গ্রিলের দরজা ভেতর থেকে তালা দেওয়া। বিভা চাবি দিয়ে তালা খুলে বললেন, ”ছেলেরা এইমাত্র বেরোল। কলেজ, আপিস কামাই করে বাড়িতে বসে পাহারা ক’দিন দেবে। ভগবান আছেন দেখবেন, আর আছেন আপনারা। দাঁড়িয়ে কেন, বসুন।”
পঞ্চানন চেয়ারে বসলেন। এই সময় বারান্দার পেছনের ঘরের জানলার একটা পাল্লা ফাঁক করে উঁকি দিল একটা মুখ। চোখ দুটিতে ভয় চাপার চেষ্টা। দিলুর মনে হল এই লোকটিই পূর্ণেন্দু।
পঞ্চানন তাকে দেখে বললেন, ”বেরিও না এখন ঘর থেকে। অত ভয় পাওয়ারই বা কী আছে, আমরা তো রয়েইছি। তেমন কিছু মনে হলে আমাকে ডেকো।”
পূর্ণেন্দু বলল, ”দুপুরে আপনাকে ডাকতে হলে তো মাকে বাড়ি থেকে বেরোতে হবে, তখন যদি ঢুকে পড়ে। দেখছেন তো বাড়িটা একদম খোলা, কোনওরকম প্রোটেকশন নেই।”
দিলু এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। এইবার বলল, ”দাদু, আমরা এসে তো দুপুরে থাকতে পারি। তুমি বন্দুকটা হাতে নিয়ে থাকবে। গুণ্ডারা এলেই গুলি চালাবে।”
”ঠিক বলেছিস।” পঞ্চানন উৎসাহে চেয়ার থেকে লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করলেন, পারলেন না। হাঁটুতে বাতের উপদ্রব ঘটল। ”বন্দুক তো সেইজন্যই রাখা, ডাকাত গুণ্ডা তাড়াবার জন্য।”
দিলু বলল, ”তা ছাড়া বন্দুকে যাতে জং না ধরে সেজন্য মাঝে মাঝে ওটা ছোড়াও দরকার।”
বিভা জানতে চাইলেন, ”মেসোমশাই, এই ছেলেটি কেন?”
”নাতি, মলুর ছেলে। বেড়াতে এসেছে। ভাল লাগলে থেকে যাবে, এখানেই পড়াশুনো করবে বোকার স্কুলে।”
দিলু বলল, ”দাদু তা হলে কি আজ দুপুর থেকেই পাহারায় বসবে।”
”আজ নয়। বন্দুকটা ঠিক আছে কি না, কার্ট্রিজগুলো ছ’সাত বছর পড়ে রয়েছে, সেগুলো ফাটবে কিনা আগে পরখ না করে কি পাহারায় বসা যায়?”
বিভা ভেতরে গিয়ে একটা প্লেটে চারটে নারকেল নাড়ু আর এক গ্লাস জল নিয়ে এসে বললেন, ”প্রথম এলে, একটু মিষ্টিমুখ করো।”
দিলু ইতস্তত করছিল, পঞ্চানন চোখের ইশারায় খেয়ে নিতে বললেন।
বাড়ি ফেরার সময় দিলু বলল, ”দাদু, তুমি বলেছিলে বন্দুক চালানো শিখিয়ে দেবে, এবার সেটা শিখিয়ে দাও, তা হলে কার্ট্রিজ আর বন্দুকটা ঠিক আছে কি না তাও সেইসঙ্গে দেখা হয়ে যাবে।”
”হ্যাঁ, এটা একটা যুক্তি বটে।” পঞ্চানন নাতির পিঠ চাপড়ে বললেন।
.
