দোকান থেকে বেরোবার আগে বোকামামা দশটা শিঙাড়া কিনে নিলেন বাড়ির জন্য। ওরা ভ্যান রিকশা স্ট্যান্ডে এসে দুধঘাট যাওয়ার রিকশা পেয়ে গেল। জনা চারেক যাত্রী রিকশায় বসে। ওরা দু’জন চড়তেই রিকশা ছেড়ে দিল। আঙুল বাঁচাতে দিলু পা ঝুলিয়ে বসল। এক মাইল পথ, দশ মিনিটেই পৌঁছে গেল।
বোকামামা অর্থাৎ হরিসাধন ঘোষ দেশভাগের পর পাঁচ বছর বয়সে খুলনা জেলার স্বল্পবাহিরদিয়া গ্রাম থেকে বাবা ও জ্যাঠার এবং লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু পরিবারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে চলে এসেছিলেন। বোকামামার বাবা পঞ্চাননের এক বন্ধু থাকতেন বারাসাতে। তিনিই ব্যবস্থা করে দুধঘাটে ফলের বাগান সমেত পাঁচবিঘে জমি পুকুরসহ ছোট একটা বাড়ি কিনিয়ে দেন পঞ্চাননকে। সেই বাড়িতে দাদা দাশরথিকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন আটচল্লিশ সাল থেকে।
পঞ্চাননের একটি ছেলে হরিসাধন, দাশরথির একটি মেয়ে মল্লিকা, ডাকনাম মলু। মলু যখন দশ বছরের তখন দাশরথি সাতদিনের জ্বরে মারা যান। তখন ভাল ডাক্তার বা ওষুধপত্র দুধঘাটে পাওয়া যেত না। মলুর মা স্বামীর মৃত্যুর এক বছর পর পাকস্থলীর ক্যান্সারে মারা যান। পিতৃ—মাতৃহারা মলুকে নিজের মেয়ের মতো বড় করে তোলেন পঞ্চানন, তাকে বি—এ পাশ করিয়ে প্রচুর খরচ করে বিয়েও দেন কলকাতার এক উঠতি উকিলের সঙ্গে। হরিসাধনের দুই মেয়ে এবং দু’জনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। বড়টি থাকে দুর্গাপুরে, ছোট মেয়ে কটকে। পঞ্চানন পঁচাশি বছর বয়সে এখনও বাগানের পরিচর্যা করেন, বাজারে যান, ছেলেকে ধমকান।
হরিসাধনের স্কুল—অন্ত—প্রাণ। এই স্কুলেই তিনি পড়েছেন। তখন ছিল তিনটি খড়ের চালের ঘর। শিক্ষকদের বসার ঘরের একধারে কাঠের পার্টিশান দেওয়া খুপরিতে বসতেন হেডমাস্টারমশাই। শিক্ষক ছিলেন আটজন।
দুধঘাটের প্রাক্তন জমিদার ও সরকারি কন্ট্রাক্টর ধনী ও শিক্ষানুরাগী অঘোর চক্রবর্তী নিঃসন্তান ছিলেন। টাকা জমানোয় তাঁর আগ্রহ ছিল না। তাঁরই দেওয়া জমি ও পাঁচ লক্ষ টাকা দুধঘাট স্কুল খোলনলচে বদলে ঝকঝকে আধুনিক চেহারা নেয় তিরিশ বছর আগে। এর চার বছর পর হরিসাধন ‘ফিফথ সার’ রূপে স্কুলে যোগ দেন।
স্কুলের এখন তিনটি পাকা বাড়ি, সায়ান্স ল্যাবরেটরি, খেলার বিরাট মাঠ এবং একুশজন শিক্ষক ও সাতশো ছাত্র নিয়ে এলাহি ব্যাপার। গত বছর হরিসাধনের স্কুল থেকে নব্বুইটি ছেলে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল। পঁচাত্তরজন পায় ফার্স্ট ডিভিশন, আটজন পায় স্টার।
