হরিসাধন ধমক দিলেন, ”এই ভেলো, চুপ কর, চুপ।”
ভেলো ডাক বন্ধ করে, কাছে এল। হরিসাধন দরজার কড়া নাড়লেন। ভেলো দিলুর হাঁটু, চটি শুঁকেটুকে ল্যাজটা নাড়ল।
”ভেলোর কাজ ভয় দেখানো আসলে কিন্তু খুব ভিতু। বাগান পাহারা দেয়। শেয়াল তাড়া করে। এই অঞ্চলে চুরি ডাকাতি খুব বেশি। একবার আমাদের বাড়িতে ডাকাতির চেষ্টা হয়েছিল, তোর দাদু দোতলার বারান্দা থেকে বন্দুকের আওয়াজ করে ডাকাত তাড়ায়—”।
সদর দরজার মাথার ওপর আলো জ্বলে উঠল। দরজা খুলে দিল এক প্রৌঢ়া। হর্ষমুখী কাজের লোক, পনেরো বছর আছে। নামটা মুখে মুখে হয়ে গেছে ‘হষ্য’, এই বাড়িতে সারাদিন থাকে। প্রাক্তন জমিদার বিশ্বাসদের জমি বর্গায় চাষ করে তার স্বামী, আর আছে এক ছেলে বসুদেব ওরফে বাসু। ওরা তিনজন থাকে পাশের গ্রাম ছোট হুড়ায়। হরিসাধন বাসুকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন, এবার তার ক্লাস এইট হবে। পরীক্ষায় বাসু প্রথম পাঁচজনের মধ্যে থাকে। পঞ্চানন বাড়িতে সপ্তাহে দু’দিন বাসুকে পড়ান তাই নয়, তার বইপত্তর, খাতা, জামা—জুতো সবই কিনে দেন।
হর্ষমুখী দিলুকে দেখে অবাক হল। চেঁচিয়ে সে ডাকল দিলুর মামি সুলেখাকে, ”ও বউদি এসে দ্যাখো গো দাদার সঙ্গে কে এসেছে।”
সুলেখা ছিলেন দোতলায়। ব্যস্ত হয়ে নেমে এলেন। বাড়িতে একটাও ছেলেমেয়ে নেই। সারাদিন তার ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কেউ এলে সুলেখা খুশি হন নানারকম রান্না করে খাওয়াবার সুযোগ পেয়ে। ব্যাগ থেকে শিঙাড়ার ঠোঙাটা বের করে হরিসাধন হর্ষর হাতে দিয়ে বললেন, ”আমরা খেয়ে এসেছি, এগুলো তোদের জন্য, যশোর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের। বাবা বোধ হয় বাড়ি নেই, গোটা দুয়েক তুলে রাখিস।”
সুলেখা বললেন, ”দিলু কয়েকদিন থাকবে তো?”
দিলু বলল ”হুঁ।”
ছেলেবেলায় মায়ের সঙ্গে দিলু মামার বাড়িতে একবার এসেছিল। এখানকার সবই ভাল শুধু সময় কাটানোটাই হয় সমস্যার। তার সমবয়সী কেউ নেই। মন খুলে কথা বলতে না পারলে সেই জায়গা তার ভাল লাগে না।
হরিসাধন বললেন, ”কয়েকদিন বলছ কী, ভাল লাগলে দিলু এখানেই থেকে যাবে। মলুর সঙ্গে আমার সেরকমই কথা হয়েছে।”
শুনে দিলু মনে মনে হাসল। শুধু মামার বাড়িই নয়, মৌলালিতে নিজেদের বাড়িও তার ভাল লাগে না। নিঃসঙ্গ একঘেয়ে লাগে। দাদারা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত, তার সঙ্গে কথা বলার সময়ই হয় না। কথা বললেও বয়সের তফাতটা তারা সবসময় মনে রেখে কথা বলে। মা সারাক্ষণ ব্যস্ত ঝি—চাকর, রান্না—খাওয়া নিয়ে। সারাক্ষণই খিটখিট করে যায় আর আপনমনে প্রায়ই একই কথা বলে—এতবড় সংসার সামলানো কি চাট্টিখানি কথা! দিলু লক্ষ করেছে, মা বি—এ পাশ হলেও বই পড়ে না, এমনকী খবরের কাগজও নয়। সন্ধে থেকে টিভি—র সামনে বসে হাবিজাবি যা দেখানো হয় তাই দেখে। বাবার সঙ্গে দিলুর কদাচিৎ দেখা হয়। সকাল আটটায় ঢোকে একতলার সেরেস্তাঘরে, তারপর সারাদিন কোর্টে, তারপর সন্ধে থেকে আবার সেরেস্তায়, রাত এগারোটা পর্যন্ত। দিলু মার কাছে শুনেছে বাবা জজের সামনে একবার দাঁড়ালেই মক্কেলকে আট হাজার টাকা দিতে হয়।
