পঞ্চানন বন্দুকটা দিলুর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ”দাদু, এবার তুমি ছোড়ো।”
দিলু আগে থেকেই নজর করেছিল বাগানে গাছে ঝুলে থাকা একটা এঁচোড়কে। বন্দুকটা হাতে পেয়ে সময় নষ্ট না করে এবং দাদু বুঝে ওঠার আগেই সে এঁচোড়টা তাক করে ট্রিগার টানল। আবার একটা প্রকৃতির শান্ততা এলোমেলো করা শব্দ। পাখিদের ভীত স্বরে ওড়াউড়ি, ভেলো দিশাহারা ডাক ডাকতে ডাকতে ছুটল বাছুরটারই দিকে, বাছুরটা ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠে ছুটতে ছুটতে গিয়ে পড়ল পুকুরে।
এঁচোড়টা গাছ থেকে জমিতে পড়ে গড়াগড়ি যাচ্ছে। দেখে দিলুর রোমাঞ্চ হল। প্রথম গুলি ছোড়াতেই সে শিকার করে ফেলেছে। পঞ্চানন মুগ্ধ স্বরে বলে উঠলেন, ”শাবাশ দাদু, শাবাশ।”
তখনই মেয়েটির আর্ত চিৎকার তারা শুনল, ”ওগো বাঁচাও, বাছুর ডুবে যাচ্ছে, বাঁচাও।”
দিলু বারান্দা থেকে দেখল বাছুরটা সাঁতরে পাড়ের দিকে এসেছে কিন্তু পাড়টা খাড়াই, ওখানে জল গভীর, দাঁড়াবার মতো তল নেই। বেচারা আঁকুপাকু করছে জমি পাওয়ার জন্য। কিন্তু পাচ্ছে না। ওর মা পাড়ের কিনারে এসে ডাকছে আর চারদিকে তাকাচ্ছে উদভ্রান্ত বিস্ফারিত চোখে।
মেয়েটি ছুটতে ছুটতে বারান্দার নীচে এল। মুখ তুলে চেঁচিয়ে বলল, ”ও দাদু, বাছুরটাকে তুলে দাও না, ও ডুবে মরে যাবে যে।”
দিলুর ইচ্ছে করল, বারান্দা থেকে লাফিয়ে পড়ে বাছুরটাকে জল থেকে তুলে আনতে। হায়, সে তো কলকাতার হাজার হাজার ছেলের মতো সাঁতার জানে না। বাছুর না হয়ে যদি মানুষের বাচ্ছা হত তা হলেও সে দূর থেকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারত না। সে ছয় মারতে পারে, জলে ঝাঁপ দিতে পারে না।
বারান্দা থেকে অসহায় দৃষ্টি ছাড়া আর কিছু না পেয়ে মেয়েটি সময় নষ্ট না করে বাড়ির ভেতরে ছুটে গেল, ”মামি ও মামি, ও হষ্য মাসি—” বলতে বলতে।
এর পরই দিলু দেখল, তার পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী মামি সুলেখা শাড়িটাকে গাছকোমর বাঁধতে বাঁধতে একটা ওলিম্পিক স্প্রিণ্টারের মতো ছুটে যাচ্ছে। বাছুরটা তখন জলে ডুবছে আর উঠছে। মামি পুকুরের পাড় থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দু—তিনটি হাত পাড়ি দিয়ে বাছুরটার কাছে পৌঁছে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
পঞ্চানন ও দিলু যখন নীচে নেমে ঘাটে পৌঁছল তখন হর্ষ সেখানে এসে গেছে, আর সুলেখাও বাছুরটাকে বুকে জড়িয়ে সাঁতার কেটে ঘাটের নীচের ধাপে এসে দাঁড়িয়েছে। হর্ষ জলে নেমে বাছুরটাকে দু’হাতে তুলে ঘাটের ওপরের ধাপে এনে শুইয়ে দিল। জল খাওয়ার জন্য বাছুরটা বমি করছে। ছুটতে ছুটতে ওর মা এসে গেল। জিভ দিয়ে সে চাটতে শুরু করল বাছুরটার মাথা পিঠ বুক।
সুলেখা হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, ”হষ্য, উনুনে পোস্ত চাপিয়ে এসেছি, দৌড়ে যা। এতক্ষণে বোধ হয় পুড়ে গেছে।”
পঞ্চানন বললেন, ”যাক পুড়ে। বউমা, তুমি না এসে পড়লে বাছুরটাকে আর বাঁচানো যেত না।”
”বাবা আমি বাঁচাবার কে, ভগবতীর সন্তান, মা—ই বাঁচিয়েছেন।” সুলেখা দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকালেন।
দিলু ফিসফিস করে দাদুকে বলল, ”আমাকে সাঁতার শিখিয়ে দেবে?”
