বোকামামা বললেন, ” তোর আর দোষ কী, কখনও তো বনগাঁ লাইনের ট্রেনে চড়িসনি। তিরিশ বছর যাতায়াত করছি আমি, কতবার যে ধুতি খুলে গেছে! তাই ট্রেনে চড়ার জন্য ধুতি ছেড়ে প্যান্ট ধরেছি। তুই যে আস্ত নামতে পেরেছিস—য়্যা! চটি কোথায়?”
দিলু করুণ স্বরে বলল, ”ট্রেনে।”
বোকামামা বিলীয়মান গার্ডের কামরার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ”তা হলে বাঁ পায়েরটা পরে থেকে আর কী হবে, ফেলে দে। একজোড়া নতুন চটি বরং কিনে দিচ্ছি। তবু ভাল, ব্যাগটা ধরে রাখতে পেরেছিস।”
দিলুর পায়ের দিকে এবার বোকামামা ভাল করে তাকালেন। চোখ কুঁচকে বললেন, ”হল কী তোর আঙুলে?” একটু ঝুঁকে দেখে বললেন, ”বুড়ো আঙুলের নখটা যে আধখানা উঠে গেছে। কী কাণ্ড দ্যাখ তো, মামার বাড়িতে বেড়াতে এসে দু—দুটো অ্যাকসিডেন্ট চটি গেল, নখ ওপড়াল। শিগগিরি চল ডাক্তারখানায়। ইঞ্জেকশন, ওষুধ, ব্যান্ডেজ করাতে হবে। অফিস ছুটির পরের ট্রেনে ওঠাটাই বোকামি হয়েছে।”
প্ল্যাটফর্ম থেকে লোকজন বেরিয়ে যাওয়ার পর ওরা দু’জন স্টেশন থেকে বেরিয়ে এল। ডাক্তারখানা শিবানী মেডিক্যাল হল পঞ্চাশ গজের মধ্যেই। ডাক্তারবাবু তখনও এসে পৌঁছননি। তিনি বিকেল চারটে থেকে হাবড়ায় এক ডাক্তারখানায় বসেন দু’ঘণ্টার জন্য। রোগীর ভিড় থাকলে সেটা আড়াই ঘণ্টাও হয়ে যায়। কম্পাউন্ডার মদনগোপাল বয়স্ক মানুষ। বললেন, ”ডাক্তারবাবুর ফি দেবেন কেন, আমিই যা করার করে দিচ্ছি, দশটা টাকা দেবেন।”
বোকামামা রাজি হয়ে গেলেন। মদনগোপাল অ্যান্টিটিটেনাস ইঞ্জেকশন দিয়ে মলম লাগিয়ে তুলো দিয়ে ঢেকে ব্যান্ড—এইড দিয়ে আঙুলটা মুড়ে দিলেন।
”সাবধানে থাকবে খোকা, ধাক্কাটাক্কা যেন না লাগে। জলটল লাগিও না। দিন পনেরো লাগবে ঠিক হয়ে যেতে।”
দিলুর খুব খারাপ লাগছে বোকামামার পঁচিশ টাকা খরচ করিয়ে দেওয়ায়। ‘পদসেবা’ জুতোর দোকানটা কুড়ি গজ দূরে। সবচেয়ে কমদামি হাওয়াই চটি। দিলু ঠিক করল, তাই কিনবে। কিন্তু বোকামামা দোকানে ঢুকেই বললেন, ”এই ছেলেটির পায়ের ভাল চটি আছে?”
সেলসম্যান বলল, ”আছে।” এই বলে সে একটা বাক্স এনে তার থেকে একজোড়া চটি বের করে দিলুর পায়ের সামনে রাখল।
বোকামামা হুকুম করলেন, ”পরে দেখ, বুড়ো আঙুলে লাগে কি না।”
দিলু চটি পরল। বুড়ো আঙুলে যে ফিতেটা রয়েছে সেটা নখে লাগছে হাঁটতে গেলেই।
বোকামামা দিলুর মুখ লক্ষ করে বুঝে গেলেন, লাগছে। বললেন, ”এই চটি চলবে না। পায়ের আঙুলে স্ট্র্যাপ থাকবে না এমন চটি আছে?”