দোনলা বন্দুকটার ঘাড় মটকে দিয়ে পঞ্চানন এক চোখ বন্ধ করে পরপর নলের ভেতরে তাকালেন, গন্ধ শুঁকলেন, নাক কোঁচকালেন।
”বহুকাল পরিষ্কার করা হয়নি। আগে একটু তেল দিয়ে পরিষ্কার করেনি।”
পঞ্চানন আলমারি থেকে একটা শিশি বের করলেন। খুঁজে—পেতে একটা আড়াই হাত লম্বা কঞ্চি জোগাড় করে তার মাথায় ন্যাকড়া বেঁধে তাতে তেল ঢাললেন। এবার কঞ্চিটা নলের মধ্যে ঢুকিয়ে ঘষাঘষি করে ধুলোময়লা সাফ করলেন। সেফটি ক্যাচ দুটো টেনে পরপর ট্রিগার টিপলেন, খটাস খটাস শব্দ হল। বন্দুকের মটকানো ঘাড় সোজা করে, বাঁটটা বগলের কাছে কাঁধে ঠেকিয়ে বন্দুক তুলে বারান্দার বাইরে নারকেল গাছের দিকে তাক করলেন।
দিলু একমনে দাদুর সবকিছু লক্ষ করে যাচ্ছিল। এ পর্যন্ত যতটুকু দেখল তাতে তার মনে হলে বন্দুক ছোড়ার মধ্যে জটিলতা কিছু নেই। খেলনা পিস্তলে ক্যাপ লাগিয়ে সেফটি ক্যাচটা টেনে আঙুল দিয়ে ট্রিগার টেনে দিলে ‘ফটাস’ শব্দ হয়, সত্যিকারের বন্দুকে হয় ‘গুড়ুম’। তবে বন্দুক ধরা হাতটা স্থির রাখা দরকার আর নিশানাটাকে ঠিকভাবে একদৃষ্টে দেখা। ফাস্ট বোলার যখন ডেলিভারি করছে তখন ব্যাটসম্যান যেমন মাথাটা অনড় রেখে অপেক্ষা করে বলটাকে একদৃষ্টে লক্ষ করার জন্য, দিলুর মনে হল এটাও অনেকটা সেইরকম। তবে শুটার হওয়া তার ইচ্ছে নয়, সে হতে চায় ব্যাটসম্যান। শুধু শখ মেটানোর জন্য সে একবার বন্দুক ছুড়তে চায়।
পঞ্চানন একটা ছোট কাঠের বাক্স আলমারির মাথা থেকে নামালেন। ডালাটা খুলে তিনি দিলুকে বললেন, ”এই হচ্ছে কার্ট্রিজ, যাকে বাংলায় বলে কার্তুজ।”
দিলু দেখল ক্রিকেট বলের রঙের ইঞ্চি চারেক লম্বা মোটা চুরুটের মতো গোলাকার গোটাদশেক কার্ট্রিজ। একদিকটা পেতলে মোড়া, তবে মধ্যিখানে ছোট্ট একটা তামার টিপ। পঞ্চানন বুঝিয়ে দিলেন, ট্রিগার টিপলে এই তামাটায় সেফটি ক্যাচটা ঘা দেয়। আর তখনই ফায়ার হয়।
দিলু বলল, ”দাদু, তুমি আগে একটা গুলি ছুড়ে দেখাও, তারপর আমি ছুড়ব।”
পঞ্চানন দুটো নলে দুটি গুলি ভরলেন। বারান্দায় এসে এ—ধার ও—ধার তাকালেন, গুলি কোনদিকে কোথায় ছুড়বেন সেই লক্ষ্যটা নির্বাচন করতে। কিছুই তাঁর মনে ধরল না। অবশেষে নীচে তাকিয়ে চোখ পড়ল পুকুরে। ঠিক করলেন, জলেই গুলি ছুড়বেন।
”এইবার দেখো, বাঁ পা—টা একটু সামনে বাড়িয়ে বন্দুকের নলের এই জায়গাটা বাঁ হাতের চেটোর ওপর রেখে, বাঁটটা কাঁধের এইখানে চেপে নলের শেষে সর্ষে দানার মতো যে মাছিটা রয়েছে, একচোখ বন্ধ করে, মাছিটাকে তোমার টার্গেটের সমান লাইনে রাখো। ব্যাপারটা বুঝেছ?”
দিলু লক্ষ করছিল দাদুর ভাবভঙ্গি। পুকুরের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে ধরতেই সে সামনে তাকাল। তখন পুকুরের অপর পাড়ে একটা দশ বারো বছরের মেয়ে দড়ি ধরে একটা খয়েরি রঙের গোরুকে নিয়ে যাচ্ছে, পেছনে বাছুর।
পুকুরের মধ্যিখানে তাক করে পঞ্চানন ট্রিগার টিপলেন। নিস্তব্ধ পরিবেশ খানখান করে বন্দুকের শব্দ হতেই কোথা থেকে ভেলো ঘেউ ঘেউ ডেকে উঠল, গোরুটা থমকে দাঁড়িয়ে হাম্বা রব তুলে বাছুরের দিকে এগিয়ে গেল, গাছগুলো থেকে গোটা তিরিশ পাখি নানান রকম স্বরে ডাকতে ডাকতে ওড়াউড়ি শুরু করল।
