”দাদু, নাইটগার্ডের কথা মামাকে তখন বলছিলে। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে কি মামাও থাকবে, তুমি থাকবে না?”
”আমি এই বুড়োবয়সে রাতপাহারা কি দিতে পারব? এসব অল্পবয়সীদের জন্য। সত্যি—সত্যি যদি গুণ্ডাবদমাশদের মুখোমুখি হতে হয় তা হলে তো এক থাপ্পড়ে আমায় ফেলে দেবে।”
দিলু বলল, ”কেন, তুমি বন্দুকটা নিয়ে পাহারায় বেরোবে। বন্দুক দেখলে ওরা চোঁ চোঁ দৌড় দেবে।”
পঞ্চানন হেসে ফেলে বললেন, ”দাদু, এখনকার গুণ্ডাদের কাছেও বোমা, পিস্তল, পাইপগান থাকে। এই বুড়ো বয়সে কি আমি পারব? তোমার মামাও পারবে না। বোকা আবার ভিতুও, বয়সও তো ওর পঞ্চাশ পেরিয়েছে। এবার তুমি ঘুমোও।”
দিলু পরদিন যথারীতি দেরিতে ঘুম থেকে উঠল। ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দেখল টেবলে তারই বয়সী একটি ছেলে মাথা নামিয়ে মন দিয়ে খাতায় কী যেন লিখছে। পাশের চেয়ারে বসে দাদু ঝুঁকে খাতার দিকে তাকিয়ে।
”উহুঁহুঁ, হ্যাজবিন নয় হ্যাজবিন নয়, হ্যাডবিন হবে। সেদিন কতবার বলে দিলুম, কাজটা করে যাচ্ছিল তার মানে পাস্ট কন্টিনিউয়াস, অতীতের ঘটনা। যা বলে দিই সেটা বাড়িতে গিয়ে আবার ঝালিয়ে নিলে এই ভুলটা হত না।” পঞ্চানন যখন কথাগুলো বলছিলেন ছেলেটি তখন দিলুর দিকে তাকিয়ে ছিল।
”আরে দাদু, এসো, এসো, ঘুমোচ্ছ দেখে আর ডেকে তুলিনি। গ্রাম—পাড়াগাঁয় লোকের ঘুম সূর্য ওঠার সঙ্গেই ভাঙে, শুতেও যায় তাড়াতাড়ি। এখানে থাকলে তোমারও এই অভ্যেস হয়ে যাবে। এই হল বাসু, ভাল নাম বসুদেব, আমাদের হষ্যর ছেলে। সোমবার থেকে পরীক্ষা, ক্লাস এইট হবে। তোমার তো হবে নাইন। বাসু, এই হল দিলু।”
বাসু হাসল দিলুর দিতে তাকিয়ে। দিলু দেখল ঝকঝকে সাজানো দাঁত, পাতাকাটা চুল, আয়ত চোখে বন্ধুত্বের চাহনি, শীর্ণ লম্বাটে মুখ, রং শ্যামবর্ণ, ছোটখাটো রোগা শরীর।
দিলু অস্বস্তি বোধ করল দাদুর একটা কথায়, ”তোমার তো হবে নাইন। হবে কিনা কে জানে, পরীক্ষা দিয়েই তার মনে হয়েছে পাশ বোধ হয় করতে পারবে না।”
”দাদু নীচে যাও, দাঁত মেজে নাও। ব্রাশ এনেছ তো?”
আধঘণ্টা পর পঞ্চানন আর বাসু যখন একতলায় নামল, দিলু তখন একটা বড় বাটি ভর্তি চিঁড়ে দুধ কলা গুড় মাখা খাচ্ছে।
পঞ্চানন বললেন, ”ডাবের জল খাবে নাকি?”
