”দাদু, ওই যে বললে ইয়র্কার, সেটা কী জিনিস?”
দিলু চোখ কুঁচকে বলল, ”ফাস্ট বোলাররা দেয়, এটা ওদের একটা বড় অস্ত্র। বলটা সোজা ব্যাটের তলায় এসে পড়ে। এ বল সামলানো বেশ শক্ত। থামাতে গিয়ে ব্যাটের তলা দিয়ে গলে এল বি কি বোল্ড আউট করে দেয়।”
পঞ্চানন চোখ বিস্ফারিত করে বললেন, ”ওরে বাব্বা, এ তো দারুণ বল। তুমি এ বল করতে পারো?”
দিলু বলল, ”আমি ফাস্ট বোলার নই, ব্যাটসম্যান।”
যে লোক ইয়র্কার বল কাকে বলে জানে না, তার সঙ্গে ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে দিলু আর আগ্রহ বোধ করল না। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে সে বলল, ”দাদু, তোমার শোয়ার ঘরের দেওয়ালে একটা বন্দুক ঝুলছে দেখলাম। বোকামামা বলল তুমি নাকি ডাকাত তাড়িয়েছ গুলি ছুড়ে, সত্যি?”
পঞ্চানন বললেন, ”বলেছে নাকি বোকা? আরে ও কিছু নয়, অনেককাল আগের কথা, তখন এখানে এত ঘরবাড়ি হয়নি। এই বারান্দা থেকে ফাঁকা আওয়াজ করেছিলুম। ওরা তিন—চারটে বোমা ছুড়েই পালাল। ডাকাতিতে সবে হাতেখড়ি হয়েছে। পাকা ডাকাত হলে পালাত না।”
দিলু বলল, ”দাদু, আমাকে বন্দুক চালানো শিখিয়ে দেবে?”
পঞ্চানন অবাক হয়ে বললেন, ”শিখবে? কেন?”
দিলু বলল, ”শিকার করব।”
”বাঘ, সিংহ?”
”হ্যাঁ, তবে এখানে আর সিংহ পাব কোথায়? সেজন্য তো আফ্রিকায় যেতে হবে।”
”তুমি কোথাও মারার জন্য বাঘ—সিংহ পাবে না। সারা পৃথিবীতে আইন করে ওদের মারা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওদের মেরে মেরে সংখ্যাটা এত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, লোপাট হয়ে যাচ্ছে। যে ক’টা বেঁচে আছে তাদের বংশবৃদ্ধির জন্য আইন করে রক্ষা করা হচ্ছে। আমাদের দেশে আগে চিতাবাঘ ছিল, এখন একটাও নেই। যে চিতাটা শেষ বেঁচে ছিল দিল্লির চিড়িয়াখানায়, সেটা বছর চারেক আগে মারা গেছে। মজা কি জানো, কাগজে প্রায়ই দেখবে লেখা হয়, চিতাবাঘের আক্রমণে গ্রামবাসী নিহত বা গোরু—ছাগল মেরে খেয়েছে। আসলে ওটা লেপার্ড, দুটো আলাদা প্রাণী। লেপার্ডের কোনও বাংলা নেই, তাই চিতা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।”
”বেশ, তা হলে পাখি মারব।” দিলু জেদি গলায় বলল। বন্দুক চালানো তাকে শিখতেই হবে।
পঞ্চানন অবাক হয়ে বললেন, ”কেন! পাখি কি তোমার কোনও ক্ষতি করেছে? শুধু শুধু কেন তাদের খুন করবে?”