সেলসম্যান দু—তিনটি বাক্স খুলে মাথা নেড়ে বলল, ”সব চটিতেই বুড়ো আঙুলে স্ট্র্যাপ দেওয়া।”
দিলু তখন বলল, ”মামা, হাওয়াই চটিতে বুড়ো আঙুলে লাগবে না।”
বোকামামা ক্ষুণ্ণ স্বরে বললেন, ”হাওয়াই বড় কমদামি, আচ্ছা ঠিক আছে আপাতত কাজ চালানো নিয়ে কথা।”
তিরিশ টাকার হাওয়াই চটি পায়ে দিয়ে দিলু মামার সঙ্গে দোকান থেকে বেরিয়ে এল। সামনেই যশোহর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, বোকামামা বললেন, ”দিলু এদের ছানার জিলিপি বিশ্ববিখ্যাত, চেখে দেখবি?”
মামার অনেক টাকা সে খরচ করিয়ে দিয়েছে। খরচটা আর যাতে না বাড়ে তাই বলল, ”মিষ্টি আমার ভাল লাগে না।”
”সে কী রে, যশোরের ছানার জিলিপি। একটা অন্তত খেয়ে দেখ।”
বোকামামা দোকানে ঢুকলেন, তার সঙ্গে দিলুও। একটা লম্বা পালিশহীন কাঠের টেবিলে ওরা বসল। বোকামামা শিঙাড়া আর ছানার জিলিপি একটা করে দিতে বললেন।
”সেই কখন ভাত খেয়েছিস, নিশ্চয় খিদে পেয়ে গেছে। এই সময় শিঙাড়া ভাজা শুরু হয়। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় লোকে কিনে নিয়ে যায়। উত্তর চব্বিশ পরগনার বেস্ট শিঙাড়া এখানে হয়।”
কলাপাতায় গরম শিঙাড়া আর নধর চেহারার ছানার জিলিপি দিয়ে গেল। খিদে সত্যিই পেয়েছিল দিলুর। শিঙাড়ায় কামড় দিয়ে তার আর মনে হল না মামার টাকা খরচ করিয়ে দিল। সে ধরে নিল ভাগ্নে হিসেবে এটা তার প্রাপ্য।
ছানার জিলিপির একটা টুকরো ভেঙে মুখে দিতেই সেটা মসৃণভাবে মুখের মধ্যে ভেঙে মিলিয়ে গেল। এমন মিষ্টি সত্যিই সে কখনও খায়নি।
”মামা, তুমি এই ছানার জিলিপিকে বিশ্ববিখ্যাত বললে কেন? বিশ্বে আর কোথাও ছানার জিলিপি হয় কি না তা কি তুমি জানো?”
বোকামামা দুধঘাট উচ্চচ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার। স্কুলের প্যাডে ওঁর নাম হরিসাধন ঘোষের পর লেখা আছে এম. এ. বি. টি। তিনটি বিষয়ে ক্লাস নেন—ভূগোল, ইতিহাস ও অঙ্ক। বিশ্ব সম্পর্কে মোটামুটি একটা জ্ঞান তাঁর থাকার কথা এবং তাঁর ধারণা সেটা তাঁর আছে।
”এই পশ্চিমবাংলার বাইরে ছানার জিলিপি কোথাও হয় না, হলেও সেটা জিলিপি নয়, পান্তুয়া। আর এই রাজ্যে শুধু) বাইগাছিতেই এমন জিলিপি হয়। সুতরাং অনায়াসেই একে ওয়ার্ল্ড ফেমাস বলা যায়।”
”আর শিঙাড়াকে উত্তর চব্বিশ পরগনার বেস্ট বললে কী করে?”
বোকামামা ঠোঁট চওড়া করে হাসলেন। ”বত্রিশ বছর আগে বঙ্গবাসী কলেজে যখন পড়তুম তখন থেকে, দমদম টু গোবরডাঙা যত নামী খাবারের দোকান, সবক’টায় খেয়েছি, দমদম টু রানাঘাট মেন লাইনেও সব বড় দোকান দেখা হয়ে গেছে। এরকম ফুলকপির শিঙাড়া কেউ পারে না তৈরি করতে। কেমন লাগছে বল?”
”ভাল।”
”তা হলে আর একটা?”
দিলু মাথা কাত করল।