দিলু মাথা কাত করে বলল, ”হুঁ।” ডাবের জল খেতে তার ভাল লাগে। আগের বার যখন এসেছিল, প্রতিদিন অন্তত দু’তিন গ্লাস ডাবের জল খেয়েছে।
”বাসু, রিদু তো এখনও আসেনি, তুই—ই ডাব পেড়ে দে।”
পঞ্চাননের কথা শেষ হওয়ামাত্র বই খাতা রেখে বাসু হর্ষকে বলল, ”মা, দড়িগাছাটা দাও তো।”
পুকুরের দু’ধারের পাড় ঘেঁষে সার দিয়ে সুপুরি আর নারকেলের গাছ। তার পেছনে সার দিয়ে গোটা কুড়ি বেগুন গাছ। তার লাগোয়া মাচায় করলা আর উচ্ছে ঝুলছে। তার নীচে জমির ওপর লতিয়ে রয়েছে কুমড়ো গাছ। আট নম্বরি ফুটবলের মতো দুটো সোনালি রঙের কুমড়ো জমিতে বিশ্রামরত। পঞ্চানন চোখ কুঁচকে গাছের নারকেলগুলো লক্ষ করে একটি গাছ দেখিয়ে বাসুকে বললেন, ”ওটায় ওঠ, ডাবগুলো কচি রয়েছে।”
বাসু জামা খুলে গাছটার দিকে এগোল। একটা কাঠবেড়ালি ল্যাজ তুলে তুড়ুক তুড়ুক লাফিয়ে গাছটা বেয়ে খানিকটা ওপরে উঠে বাসুতে দেখতে পেয়ে চটপট নেমে ঝোপের মধ্যে লুকোল। দেখে দিলুর খুব মজা লাগল। দড়ির দুটি প্রান্ত বেঁধে নিয়ে দুই পায়ের গোছে মালার মতো গোল করে আটকে বাসু দু’হাতে গাছটা জড়িয়ে টেনে টেনে নিজেকে তুলে নিচ্ছে ওপরে। প্রায় পাঁচতলা উঁচু গাছ। গাছটা হেলে রয়েছে পুকুরের দিকে। দিলু অবাক হয়ে তাকিয়ে ভাবল ওই রোগা শরীরে কী জোর আর কী সাহস। ফিসফিস করে সে পঞ্চাননকে বলল, ”দাদু, আমাকে নারকেল গাছে চড়া শিখিয়ে দেবে?”
উৎসাহিত গলায় পঞ্চানন বললেন, ”নিশ্চয় দেব। আগে তোমার পায়ের নখটা ঠিক হোক। নারকেল, সুপুরি সব গাছে উঠবে। প্র্যাকটিস করতে করতে দেখবে তুমি হুঁশিয়ার হয়ে গেছ, তোমার সাহসও বেড়ে গেছে, ইয়র্কার বল খেলতে তোমার আর অসুবিধে হবে না।”
বাসু গাছের মাথায় পৌঁছে গেছে। পাতার আড়ালে ওর হাঁটু পর্যন্ত গোটানো প্যান্ট আর পা দুটো দেখা যাচ্ছে। এক হাতে গাছ জড়িয়ে অন্য হাতে এক—একটা ডাব ধরে মুচড়ে মুচড়ে ছিঁড়ে নিয়ে বাসু পুকুরে ছুড়ে ফেলতে লাগল। গোটাছয়েক পুকুরে ফেলে সে যা করল তাতে দিলুর চোখ কপালে উঠল, হাঁ হয়ে গেল মুখ।
পায়ের দড়িটা নীচে ফেলে দিয়ে বাসু দু’ পা দিয়ে গাছে একটা জোর ধাক্কা দিল। পেছন ফিরে পুকুরের জলে প্রায়—বসা অবস্থায় সে ঝপাত করে পড়ল, পাঁচতলা সমান উচ্চচতা থেকে।
গলা শুকিয়ে গেছে দিলুর, ঠোঁট চেটে বলল, ”দাদু একটু ভুল হলে ও তো জলে না পড়ে ডাঙায়ও পড়তে পারত!”
”তা তো পারতই। কতবার ওকে বারণ করেছি এভাবে নামিসনি, কোনদিন মরবি, নয়তো সারাজীবন পঙ্গু হয়ে থাকবি। আসলে কী জানো, তোমাকে দেখে বাহাদুরি দেখাবার লোভ সামলাতে পারেনি।”
বাসু সাঁতার কেটে ডাবগুলো একে একে পাড়ে ছুড়ে দিয়ে ঘাটে এসে জল থেকে উঠল। বাড়ির ভেতরে গিয়ে ভিজে প্যান্টটা ছেড়ে গামছা পরে একটা কাটারি হাতে ফিরে এল। দুই কোপে ডাবের মুণ্ডু উড়িয়ে বাসু সেটা একগাল হেসে এগিয়ে ধরল দিলুর দিকে।