শুধু এই জেলাতেই নয়, সারা রাজ্যে দুধঘাট স্কুল বিখ্যাত পড়াশুনোয় এবং ফুটবল খেলাতেও। দিল্লিতে তিনবার সুব্রত কাপ ফাইনাল খেলে একবার কাপ জিতেছে। জেলার জুনিয়ার ভলিবল, কবাডি, খোখো দলে দুধঘাট স্কুলের ছেলে নেই এমন ঘটনা গত দশ বছরে ঘটেনি। পড়া এবং খেলায় যা কিছু খ্যাতি সবই হেডমাস্টার হরিসাধন ঘোষের অক্লান্ত আন্তরিক ও সৎ চেষ্টার ফসল। তিনি স্কুলে যেমন রাশভারী, কঠোর শৃঙ্খলনিষ্ঠ, নিয়মানুবর্তী, ঠিক তার উলটোটি হয়ে যান স্কুল থেকে বেরিয়ে এলেই।
হরিসাধন মাঝে—মাঝে কলকাতায় যান। হাতে সময় থাকলে বোন মলুর সঙ্গে দেখা করে আসেন। মৌলালির কাছে মলুর স্বামী তরুণ কর বিরাট একটা পুরনো বাড়ি কিনে সংস্কার করিয়ে বউবাজারে পৈতৃক বাড়ি থেকে ভিন্ন হয়ে এসে বসবাস করছেন। মলুর চার ছেলে, ছোট ছেলে দিলু। কলকাতায় প্রধান শিক্ষক সমিতির সভায় যোগ দিতে এসে হরিসাধন বোনের বাড়ি এসেছিলেন। মলুর সঙ্গে কথায়—কথায় জানতে পারেন দিলু ষান্মাসিক ক্লাস পরীক্ষায় একশোর মধ্যে ইংরেজিতে চব্বিশ, ইতিহাসে তিরিশ, অঙ্কে কুড়ি নম্বর পাওয়ায় স্কুল থেকে গার্জেনকে হুঁশিয়ার করে চিঠি দেওয়া হয়েছে এই বলে, অ্যানুয়াল পরীক্ষায় যদি একটি বিষয়েও ফেল করে তা হলে ক্লাস নাইনে ওকে প্রোমোশন দেওয়া হবে না। ওর পড়াশুনোর দিকে আপনারা নজর দিন।
”জানো বোকাদা, চিঠিটা পেয়ে এমন রাগ হল যে, দিলুকে আচ্ছা করে পেটালুম, সারাদিন খেতে দিলুম না। ওর বাবা বলল স্কুল ছাড়িয়ে অন্য স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবে। কিন্তু লেখাপড়ায় খারাপ ছেলেকে তাও ক্লাস নাইনে কি নতুন স্কুলে ভর্তি করানো সম্ভব? বাড়ির কাছে আদর্শ বিদ্যাভবন নামে একটা স্কুল আছে কিন্তু সেখানে শুনেছি মাস্টাররাই ঠিকমতো ক্লাসে আসে না। তিরিশটা ছেলে মাধ্যমিক দিয়েছিল গত বছর। দু’জন কোনওক্রমে সেকেন্ড ডিভিশন, এগোরোজন ফেল। এমন স্কুলে ওকে দিলে তো আরও খারাপ হয়ে যাবে লেখাপড়ায়।”
হরিসাধন বললেন, ”দিলুর অসুবিধেটা কোথায়, ওকে পড়ায় কে? রোজ দু’বেলা কি পড়তে বসে?”
মল্লিকা বললেন, ”দু’বেলা? সকালে ঘুম থেকেই তো ওঠে আটটায়, পড়বে কখন? স্কুল থেকে ফিরেই ছুটবে খেলার মাঠে, সন্ধেবেলায় মাস্টারমশাই আসেন, পড়তে বসে ঢুলবে। উনি বিরক্ত হয়ে বলেন, যাও ঘুমোও গিয়ে, আর পড়তে হবে না। ঘণ্টাখানেক কানমলা, গাঁট্টা খেয়ে নমো নমো করে পড়া সেরে খেয়েদেয়েই বিছানায়। এই হল রোজকার রুটিন। ওয়ান ডে ক্রিকেট থাকলে স্কুলে যায় না, সারাদিন টিভির সামনে। এত মারধোর করি, এত বোঝাই, তবু শোধরাতে চায় না। কী যে করি, প্রব্লেম চাইল্ড হয়ে উঠেছে।”
হরিসাধন বললেন, ”তোর অন্য ছেলেরা কেমন?”
