গোল হচ্ছে না। খেলা শেষ মুখে এসে গেছে। অধৈর্য গ্যালারির গর্জন উঠছে নামছে। এমন সময় নিমাইকে ফাউল করল ওদের রাইট ব্যাক, আঠারো গজ লাইনের বাঁ দিকে হাত দুয়েক বাইরে। ফ্রি কিক। বলটা বসিয়ে নিমাই আমার দিকে তাকিয়ে দুটো আঙুল দেখাল। বুঝে গেলাম ও কোথায় বল পাঠাবে। প্র্যাকটিসে এই সঙ্কেতগুলো আমরা ঠিক করে নিয়েছি। ওরা পাঁচজনে পাঁচিল তুলে দাঁড়িয়েছে। নিমাই আর বিষ্ণু তৈরি হয়েছে শট নিতে। আব্রাহাম হঠাৎ বাঁ দিকে ছুটে গেল, সঙ্গে সঙ্গে ওকে পাহারা দিতে গেল একজন। আমি ডান দিকে সরে গিয়ে তাকালাম ঠিক পেনালটি স্পটে। নিমাই সেটা লক্ষ করল। পাঁচিলের পিছনে ফাঁকা জায়গা রাখা হয়েছে, যাতে গোলকিপারের দৃষ্টি ব্যাহত না হয়। রেফারি হুইসল দিতেই নিমাই আর বিষ্ণু এগোল শট নিতে। নিমাই একটু পিছিয়ে। বোঝা মুশকিল কে শট নেবে। তবে, যে কেউই বুঝতে পারবে এটা বহু ব্যবহৃত একটা প্যাঁচ। বিষ্ণু শট নিতে এসে বলের উপর দিয়ে লাফিয়ে যাবে আর নিমাই শট করবে।
বলের উপর দিয়ে বিষ্ণু লাফিয়ে গিয়ে বাঁ দিকে ছুটে গেল, কিন্তু নিমাই শট না নিয়ে বলটা নিখুঁত মাপে চিপ করল পাঁচিলের মাথা ডিঙিয়ে পেনালটি স্পটের উপর। এবার সব কিছু নির্ভর করছে আমার ছুটে যাওয়ার এবং ঠিক সময়ে পৌঁছোনোর উপর। দিনের পর দিন আমার পাঠশালায় পিন্টুকে নিয়ে যার প্র্যাকটিস করেছি, এবার তার পরীক্ষা। মোটরবাইকের হঠাৎ স্পিড তোলার মতো আমি প্রচণ্ড দমকে, ছিলে—ছেঁড়া ধনুকের মতো ছিটকে ঢুকলাম।
দেরি হয়ে গেছে। চার পা এগোনো মাত্র বুঝে গেলাম বলটাকে হাফ ভলিতে নিলে বারের উপর দিয়ে চলে যাবে। হঠাৎ বুকের মধ্যে কে বলে উঠল, ”স্ট্রাইকার, এবার ঘা মারো, সর্বশক্তি দিয়ে মারো!” শেষ চেষ্টায় চার গজ দূর থেকে ঝাঁপ দিলাম। বল থেকে চোখ সরাইনি। কপালের ডান দিকে বলটা লাগছে, হাতুড়ির মতো মাথাটা দিয়ে আঘাত করলাম বলে—আর মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়লাম।
চারদিক কেমন শান্ত নিস্তব্ধ! ঘাস আর মাটির মিষ্টি সোঁদা গন্ধে বুক ভরে যাচ্ছে। আমি মুখ তুলে দেখছি অদ্ভুত একটা দৃশ্য, রেঙ্গুন ইউনাইটেডের গোলকিপার গোলের মধ্য থেকে কুড়িয়ে নিল সাদা—কালো ফুটকি আঁকা আমার পৃথিবীটাকে। এর পর ধীরে ধীরে একটা গর্জন আমাকে কাঁপিয়ে দেহের উপর দিয়ে বয়ে যেতে শুরু করল।
.
