ডাবটা হাতে নিয়ে দিলু বলল, ”অত ওপর থেকে ঝাঁপ দিতে তোমার ভয় করল না?”
বাসু আবার হেসে মৃদুস্বরে বলল, ”না।”
ছোট ছোট ডাব, দিলু চারটে ডাবের জল খেল, ওরা কেউ খেল না। বাকি ডাবদুটো বাসু ভেতরে নিয়ে গেল। এই সময় দুটি ছেলে পঞ্চাননের সঙ্গে কথা বলতে এল।
তাদের একজন বলল, ”জ্যাঠামশাই, লালুদা জানাল, কাল দুপুরে দুটো অচেনা লোক ওর দোকানে এসে পূর্ণেন্দুর খবর নিয়েছিল। লালুদা তখন দোকানে ছিল না, ওর কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করে পূর্ণেন্দু বাড়ি থেকে বেরোয় কি না, বেরোলে কখন বেরোয় কোনদিকে যায়। আমাদের কিন্তু ব্যাপারটা সুবিধের মনে হচ্ছে না। আজ রাত থেকেই পাহারায় বেরোতে হবে। বড় টর্চ, লাঠি সবার তো নেই, তাই জোগাড় করতে বেরিয়েছি। আপনার কাছে কী আছে?”
পঞ্চানন বললেন, ”লাঠি তো নেই ছড়ি আছে, তাই দিয়ে তো গুণ্ডা সামলানো যাবে না। টর্চ আছে চার ব্যাটারির, সেটা দিচ্ছি। দিলু, দৌড়ে দোতলায় গিয়ে আমার ঘরের টেবলে একটা টর্চ আছে সেটা নিয়ে এসো তো।”
দিলু টর্চ এনে দিতে সেটা নিয়ে ছেলেদুটি চলে গেল।
”দাদু, ব্যাপারটা কী বলো তো?” কৌতূহলী দিলু জিজ্ঞেস করল। ”কাল তুমি আর মামা পূর্ণেন্দু নামের একজনের কথা বলছিলে। মনে হল ওর বিপদ ঘটেছে।”
”বিপদ বলে বিপদ! পূর্ণেন্দু চাকরি করে সল্টলেকে সেচভবনে। সাতদিন আগে বিধাননগর স্টেশন থেকে বাড়ি ফেরার জন্য ট্রেনে উঠেছে। ট্রেন যখন বামনগাছি পৌঁছেছে তখন কামরার মধ্যেই একটা ছেলেকে রিভলভার দিয়ে বুকে গুলি করে তিনজন প্ল্যাটফর্মে নেমে যাচ্ছিল। পূর্ণেন্দু ছিল দরজার কাছে, সে শেষের জনকে জাপটে ধরে। ধস্তাধস্তি হতে হতে ট্রেন ছেড়ে দেয়। এর পর কামরার লোকেরা এমন গণপিটুনি শুরু করে যে, গুণ্ডাটা তাইতে মারা যায়।”
পঞ্চাননকে থামিয়ে দিয়ে দিলু বলল, ”বুঝেছি, গুণ্ডারা এখন বদলা নেওয়ার জন্য পূর্ণেন্দুকে মারার চেষ্টা করছে, কেমন? এরকম ঘটনা আমাদের পাড়াতেও ঘটেছে, তবে রিভলভার নয়, প্রথমে বোমা মারে, রাস্তায় লোকটা পড়ে যায়, তখন ক্ষুর দিয়ে গলা কেটে ওরা মোটরবাইকে উঠে চলে যায়। লোকটা নিজের বাড়ির দোরগোড়ায় খুন হয় সকালে বাজার করে ফেরার সময়।”
”কী মুশকিলে পূর্ণেন্দু পড়েছে বলো তো।” পঞ্চানন চিন্তায় পড়ে গেলেন, ”খুনি ধরে এখন নিজেই খুন হতে চলেছে। ওরা বাড়িটা ঠিক খুঁজে বের করেছে। আমাদের পাড়ার লোকেরা খুব ভাল, খুব মিলমিশ। কেউ বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়ায়, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ওকে বাঁচাবার জন্য ছেলেরা রাতপাহারা দেবে। কিন্তু দিনের বেলাতেও তো ওকে মারার জন্য আসতে পারে। তোমাদের পাড়ায় যে খুনটা হয়েছিল সে তো সকালেই ঘটেছিল। আগে এসব রাতের অন্ধকারে হত, এখন দিনের বেলাতেও হয়। লোকভর্তি ট্রেনের কামরা আর তারই মধ্যে কিনা গুলি করে নেমে চলে যায়! ভাবতে পারো?”