”দোব। বাসুর পরীক্ষাটা হয়ে যাক, ওকে বলব, ও ভাল সাঁতার জানে।”
”তুমি জানো না?”
”জানি। তবে এই পঁচাশি বছর বয়সে জলে নামার ক্ষমতা আর নেই। দেখলে না বাছুরটা ডুবছে দেখেও দাঁড়িয়ে রইলুম।” বিষণ্ণ হতাশ স্বরে পঞ্চানন বললেন। দাদুর মুখ অপরাধীর মতো দেখাচ্ছে দেখে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো স্বরে দিলু বলল, ”তোমার আর দোষ কী, বয়স তো সব মানুষেরই হয়, ইয়ং ম্যানের মতো ক্ষমতা কি চিরকাল কারুর থাকে? বুড়ো হলে আমারও থাকবে না।”
পঞ্চানন হেসে ফেললেন নাতির বিজ্ঞের মতো কথা শুনে। বললেন, ”ক্ষমতা থাকতে থাকতে একটা দাগ কেটে যাও।”
দিলু অবাক হয়ে বলল, ”দাগ। সে আবার কী!”
”মানুষ হয়ে জন্মেছ যখন এমন কিছু একটা করো যা চিরকাল সবার মনে থাকবে। আমার কথা নয়, স্বামীজির কথা।”
দিলু ভুরু কোঁচকাল। স্বামীজি! দাদু বোধ হয় স্বামী বিবেকানন্দর কথা বলছেন। সে নাম শুনেছে কিন্তু ওঁর কোনও লেখা পড়েনি। বই পড়তে তার ভাল লাগে না।
দুপুরে ঘুম আসে না দিলুর। কলকাতায় হয় তখন স্কুলে এবং ছুটি দিন হলে খেলার মাঠে। খেলা থাকলে স্কুল পালিয়ে খেলতে যায়, বাড়ির কেউ তা জানে না। দুপুরে ঘুমন্ত দাদুর পাশে চিত হয়ে শুয়ে দেওয়ালে ঝোলানো বন্দুকটার দিকে তাকিয়ে সে চলচ্চিচত্রের মতো মনের মধ্যে দেখে যাচ্ছে সকাল থেকে যা যা ঘটেছে।—দাদুর কাছে বাসুর ট্রানস্লেশন করা, নারকেল গাছে বাসুর ওঠা, সেখান থেকে পুকুরে ঝাঁপ দেওয়া, খচাখচ কাটারি দিয়ে ডাব কাটা। এর একটাও সে করতে পারবে না। এর পর পূর্ণেন্দুদের বাড়ি যাওয়া, সেখান থেকে ফিরে বন্দুক থেকে প্রথমবার গুলি ছুড়েই গাছ থেকে এঁচোড় ফেলে দেওয়া…ভাবতেই দিলুর শরীর গরম হয়ে উঠল। এটা তো মিরাকল। কীভাবে যেন ঘটে গেল। এটা দৈব ঘটনা ছাড়া আর কী হতে পারে!
এরকম ঘটনা তো ক্রিকেটেও ঘটেছে। দিলুর মনে পড়ল বিজয়ী সঙ্ঘের সঙ্গে সালকিয়ায় গিয়েছিল ম্যাচ খেলতে, অবশ্য রিজার্ভ প্লেয়ার হিসেবে। হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি নেমে মাঠে জল জমে গেল, খেলা বন্ধ। টিমের স্কোরার বলাইদা জমিয়ে ক্রিকেটের গল্প বলেন। তিনি শুরু করলেন ষাট সালে ব্রিসবেন মাঠে পৃথিবীতে প্রথম টাই হওয়া টেস্ট ম্যাচের গল্প। সেই টেস্ট খেলেছিল বিচি বেনোর অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ফ্রাঙ্ক ওয়ারেলের ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দু’দলেই বাঘা বাঘা প্লেয়ার। একদিকে সোবার্স, কানহাই, হল, হান্ট, রামাধিন, ভ্যালেন্টাইন, অন্যদিক ববি সিমসন, ডেভিডসন, হার্ভি, ও’নিল, গ্রাউট, ম্যাকডোনাল্ড, ক্লাইনের মতো ক্রিকেটাররা।
