দিলু বলল, ”দাদু, একটা ট্রায়াল দিয়ে দেখব চোঙাটার ক্ষমতা কতটা!”
”কী ট্রায়াল দেবে?”
”এই ধরো চিৎকার করে বলব, ”ডাকাত ডাকাত, বাঁচান বাঁচান, ধরুন ধরুন’।”
আঁতকে উঠে পঞ্চানন বললেন, ”খবরদার, এত রাত্তিরে এই ট্রায়াল দিলে কী হবে জানো? পিলপিল করে পাড়ার লোক বেরিয়ে আসবে আর ভেলোটা সারারাত চিৎকার করে পাড়া মাথায় তুলে রাখবে।”
খাওয়াদাওয়া সেরে দুপুর বারোটা নাগাদ দিলু বন্দুক ঘাড়ে আর পঞ্চানন পেস্টবোর্ডের চোঙা হাতে নিয়ে পূর্ণেন্দুদের বাড়িতে হাজির হল।
বিভা তালা খুলে ওদের ভেতরে নিয়ে এলেন। ”মেসোমশাই আপনারা এসে যে কী ভরসা জোগালেন, পুনু তো আধমরা হয়ে রয়েছে। খালি বলছে, ‘আর কখনও এমন বোকামি করব না, মরে গেলেও করব না,’ আপনি ওকে একটু বুঝিয়ে বলুন তো।”
পঞ্চানন ভেতরে গেলেন, সঙ্গে দিলু। জানলাগুলো বন্ধ, ঘর অন্ধকার।
”পূর্ণেন্দু জানলাগুলো খোলো, দমবন্ধ হয়ে এমনিতেই যে মারা যাবে। ওরা যখন আসবে তখন বন্ধ করে দিও। ভয় কী, আমার সঙ্গে দিলু আছে, বন্দুক আছে, লোক ডাকার জন্য চোঙা আছে।”
পূর্ণেন্দু একটা জানলা খুলে দিয়ে ওদের দিকে তাকাল। একজনের বয়স পঁচাশি, অন্যজনের পনেরো, দেখে সে খুব ভরসা পেল বলে মনে হল না। বলল, ”বন্দুকে গুলি ভরা আছে তো?”
দিলু বলল, ”নিশ্চয় আছে, দেখবেন?” সে বন্দুকের ঘাড় মটকে দেখিয়ে দিল দুটো নলেই কার্ট্রিজ ভরা।
দেখে আশ্বস্ত হল পূর্ণেন্দু। এবার সে আর একটা জানলা খুলল। দিলু জানলার বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল পেয়ারাগাছ, ওপরের ডালে ক্রিকেট বল সাইজের চার—পাঁচটা ডাঁসা ডাঁসা পেয়ারা। তার জিভে জল এসে গেল। সে ফিসফিস করে দাদুকে বলল, ”পেয়ারাগুলো দেখেছ দাদু, দারুণ না?”
পূর্ণেন্দু বলল, ”খেতে ইচ্ছে করছে? যাও পেড়ে খাও। নার্সারি থেকে চারা কিনে এনে বাবা লাগিয়েছিলেন, খুব মিষ্টি, বিচি নেই।”
দিলু ঘর থেকে বেরিয়ে গ্রিলের দরজা খুলে বাইরে থেকে হাত গলিয়ে হুড়কোটা লাগিয়ে দিল। বাঁ দিকে বাড়ির আড়ালে গাছটা। কাঠের গেট থেকে সেটা দেখা যায় না। ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জানলা দিয়ে পঞ্চানন বললেন, ”দাদু, পায়ের আঙুলটায় নজর রেখো, ধাক্কাটাক্কা যেন না লাগে।”
পেয়ারাগুলো মগডালের কাছাকাছি। কীভাবে ওখানে পৌঁছনো যায় সেটা ভাল করে দেখে নিয়ে নীচের একটা মোটা ডাল লাফিয়ে ধরে ঝুলে পড়ল দিলু। দুলতে দুলতে জিমন্যাস্টদের বার—এর ওপর শরীর তুলে নেওয়ার মতো সে নিজেকে তুলে নিল। তারপর এ—ডাল সে—ডাল করে পৌঁছে গেল পেয়ারাগুলোর কাছে। হাত বাড়িয়ে একটা ছিঁড়ে নিয়ে প্যান্টের পকেটে রেখে আর একটা ছিঁড়ল।