বাড়িতে থাকলে দিলু হাঁফিয়ে যায়। পাড়ায় একটা পার্ক আছে, অ্যালবার্ট স্কোয়ার। সেখানে সারা বছরই ফুটবল আর ক্রিকেট খেলা চলে। এত ভিড় হয় যে, খেলার জায়গা পাওয়াই মুশকিল। বিজয়ী সঙ্ঘ, বন্ধু পরিষদ আর সিক্স বুলেটস—এই তিনটি ক্লাব মাঠটাকে ভাগ করে নিয়েছে। বুলেটসরা শুধুই ফুটবল আর বাকি দুটি ক্লাব প্রধানত ক্রিকেট খেলে। দিলু বিজয়ী সঙ্ঘের সদস্য। স্কুল থেকে ফিরেই সে পার্কে ছুটে যায়। খেলা ছাড়াও আছে তার বন্ধুবান্ধব। তাদের সঙ্গে সে শুধু খেলার গল্প করে যেটা বাড়িতে কেউ করে না।
মামিকে বলা বোকামামার কথাটা শুনে দিলু মনে মনে নিশ্চিন্ত হল এখানে থাকা তার হবে না। সমবয়সী কেউ নেই, যার সঙ্গে খেলা যায়, গল্প করা যায়।
”দিলু, হাতমুখ ধুয়ে নাও। হষ্য, ব্যাগ আর থলি মেসোমশাইয়ের ঘরে রেখে আয়। ওখানেই দিলু থাকবে।” সুলেখা তারে ঝোলানো গামছাটা দিলুর হাতে দিলেন।
পঞ্চানন বাড়ি ফিরলেন রাত আটটা নাগাদ। দিলু তখন বারান্দায় একটা চেয়ারে পুকুরের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। বারান্দার ইলেকট্রিক আলো জলে পড়ে চিকচিক করছে, চারধারে অন্ধকার, নারকেল আর সুপুরি গাছ পুকুরের পাড় ঘেঁষে সারি দিয়ে। জোর বাতাসে গাছের পাতা নড়ছে, শব্দ হচ্ছে সরসর। দূরে দু—তিনটি বাড়িতে জ্বলা আলো ছাড়া দিলু কিছু দেখতে পাচ্ছে না। একটানা ঝিঁঝি—র ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দ কানে আসছে না। কলকাতায় এই সময় এমন নিঃসাড় চুপচাপ পরিবেশের কথা সে ভাবতে পারে না। এইরকম শান্ত নির্জনতার মধ্যে বসে থাকাটা তার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা, বেশ ভাল লাগছে।
পঞ্চানন সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চেঁচিয়ে বললেন, ”আমার দাদু কোথায়?” বারান্দায় পৌঁছে বললেন, ”শুনলাম তোমার পায়ের নখ নাকি উঠে গেছে।”
দিলু উঠে দাঁড়াল। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ”ও কিছু নয়। এরকম আগেও হয়েছে। ফরওয়ার্ড খেলেছি, বলটা ছিল ইয়র্কার, ফসকালুম, বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলের ওপর বলটা পড়ল, নখটা ফেটে গেল। ওটা পচে গিয়ে পরে নতুন নখ গজাল, এবারও তাই হবে।”
যতক্ষণ কথা বলছিল দিলু, তার মুখের তাচ্ছিল্যের ভাবটা লক্ষ করছিলেন পঞ্চানন। আঘাত অগ্রাহ্য করতে গিয়ে একটা বেপরোয়া ঔদ্ধত্য নাতির কণ্ঠস্বরে ফুটে উঠল। তিনি মনে মনে তারিফ করলেন।
