”দাদু, এখানে তো খেলার কোনও সুযোগই নেই।” দিলু বঁড়শি জলে ছুড়ে দিয়ে বলল।
”কে বলল নেই? কোন খেলাটা খেলতে চাও? ফুটবল, কবাডি, ভলি, খো খো, ক্রিকেট—”
”ক্রিকেট আছে!” দিলু একটু অবাক হয়ে বলল।
”অবশ্যই। তুমি কি দুধঘাটকে অজ পাড়াগাঁ ভেবেছ? পলিউশান, মিছিল, ট্রাফিক জ্যাম, উৎকট শব্দ, নোংরা ছাড়া কলকাতায় আর যা যা পাওয়া যায় তার অনেক কিছুই এখানে পাবে, মায় ডাকাত—গুণ্ডা ক্রিকেটও। ফুটবল—ক্রিকেটের কোচিং সেন্টার পর্যন্ত আছে। এখানে অনেক খেলার টুর্নামেন্ট হয়। পরীক্ষার জন্য খেলাধুলো এখন বন্ধ, শেষ হলেই শুরু হয়ে যাবে। আশপাশের সাত—আটটা গ্রামের ছেলেরা আসে খেলতে। তুমি বরং এখানে থাকো, সঙ্গীসাথী অনেক পেয়ে যাবে, টানো টানো—” পঞ্চানন চেঁচিয়ে উঠলেন।
সচকিত হয়ে দিলু বড়শিতে টান দিল। দাদুর কথা শুনতে শুনতে ফাতনা থেকে চোখ সরে গেছল। মাছ উঠল না। পঞ্চানন হাসতে হাসতে বললেন, ”ফাতনা থেকে চোখ একদম সরাবে না।”
দিলুর মনে পড়ল বলাইদার একটা কথা—”ব্র্যাডম্যান যখন ব্যাট করতেন, বল থেকে একদম চোখ সরাতেন না।” কী আশ্চর্য, দাদু হুবহু একই কথা বললেন, তবে ব্যাটিংয়ের নয়, মাছ ধরার সম্পর্কে। সে ছিপ গুটিয়ে বলল, ”আজ এই পর্যন্ত, আবার কাল হবে।”
পঞ্চানন বললেন, ”কাল দুপুরে কিন্তু পূর্ণেন্দুদের বাড়িতে পাহারায় বসতে হবে। তুমি সঙ্গে যাবে তো?”
”সঙ্গে করে বন্দুকটা নেবে কিন্তু।”
রাত্রে খেতে বসে হরিসাধন বললেন, ”শুনেছ বাবা কাল সকালে নেতাজি কলোনিতে কী কাণ্ড হয়েছে, আজ আমাদের রাধুবাবুর কাছে শুনলুম সব।”
পঞ্চানন অবাক হয়ে বললেন, ”কিছু শুনিনি তো, কী হয়েছে?”
”দোকানে বসে চা খাচ্ছিল লালু নামের একটা ছেলে, বছর চব্বিশ বয়স। তখন অটো রিকশায় দুটো লোক এসে দোকানের সামনে দাঁড়ায়, ওদের দেখেই লালু ছুটে দোকানের মধ্যে ঢুকে যায়। অটো থেকে নেমে দুটো লোক ওকে তাড়া করে দোকানে ঢুকে দুটো বোমা ফাটিয়ে অটোয় চেপে পালাতে থাকে। রাস্তার লোক অটোটাকে তাড়া করলে ভিড়ের মধ্যে জোরে চালাতে গিয়ে অটোটা উলটে যায়।”
দিলু বলে উঠল, ”তারপর লোকেরা ওদের ধরে গণপ্রহারে মেরে ফেলল, তাই তো?”
”সেটাই হয়ে থাকে।” হরিসাধন হেসে বললেন, ”এক্ষেত্রে তা হয়নি। লোকেরা ওই দু’জনকে আর অটোর ড্রাইভারকে ধরে রেখে থানায় খবর দেয়, পুলিশ এসে তিনজনকে ধরে নিয়ে যায়। আর লালুকে হাসপাতালে পাঠায়, ইনজুরি খুব বেশি নয়, বোধ হয় বেঁচে যাবে।”
পঞ্চানন জিজ্ঞেস করলেন, ”ছেলেটাকে মারতে এসেছিল কেন?”
