”সলু তো ল কলেজে বাবার পেশায় ঢুকবে, বিলু আর্ট কলেজে এ—বছর ভর্তি হল, কালু ডিগ্রি কোর্সে সায়ান্স পড়ছে। পড়াশুনোয় সবাই ভাল। কাউকে আমায় তাগিদ দিয়ে পড়ার কথা বলতে হয়নি। শুধু এই ছোট ছেলেটাই জ্বালিয়ে মারছে, কী যে করি।”
”কিছু করতে হবে না তোকে। তোর জ্যাঠার হাতে ওকে ছেড়ে দে। বাবা ঠিক ওকে তৈরি করে দেবে।”
মল্লিকা দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বললেন, ”এই বয়সে জেঠু ওকে সামলাবেন কী করে?”
হরিসাধন হেসে ফেললেন, ”বাবাকে তুই অনেকদিন দেখিসনি তাই বললি। হাঁটুর বাতে ইদানীং একটু কাহিল, তবু বহুদিন তেলকই খাননি বলে গতবছর নিজে হাতে জাল ফেললেন পুকুরে, হনুমানে আম নষ্ট করছিল, বন্দুক বের করে ফায়ার করলেন, ভাগ্যি ভাল মরেনি। যদি মরত তা হলে আমরা ও বাড়িতে আর টিকতে পারতুম না। বাবা পঁচাশি হলে কী হবে পাঁচ বছর আগেও কোদাল দিয়ে বাগানে মাটি কোপাতেন। তুই বাবার কাছে এক বছর ওকে রাখ। আমার স্কুলে ওকে ভর্তি করিয়ে নোব। পরীক্ষাটা দিয়েই দুধঘাটে চলে আসুক।”
দিলুর অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ হওয়ার দশদিন পর হরিসাধন কলকাতায় আসেন নিজের কাজে। একটা ইতিহাস বই লিখেছেন নবম—দশম শ্রেণীর জন্য, প্রকাশকের কাছে তার পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে দুপুরে বোনের কাছে এলেন ছোট ভাগ্নের খবর নিতে।
”কী ঠিক করলি?” হরিসাধন প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর দিলেন, ”দুটো প্যান্ট আর শার্ট একটা ব্যাগে ভরে দে। ওকে আজ নিয়েই যাব। দিন সাতেক থেকে দেখুক। যদি মন বসে যায় তা হলে আমাদের কাছেই থাকুক। তোর বা তরুণের তাতে আপত্তি আছে?”
মল্লিকা বললেন, ”আপত্তি কী গো! আমরা তো বেঁচে যাই। আগের দিন তুমি যা বললে দিলুর বাবাকে সে সবই বলেছি। উনি তো শুনে আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। বললেন, অতবড় নামী স্কুলে পড়ার এমন সুযোগ, হেডমাস্টার মামা, দিলুর তো মহাভাগ্যি। এখানে আজেবাজে ছেলেদের সঙ্গে মিশে গোল্লায় যাচ্ছে, সলু বলছিল, মা ওকে কোনও হস্টেলে পাঠিয়ে দাও।”
হরিসাধন আঁতকে ওঠার মতো দু’হাত তুলে বললেন, ”না, না, খবরদার নয়। এই ছেলেদের এলোমেলো প্রকৃতিটাকে বাঁধতে হবে, ঠিক পথে অর্থাৎ যে পথে গেলে ওর বিকাশ ঘটবে সেই পথে ওকে চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। হস্টেলে ওকে বাঁধার লোক কেউ থাকবে না। কিন্তু দিলু কি দুধঘাটে গিয়ে থাকতে রাজি হবে?”
মল্লিকা ভ্রূ কুঁচকে একটু বিরক্তি মাখানো গলায় বললেন, ”ওর রাজি হওয়া—না হওয়ায় কী আসে যায়। ওর ভালর জন্যই আমরা ওকে পাঠাচ্ছি। এটা ওকে মেনে নিতে হবে।”
দিলুকে ডেকে আনলেন মল্লিকা। ভাল স্বাস্থ্যের জন্য বয়সের তুলনায় ওকে বড়ই দেখায়। বাবার মতো কালো গায়ের রং, কোঁকড়া ঝাঁকড়া চুলের সঙ্গে চিরুনির সম্পর্ক মাঝেমধ্যে ঘটে। চৌকো মুখের গড়ন চোখদুটি শান্ত কিন্তু চোখের আড়ালে একটা কঠিন জেদি মন ধিকধিক অবিরত জ্বলছে। হরিসাধন সেটা লক্ষ করলেন।
”দিলু যাবি আমার সঙ্গে দুধঘাটে গিয়ে ক’টা দিন থেকে আসবি।”
”যাব। কবে?”
