বলাইদা যেন মাঠে বসে নিজের চোখে ম্যাচটা দেখেছেন এমনভাবে প্রথমদিন থেকে শেষদিন পর্যন্ত বর্ণনা দিয়েছিলেন:
”মিরাকল ছাড়া আর কী বলব। জেতার জন্য অস্ট্রেলিয়ার দরকার তিন রান, বাকি রয়েছে তিন বল, হাতে দুটো উইকেট। হলের বলে মেকিফ ব্যাট চালালো। বল স্কোয়ার লেগ বাউন্ডারির কাছে বড় বড় ঘাসে আটকে থেমে গেল। তীরবেগে ছুটে এসে হান্ট বলটা তুলে নিয়ে প্রায় নব্বই গজ দূর থেকে ছুড়ল। নিখুঁত ছোড়া, সোজা আলেকজান্ডারের গ্লাভসে। তখন দুটো রান নেওয়া হয়ে গেছে, তার মানে ম্যাচ টাই হয়ে গেছে। জিততে হলে আর একটা রান দরকার, ওরা সেই তৃতীয় রানটা নেওয়ার জন্য দৌড়ল। তখনই আলেকজান্ডারের হাতে বলটা পৌঁছল। গ্রাউট ডাইভ দিয়েও রান আউট থেকে রক্ষা পেল না। স্কোর তখন সাতশো সাঁইত্রিশ অল। দু’বল বাকি, জিততে এক রান দরকার। ক্লাইন এল ব্যাট করতে। এর পরই ঘটল সেই মিরাকল। ক্লাইন হলের প্রথম বলটা লেগের দিকে ঠেলে দিয়েই ছুটল। বারো গজ দূর থেকে ছোঁ মেরে সলোমন বলটা তুলেই ছুড়ল। ধীরেসুস্থে টিপ করে ছোড়ার সময় ছিল না। মাত্র একটা স্টাম্প ছাড়া আর কিছু তার নজর করার ছিল না। যদি ফসকাত তা হলে মেকিফ পৌঁছে গিয়ে অস্ট্রেলিয়া জিতে যেত। বলটা কিন্তু সোজা গিয়ে লাগল স্টাম্পে। এক বল বাকি থাকতে ম্যাচ টাই, একে দৈব ঘটনা ছাড়া আর কী বলব।”
দিলু বিড়বিড় করল, ”মিরাকল, মিরাকল। আমারটাও মিরাকল।”
দাদু ঠিক যেমনটি বলেছিল সেইভাবেই বন্দুকটা ধরে গুলিটা ছুড়েছিল। কাঁধে একটা ধাক্কা লেগেছিল মাত্র। ছররাগুলো লেগেছে এচোড়ের বোঁটার কাছে। তার টিপ যে ভাল এটা সে ক্রিকেট মাঠে ফিল্ড করার সময় জেনে গেছল। ম্যাচে গোটা দুয়েক রান আউট সে করবেই।
বিছানা থেকে উঠে দিলু বারান্দায় এল। সারা বাড়ি নিঝুম। পাশের ঘরটা বোকামামার। মামি এখন বোধ হয় ঘুমোচ্ছে। মামা স্কুলে। হাওয়াই চটিটা পায়ে দিয়ে দিলু নীচে নেমে এল। দালানে মাদুরে শুয়ে পাশ ফিরে হর্ষমুখী ঘুমোচ্ছে। দিলুর চটির শব্দে সে শোয়া অবস্থাতেই বলল, ”কে রে?”