ঠিক সেই সময়ই রাস্তায় মোটরবাইকের শব্দ শোনা গেল। দিলু পাতার আড়াল থেকে দেখল জিনসের ফুলহাতা জ্যাকেট গায়ে, মাথায় লাল ক্রিকেট ক্যাপ, চোখে কালো কাচের চশমা পরা একটা মোটা লোক মোটরবাইক চালিয়ে কাঠের গেটের সামনে এসে থামল। বাইকের পেছনে বসে রোগাপটকা একটা ছেলে। পরনে বুশ শার্ট, হাতে একটা ছোট থলি। সে গেটের পাল্লা খুলে ভেতরে ঢুকল। দিলু নিঃশব্দে গাছ থেকে নামতে শুরু করল।
”পূর্ণেন্দু….অ্যাই পূর্ণেন্দু, বাড়ি আছিস।” ছেলেটা কর্কশ স্বরে চিৎকার করে উঠল। ”কদ্দিন ইঁদুরের মতো গর্তে লুকিয়ে থাকবি। বেরিয়ে আয় বাইরে, নইলে পেটো মেরে তোর খুপড়ি উড়িয়ে দোব, তোর বাড়িব সবক’টার লাশ ফেলব।”
ছেলেটা যখন এইসব বলছে দিলু তখন গাছ থেকে নেমে ঘরের দেওয়ালের গা ঘেঁষে এগোচ্ছে। ঘরের জানলাটা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। দেওয়ালের কিনারে এসে খুব সন্তর্পণে একটা চোখ বের করে দেখল ছেলেটা ডান হাত তুলে দাঁড়িয়ে, হাতে ধরা বলের মতো গোল একটা বোমা যাকে পেটো বলে।
দিলুর হাতে পেয়ারা। আপনা থেকেই তার মুঠো শক্ত করে চেপে ধরল সেটা। সেই সময় ঘরের থেকে বেরিয়ে এলেন পঞ্চানন, হাতে বন্দুক।
”কী চাই, কী চাই? ভাগো এখান থেকে, গুণ্ডামি করার আর জায়গা পাওনি। গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দোব।”
দিলু এক চোখ দিয়ে দেখল ছেলেটা দাঁত বের করে হাসছে।
”ওরে বুড়ো ব্যাটা, বন্দুক হাতে খুব রোয়াব দেখছি। ওসব বন্দুক ফন্দুক অনেক দেখা আছে।”
এর পরই প্রচণ্ড একটা শব্দ আর ধোঁয়া। মুহূর্তে দিলুর মাথার মধ্যে লক্ষ ভোল্টের বিদ্যুতের ছোঁয়া লাগল, ঝলসে উঠল বলাইদার কথাগুলো—এর পরই ঘটল সেই মিরাকল, ক্লাইন হলের প্রথম বলটা লেগের দিকে ঠেলে দিয়েই ছুটল। বারো গজ দুর থেকে সলোমন ছোঁ মেরে বলটা তুলে নিয়েই ছুড়ল। ধীরে সুস্থে টিপ করে ছোড়ার সময় ছিল না। মাত্র একটা স্ট্যাম্প ছাড়া আর কিছু—দিলু দেওয়ালের আড়াল থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল। টিপ করে ধীরেসুস্থে ছোড়ার সময় নেই। সে পেয়ারাটা ক্রিকেট বল ছোড়ার মতো ছুড়ল ছেলেটার মাথা লক্ষ্য করে।
”বাপস”, মাত্র একটা শব্দ করেই ছেলেটা গাছের কাটা ডালের মতো পড়ে গেল। পেয়ারাটা তার বাঁ কানের পাশে রগে লেগেছে।
মোটরবাইকের এঞ্জিন বন্ধ না করে লোকটা সিটে বসে ছিল। ছেলেটাকে পড়ে যেতে দেখে এঞ্জিন বন্ধ করে বাইকটাকে দাঁড় করিয়ে রেখে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে এল। দিলু এবার পকেট থেকে দ্বিতীয় পেয়ারাটা বের করল। লোকটা তার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে মুখের সামনে হাত তোলার আগেই পেয়ারাটা বের করল। লোকটা তার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে মুখের সামনে হাত তোলার আগেই পেয়ারাটা দুই চোখের মাঝে নাকে গিয়ে লাগল।