”আজই।” হরিসাধন ঘড়ি দেখলেন, ”পাঁচটা চল্লিশের ট্রেনটা ধরব। রেডি হয়ে নে।”
পাঁচ মিনিট পর দিলু এসে বলল, ”বোকামামা, আমি রেডি!”
হরিসাধন ভ্রূ তুলে তার ছোট ভাগ্নের দিকে তাকালেন। রংচটা জিনসের ট্রাউজার্স, ছাপছোপ দেওয়া হাফহাতা গেঞ্জি, পায়ে চটি, কাঁধে ঝুলি, হাতে নাইলনের ব্যাগ। একে কি রেডি হওয়া বলে!
হরিসাধনের চাহনি থেকে দিলু বুঝে গেল তার বেশবাস মামার মনঃপূত হয়নি। সে বলল, ”এই তো ভাল, হালকা ঝরঝরে। যাব তো মামার বাড়ি, সাজগোজের দরকার কী। জিনস একটা দারুণ সুবিধের জিনিস, ময়লাটয়লা হলেও চলে যায়।”
আর কথা বাড়াননি হরিসাধন।
.
বাগানের মধ্যিখানে ছোট দোতলা বাড়ি। যিনি এটি বানিয়েছিলেন তিনি একজন সিনেমা প্রযোজক, কলকাতায় থাকতেন। বাগানবাড়ি হিসেবেই এটি ব্যবহার করতেন, বছরে তিন—চারবার আসতেন। দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তুরা দলে দলে এসে ফাঁকা জমিগুলো দখল করে ঘর তুলে বসতে শুরু করতেই প্রযোজকমশাই বাড়ি, বাগান এবং পুকুরটি বিক্রি করে দেন পঞ্চাননকে।
বাড়িটি চৌকো আকৃতির। পেছন দিকে দোতলায় দুটি ঘরের সামনে টানা একটি টালি ঢাকা বারান্দা। সেটি এত চওড়া যে, তাকে দালানই বলা যায়। দোতলার দু’টি ঘরের নীচে একটি হলঘর ছিল। পঞ্চানন তার মাঝখানে দেওয়াল তুলে দুটি ঘর করে নিয়েছেন। এর একটি ঘর হরিসাধনের পড়া ও লেখার এবং বাইরের লোকেদের সঙ্গে কথা বলার জন্য। সকাল থেকে লোক আসে, বিশেষ করে স্কুলসংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে। রাত্রে বারোটা পর্যন্ত বই পড়া ও লেখা নিয়ে থাকেন এই ঘরে। দোতলার বারান্দার নীচেও লম্বা একটা সিমেন্টের চওড়া লাল চাতাল। সেখান থেকে কুড়ি মিটার এগোলেই তিরিশ মিটার চওড়া পঞ্চাশ মিটার লম্বা পুকুরে নামার শান বাঁধানো সিঁড়ি। দশটা ধাপ নামলে জল, বর্ষাকালে সাত ধাপ নামলেই।
ভ্যান—রিকশা থেকে নেমে পাশের একটা পথ ধরে কুড়ি মিটার এগিয়ে বাঁ দিকে পাঁচিল ঘেরা দিলুর মামার বাড়ি। ওরা বুকসমান উঁচু লোহার গেট ঠেলে ঢুকল। সন্ধ্যা উতরে গেছে, অন্ধকার গাঢ়। দু’দিকে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা গাছ। তার মাঝখান দিয়ে একটা পথ বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত। দরজার দু’পাশে উঁচু রক। চারধাপ সিঁড়ি ভেঙে ওরা রকে উঠতেই ”ঘেউ, ঘেউ” করে ছুটে এল একটা কুকুর অন্ধকার বাগান থেকে। দিলু সরে এল মামার গা ঘেঁষে।