”আমি দিলু।”
”কোথায় চললে?” হর্ষ উঠে বসল।
”ভাল লাগছে না। যাই একটু বাইরে ঘুরে আসি।”
”ভাল না লাগলে কাজ করো, জগৎ সংসার ভুলে থাকতে চাও যদি তা হলে মাছ ধরো। চলো তোমাকে একটা ছিপ দিচ্ছি।”
হর্ষ ভাঁড়ার ঘর থেকে পাঁচ হাত লম্বা বাঁশের কঞ্চি আনল। তার সরু প্রান্তটিতে প্রায় সাত হাত লম্বা শক্ত সুতো বাঁধা, সুতোর মাঝামাঝি বাঁধা শোলার চার ইঞ্চি একটা কাঠি, এটা ফাতনা। সুতোর প্রান্তে জিজ্ঞাসা চিহ্নের মতো সরু তারের বঁড়শি। ছিপটা, কলাপাতায় একমুঠো ভাত আর একটা বড় প্লাস্টিকের মগ হর্ষ দিলুর হাতে দিয়ে বলল, ”যাও ঘাটের নীচের ধাপে বসে পুঁটিমাছ ধরো আর এই মগে মাছ রাখো। দেখবে কেমন মজা লাগবে।”
দিলু লাজুক স্বরে বলল, ”কী করে ধরতে হয় একটু দেখিয়ে দেবে, কখনও তো মাছ ধরিনি।”
সে হর্ষর সঙ্গে পুকুরঘাটে এল। সিঁড়ির ধারের দিকে দাঁড়িয়ে বঁড়শিতে ভাত গেঁথে হর্ষ ছিপটা বাতাসে ছপাৎ করে মারল। বঁড়শিটা দূরে জলে গিয়ে পড়ল। বঁড়শি ডুবে গিয়ে ফাতনাটা ভাসছে।
”এবার ফাতনাটাকে নজর করো।”
দিলু দেখল একটু পরেই জলে স্থির হয়ে ভাসা ফাতনাটা তিরতির করে নড়ে উঠল। হর্ষ ছিপটা শক্ত করে ধরল। তার চোখ তীক্ষ্ন, ঠোঁটের কোণে হাসি।
”মাছ এখন ঠোকরাচ্ছে।”
ফাতনাটা একটা ডুব দিতেই সঙ্গে সঙ্গে হর্ষ ছিপে হ্যাঁচকা টান দিল। আঙুলখানেক লম্বা একটা পুঁটি বঁড়শিতে ছটফটাচ্ছে। মাছটাকে মুঠোয় ধরে হর্ষ বলল, ”এবার দেখো কী করে বঁড়শিটা মাছের মুখ থেকে ছাড়িয়ে নেবে।”
দিলু মন দিয়ে দেখল হর্ষ কীভাবে মাছের মুখের মধ্য থেকে বঁড়শিটা বের করল।
”এইবার তুমি নিজে মাছ ধরো, এ পুকুর পুঁটিমাছ ভরা। মাছ ধরে এই মগে রাখবে। আমি যাচ্ছি।” হর্ষ চলে গেল।
যেমনটি দেখিয়ে দিয়েছিল হর্ষ, সেইভাবে দিলু গভীর মনোযোগে আধঘণ্টায় আটবার ব্যর্থ হয়ে তিনটে পুঁটি বঁড়শিতে গেঁথে তুলল। তাইতে সে এত আনন্দ পেল যে, তার মনে হল ম্যাচে আট ওভার বল করে তিনটে উইকেট যেন পেয়েছে।
”কী দাদু, ক’টা হল?” পঞ্চানন বারান্দায় দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বললেন।
”তিনটে, তবে হ্যাটট্রিক নয়।”
”হবে, হবে, এই তো সবে হাতেখড়ি। উইকেটের চরিত্র, ব্যাটসম্যানের মেজাজ ভাল করে বুঝে নাও, তারপর বড় হুইল ছিপ দোব। তখন আর চুনোপুটি নয়, রুই—কাতলা খেলিয়ে তুলবে।”
পঞ্চানন নীচে নেমে এসে ঘাটের সিঁড়িতে দাঁড়ালেন। দিলু তখনই টান মেরে বঁড়শি তুলল। তাতে মাছ নেই, ভাতও নেই।
ঠাট্টা করে পঞ্চানন বললেন, ”রান চুরি করে ব্যাটসম্যান পালাল। রান আউট করতে পারলে না। শুনেছি বড় বড় অনেক ক্রিকেটারের নাকি মাছধরার নেশা আছে, সত্যি?”
দিলু বঁড়শিতে ভাত গাঁথতে গাঁথতে বলল, ”আমিও শুনেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একমনে ফাতনার দিকে তাকিয়ে কনসেনট্রেট করলে নাকি ব্যাটিংয়ের সময় সেটা কাজে লাগে। জানি না কথাটা সত্যি কি না, তবে মাছের সঙ্গে একটা বুদ্ধির লড়াই যে হয় পুঁটিমাছগুলো আমাকে তা টের পাইয়ে দিয়েছে। দাদু, আমার কিন্তু বেশ মজা লাগছে।”
”তা হলে মামার বাড়িতে থেকে যাও।”
দিলু বঁড়শি ছুড়তে গিয়ে থমকে গেল। কলকাতার বাড়িটা তার ভাল লাগে না ঠিকই, কিন্তু বাড়ির বাইরে অনেক বন্ধু আছে, ক্রিকেট আছে, ম্যাচ খেলা আছে, হার—জিতের উত্তেজনা আছে। কিন্তু এখানে কী আছে? এখানে তো একা—একাই থাকতে হবে, বাড়িতে সমবয়সী কেউ নেই যার সঙ্গে সমানে—সমানে কথা বলা যাবে। এটা ঠিকই সে নারকেল গাছে উঠতে পারে না, সাঁতার জানে না কিন্তু প্রথমবার বন্দুক হাতে নিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছে সে কী করতে পারে।