দিলু বলল, ”দাদু, ওরা আচমকা হঠাৎ অ্যাটাক করে, এক মিনিট আগেও তুমি জানতে পারবে না। দুপুরে হয়তো সদর দরজায় কড়া নাড়ল। যেই দরজা খুলবে অমনই হুড়মুড়িয়ে ঢুকে বোমা মেরে কি গুলি চালিয়ে ছুটে বেরিয়ে এসে মোটরবাইকে চেপে হাওয়া হয়ে যাবে। অ্যাকশনটা করতে লাগবে বড়জোর দু’মিনিট, তখন তোমার রাতপাহারাওলারা কোথায়?”
পঞ্চানন আরও চিন্তায় পড়ে গিয়ে বললেন, ”তাও তো বটে। আমি বরং পূর্ণেন্দুর বাড়ির লোকেদের বলে আসি সদর দরজা সারাক্ষণ বন্ধ রাখবে। আর কেউ কড়া নাড়লে জানলা দিয়ে আগে দেখে নেবে অচেনা লোক কি না।”
পঞ্চাননের সঙ্গে দিলুও বেরোল। গতকাল ভ্যানরিকশা থেকে যেখানে সে নেমেছিল তার থেকে পঞ্চাশ—ষাট মিটার এগিয়ে লালুর মুদির দোকানের উলটো দিকে পূর্ণেন্দুদের বাড়ি। একতলা নিচু পাঁচিল ঘেরা বাড়ি। কাঠের ছোট্ট গেট। ইট বিছানো সরু পথ দিয়ে গিয়ে একটা চৌকো বারান্দায় উঠতে হয় দু’ধাপ সিঁড়ি ভেঙে। বারান্দাটার দু’দিকে হাঁটু সমান উঁচু দেওয়াল। তার ওপরে বসানো লোহার গ্রিল। গ্রিল ঘেরা থাকলেও বারান্দাটাকে দু’দিক খোলাই বলা যায় আর বাকি দু’দিকে ঘর। গ্রিলেরই দরজা। বাইরে থেকে এই দরজা দিয়ে বারান্দায় ঢুকে ঘরে যেতে হয়। একটা বেঞ্চ, একটা ছোট নিচু টেবল আর দুটো স্টিলের ফোল্ডিং চেয়ার নিয়ে বাইরের লোকেদের বসার জন্য বারান্দাটাকে ব্যবহার করা হয়। বাড়ির বাইরে দেওয়ালে পলেস্তরা নেই। বোধ হয় টাকায় কুলোয়নি তাই বাড়িটা সম্পূর্ণ করতে পারেনি, পরে টাকা জমিয়ে পলেস্তরা করে নেবে। এইরকম বাড়ি এই অঞ্চলে অনেক, দিলু দেখেছে। পূর্ণেন্দুদের বাড়িটার দু’পাশে কিছু জমি, তাতে একটা পেয়ারা আর কয়েকটা পেঁপেগাছ। জমিতে পড়ে আছে ভাঙা ইট, টালি, কাঠের টুকরো; দিলুর নজর গেল পেয়ারাগাছে, কয়েকটা পেয়ারা বেশ বড় আর ডাঁশা।
কাঠের গেট দিয়ে ঢুকে গ্রিলের দরজার পাশে দেওয়ালে কলিং বেল। পঞ্চানন বোতাম টিপলেন। বেল বাজার শব্দ হল না।
”নির্ঘাত লোডশেডিং। এই এক ঝামেলা। সারা সকাল, দুপুর এই চলবে।” পঞ্চানন বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে ডাকলেন, ”পূর্ণেন্দু, পূর্ণেন্দু….নবেন্দু, দিব্যেন্দু—”
ভেতরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন পূর্ণেন্দুর মা বিভা। বিধবা মহিলা।
পঞ্চানন বললেন, ”বাড়িতে কেউ নেই? পূর্ণেন্দু কোথায়, কী করছে? দেখতে এলুম।”