দিলু খুন শব্দটিতে অপ্রতিভ হয়ে পড়ল। আমতা আমতা করে কী একটা বলার চেষ্টা করল। পঞ্চানন ওকে কাছে টেনে নিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে বললেন, ”শিকার যারা করে তারা জীবন ভালবাসে না, তারা নিষ্ঠুর লোক। বনের প্রাণীকে মানুষের সমাজের খুব দরকার। ওরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। কেঁচো, ব্যাং, ইঁদুর, সাপ, ফড়িং, পোকামাকড় এরাও প্রত্যেকেই কোনও না কোনওভাবে আমাদের উপকার করে।”
এবার তর্ক করার ঢঙে দিলু বলল, ”তা হলে আমরা মাছ ধরে খাই কেন, ওরাও তো প্রাণী।”
”নিশ্চয় প্রাণী। আমরা যদি মাছ না খাই তা হলে কী হবে? এই যে পুকুরটা ওতে মাছ আছে, যদি না ধরি তা হলে মাছগুলোর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থা হবে যে, পুকুরে ওদের চলাফেরার জায়গা থাকবে না, তখন ওরা নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করে মরবে। আমরা মাছ খাই তো প্রয়োজনে, খাবার হিসেবে। শুধু শুধু মজা পাওয়ার জন্য তো ওদের মারি না। আসলে এটাও প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখা। যাকগে এসব কথা, তোমার ইচ্ছে হয়েছে বন্দুক ছোড়ার, কেমন?”
দিলু মাথা হেলাল। পঞ্চানন ওর কাঁধে চাপড় মেরে বললেন, ”ছুড়বে। আমি দেখিয়ে দোব।”
হষ্য এসে ডাকল খাওয়ার জন্য। ওরা নীচে নেমে এল। পরপর তিনটি কাঠের পিঁড়ির সামনে কাঁসার থালায় ভাত বেড়ে রাখা। বাবু হয়ে বসে শেষ কবে খেয়েছে, দিলু মনে করতে পারল না। জন্ম থেকেই বাড়িতে চেয়ার টেবলে খাওয়া। এই মামার বাড়িতেই তাকে মেঝেয় বসে কাঁসার থালা বাটি গেলাসে খেতে হচ্ছে। এটা তার খারাপ লাগে না। পঞ্চানন প্রাচীন মানুষ, জীবন যাপনও প্রাচীন ধারায়। বসবাসের জায়গা বদল করলেও সাবেকি অনেক কিছু বদলায়নি।
দিলু মাঝখানে, দু’পাশে হরিসাধন ও পঞ্চানন। পরিবেশন করছেন সুলেখা। খেতে খেতে হরিসাধন জিজ্ঞেস করলেন, ”বাবা, তা হলে কী ঠিক হল?”
পঞ্চানন বললেন, ”ঠিক হল নাইটগার্ড পার্টি তৈরি করা হবে। পাড়ার ছেলেরা পালা করে সারারাত পাহারা দেবে, বিশেষ করে পূর্ণেন্দুদের বাড়ির এলাকাটা। ওখানেই তো পরশু দুটো লোককে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে।”
হরিসাধন চিন্তিত স্বরে বললেন, ”ব্যাপারটা ভাবিয়ে তুলল। পূর্ণেন্দুকে বেশ সাবধানে থাকতে হবে। কিছুদিন যেন বাড়ি থেকে না বেরোয়।”
খাওয়া থামিয়ে পঞ্চানন বললেন, ”তাতে কী লাভ হবে? কতদিন বাড়িতে বসে থাকবে? একদিন না একদিন তো বেরোতেই হবে। কাজ করে কলকাতায়, ট্রেনে তো ওকে উঠতেই হবে। কাগজ খুললেই তো দেখি দিবালোকে ট্রেনের কামরার মধ্যে ডাকাতি, খুন ঘটে চলেছে।”
দিলু এইসব কথাবার্তার মাথামুণ্ডু বুঝতে না পেরে মামা আর দাদুর মুখের দিকে মাথা ঘুরিয়ে দু’বার তাকাল। শুধু তার মনে হল খুব গোলমেলে কোনও ব্যাপার এই পূর্ণেন্দু নামের লোকটা ঘঁটিয়েছে, তাই তার জীবনের ভয় আছে।
.
রাত্রে দাদুর পাশে বিছানায় শুয়ে দিলু সামনের দেওয়ালে ঝোলানো দোনলা বন্দুকটার দিকে তাকিয়ে ছিল। পঞ্চানন তা লক্ষ করলেন। বললেন, ”দাদু, কাল তোমাকে দেখিয়ে দোব কীভাবে বন্দুক চালাবে।”
