে খবর দিন আর দেখুন ওর সঙ্গের কেউ আশেপাশে ঘাপটি মেরে আছে কিনা। মনে হচ্ছে ল্যাংড়া ভোলার দলের ছেলে।”
পূর্ণেন্দু বলল, ”একটা মোটরবাইক আসার শব্দ পেয়েছি, সেটা চলে যাওয়ার শব্দও শুনেছি।”
কয়েকজন রাস্তায় এসে এধার ওধার তাকিয়ে ফিরে এসে জানাল, রাস্তায় অচেনা কাউকে দেখা গেল না। আবার গুঞ্জন শুরু হল—তা হলে মারল কে? কী দিয়ে মারা হয়েছে?
একজন থলিটা তুলে ভেতরে দেখে বলল, ”আরে, দুটো বোমা এখনও রয়েছে এর মধ্যে।”
পঞ্চানন আঁতকে উঠে ব্যস্ত হয়ে বললেন, ”রেখে দাও, রেখে দাও, পূর্ণেন্দুকে যে খুন করার জন্যই এসেছিল ওটা তার প্রমাণ, নাড়ানাড়ি কোরো না।”
দিলু পেয়ারাটা প্যান্টে ঘষে পরিষ্কার করে নিয়ে চিবোতে শুরু করল। যেমন মিষ্টি তেমনই নরম। এখানকার কেউ তাকে চেনে না, তার দিকে কেউ তাকাচ্ছেও না। লোকজনের কথাবার্তা সে শুনছে আর মনে মনে হাসছে।
পূর্ণেন্দুকে আশ্বস্ত করে পঞ্চানন বললেন, ”আর কেউ তোমাকে মারার জন্য এ—তল্লাটের ধারেকাছেও আসবে না। হাতের বন্দুক হাতেই রয়ে গেল অথচ দ্যাখো ধরাশায়ী।” আঙুল দিয়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা গুন্ডাটাকে দেখালেন। এর পর দিলুর দিকে ফিরে বললেন, ”দাদু, তুমি তো তখন বাইরে ছিলে, কে ওকে মারল দেখেছ কি?”
দিলু তখন পেয়ারাটায় শেষ কামড় দিচ্ছে, অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, ”আমি! দেখব কী করে, তখন তো আমি পেয়ারা গাছের ওপরে। বাব্বা, ওই সময় কেউ গাছ থেকে নামে? তবে দাদু তখন মনে হল, জাদুকর ম্যানড্রেকের মতো কালো কোট পরা মাথায় কালো টুপি একজন যেন চোখের পলকে এই পাঁচিলের ওপর দিয়ে হুসস করে লাফিয়ে বেরিয়ে গেল, সত্যি—সত্যি ম্যানড্রেক হলে তো মিরাকল!”
শুনে একজন বলল, ”দুধঘাটে ম্যানড্রেক! জেঠু আপনার নাতির কল্পনাশক্তির তারিফ করতেই হবে!”
দিলুর তখন বলতে ইচ্ছে করল, ‘আমিই মিরাকলটা ঘটিয়েছি।’ কিন্তু বাহাদুরি নেওয়া তার স্বভাবে নেই তাই বলতে পারল না। তা ছাড়া যদি প্রমাণ চায়! প্রমাণ তো সে খেয়ে ফেলেছে। কেউ তাকে পেয়ারা ছুড়তে দেখেনি, এই ব্যাপারে সে স্থিরনিশ্চিত। কিন্তু দিলু জানে মোটরবাইকে চড়া টেকো গুন্ডা, ল্যাংড়া ভোলা, তা দেখেছে।
.
কীভাবে যেন রটে গেল পূর্ণেন্দুকে রক্ষা করতে দৈবীশক্তির আবির্ভাব ঘটেছিল। ল্যাংড়া ভোলার দলের বোমা ছোড়ার ওস্তাদ ডেয়ারডেভিল ছেলে শান্টু বোমা ছুড়েই অজ্ঞান হয়ে হয়ে। জ্ঞান ফেরে দুধঘাট থানায়। সে জানায়, কী একটা শূন্য থেকে তার রগে প্রচণ্ড ঘা দিল, তারপর আর কিছু তার মনে নেই। পূর্ণেন্দু, পঞ্চানন বা বাড়ির লোকেরা এবং যারা ছুটে এসেছিল তারা কেউই দেখেনি শান্টুর রগে কে, কী দিয়ে মারল। সবারই একই জিজ্ঞাসা, তা হলে কি ভূতে এসে মারল। না কি হেডমাস্টারের কলকাতা থেকে আসা ভাগ্নে যা বলল, জাদুকর ম্যানড্রেকের মতো পোশাক পরা একটা লোককে পাঁচিল ডিঙিয়ে পালাতে দেখল, সেটাই ঠিক?