”লালুও একটা গুণ্ডা, ল্যাংড়া ভোলার দলের। আর যারা ওকে মারতে এসেছিল তারা বাপির দলের। ট্রেনে যাকে গুলি করে মারল সে বাপির দলের ছেলে, আর তাকে মারল ল্যাংড়া ভোলার লোকেরা। খুনের বদলা নিতে আজ এসেছিল বাপিরা। এই ভোলার লোকেদের একজনকেই সেদিন পূর্ণেন্দু ট্রেনে জাপটে ধরেছিল। আর দু’জন ট্রেন থেকে নেমে পালায়। পুলিশ সন্দেহ করছে সেই পালানোদের একজন হল এই লালু।”
দিলু বলল, ”এই লালুই ট্রেনের খুনিদের একজন কি না সেটা তো সবচেয়ে ভাল বলতে পারবে পূর্ণেন্দুদা, উনি তো খুব কাছের থেকে দেখেছেন।”
হরিসাধন বললেন, ”দেখেছে বলেই তো ওর প্রাণসংশয়। ল্যাংড়া ভোলা তো সেজন্যই পূর্ণেন্দুকে খুঁজছে। ও যদি বলে, হ্যাঁ এই লোকটা সেদিন ট্রেনে খুনির দলে ছিল তা হলে পুলিশ লালুকে অ্যারেস্ট করবে। ভোলা এখন চাইবে পূর্ণেন্দুকে চুপ করিয়ে দিতে। কী গেরোয় যে ছেলেটা পড়ল, কেন যে গুণ্ডাকে জাপটে ধরতে গেল।”
পঞ্চানন রাগ চেপে গম্ভীর স্বরে বললেন, ”তুই কি বলতে চাস পূর্ণেন্দু অন্যায় কাজ করেছে?”
বাবার গলার স্বরে থতমত হরিসাধন বললেন, ”অন্যায় করেছে বলছি না, তবে এখন যা সময় পড়েছে তাতে—।”
”তাতে কী?”
”গুণ্ডা বদমাশদের না ঘাঁটানোই ভাল।”
”চোখের সামনে খুন করতে দেখলেও মুখ ঘুরিয়ে থাকবে, খুনিকে ধরার চেষ্টা করবে না। তুই একজন শিক্ষক হয়ে এই কথা বলছিস!”
বাবার ধমক খেয়ে তখন হরিসাধন মুখ নামিয়ে মৃদু স্বরে বললেন, ”চেষ্টা করে কী লাভ হল, এখন তো নিজেই বাড়ি থেকে বেরোতে পারছে না। ওরা তো বাড়িতে এসেও মেরে ফেলতে পারে, যা দিনকাল।”
দিলু এইবার কথা বলল, ”ইসস মারা যেন খুব সোজা, আমি আর দাদু কাল থেকে বন্দুক নিয়ে দুপুরে ওদের বাড়িতে বসে পাহারা দোব, আসুক না গুণ্ডারা, দেখা যাবে।”
হরিসাধন অবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকালেন। পঞ্চানন বললেন, ”দুপুরে পাড়ার ছেলে—ছোকরারা থাকে না, ঠিক করেছি ওই সময়টায় বন্দুক নিয়ে পাহারা দোব পুর্ণেন্দকে।”
”বাবা, গুণ্ডা বদমাশদের কাছে সকাল দুপুর বিকেল রাত বলে কোনও সময় নেই। যখন ইচ্ছে তখন, যেখানে ইচ্ছে সেখানে ওরা খুন করে গটগটিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। কাগজ খুললেই রোজ একটা দুটো এমন ঘটনার খবর তুমি দেখতে পাবে। পাহারা দেবে দাও সেইসঙ্গে একটা চোঙাও হাতে রেখো, মুখে দিয়ে চেঁচিয়ে লোক জড়ো করতে হবে তো।”
হরিসাধনের পরিহাসটা গায়ে না মেখে পঞ্চানন নাতির দিকে তাকিয়ে ভ্রূ নাচালেন। ভাবখানা এমন, দেখেছ কী বুদ্ধি! দিলু চোখ টিপে সায় দিল।
রাতে পঞ্চানন খুঁজেপেতে একটা বড় পেস্ট বোর্ডের টুকরো জোগাড় করলেন, পানের খিলি সাজার মতো গোল করে পাকিয়ে চারটে আলপিন দিয়ে আঁটলেন! চোঙাটার মুখের দিকটা সরু, অনেকটা তালপাতার ভেঁপুর মতো, তবে যথেষ্ট মোটা।