লক্ষ্মণ মালি এসে বলল, ”আপনাকে একজন মেয়েছেলে ডাকছে।”
যাত্রীর টেন্টের বাইরে তখন উৎসব চলেছে। হাউই, পটকা আর তুবড়ির শব্দে আলোয় আলোয় ঝলমল করছে গড়ের মাঠের এই দিককার আকাশ। বাইরে এলাম খালি গায়ে। নীলিমা আর পিন্টু দাঁড়িয়ে। ভেবেছিলাম মাকে দেখব।
”এ কী তোমরা! খেলা দেখতে তুমি এসেছিলে? এখনও বাড়ি যাওনি, মা কোথায়?” একটানা অনেকগুলো প্রশ্ন করলাম। বাড়ির লোককে দেখে সত্যিই ভাল লাগছে।
”জেঠিমা সকাল থেকে দক্ষিণেশ্বরে। আর জ্যাঠামশাই বললেন, একটু অপেক্ষা করে যাই, এবার হয়তো বাজি পোড়ানো হবে, তাই—”
”বাবা! বাবা কোথায়?” আমার গলা ধরে এল।
”বাইরে। বললেন, তোমরাই দেখা করে এসো।”
ছুটে বাইরে যেতে গিয়ে থমকে গেলাম। তার পর ফুলগাছগুলোর মধ্য দিয়ে রেলিং—এর ধারে গিয়ে বাইরে তাকালাম। একটা তুবড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। ক্রমশ আলোর ঝাড় চালচিত্রের মতো ছড়িয়ে পড়ল। দেখতে পেলাম, অনেক লোকের মধ্যে একজনের কপালে চিকচিক করছে একটা টিপ। অত্যন্ত উজ্জ্বল, মর্যাদাবান।
তুবড়ির আলোয় আমাকে দেখতে পেয়ে তখন অনেকে ছুটে আসছে ”প্রসূন, প্রসূন!” বলে।
অলৌকিক দিলু
অলৌকিক দিলু – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস
”দিলু, এর পরই বাইগাছি। এবার দরজার দিকে এগোতে হবে।” এই বলে বোকামামা উঠে দাঁড়ালেন। ব্যাঙ্ক থেকে নাইলনের ব্যাগটা নামিয়ে বেঞ্চে বসা যাত্রীদের হাঁটু ঠেলতে—ঠেলতে বেরোতে লাগলেন, তার পিছু পিছু দিলীপ। তারও হাতে একটা ব্যাগ, কাঁধে কাপড়ের ঝুলি। ট্রেনের কামরা ভিড়ে ঠাসা। তাদের মতো আরও অনেকে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে দরজার কাছে দাঁড়িয়েছে।
বোকামামা গলা নামিয়ে বললেন, ”এদের পিছু—পিছু এগোবি, দেরি করলেই কিন্তু রান আউট হয়ে যাবি। হুড়মুড়িয়ে লোক এমনভাবে উঠবে যে, তোকে আর নামতে দেবে না, ঠেলতে ঠেলতে আরও পেছনে পাঠিয়ে দেবে। লোকাল ট্রেনে চড়ার অভ্যেস নেই তো।”
শুনে গলা শুকিয়ে গেল দিলুর। এতক্ষণ সে জানলা দিয়ে দেখে এসেছে এক—একটা স্টেশনে ট্রেন থেমেছে আর প্ল্যাটফর্মের লোকেরা টেনে ওঠার জন্য কীরকম ধাক্কাধাক্কি/করছিল। দু—তিনজনকে ছিটকে প্ল্যাটফর্মে গড়াগড়িও দিতে দেখেছে।
বোকামামা বললেন, ”ওঠার থেকে নামাটাই শক্ত। ব্যাগটা মাথার ওপর তুলে ধর, নয়তো হাত থেকে ছিটকে যাবে।”
দিলু হাতের ব্যাগ মাথায় তুলল। ট্রেন বাইগাছি স্টেশনে দাঁড়ানো মাত্র দরজার লোকেরা হুড়হুড় করে নামতে শুরু করল। পেছন থেকে ঠেলা খেয়ে দিলু হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে ওঠার সময় কে তার পা মাড়িয়ে দিল। ”আহ” বলে ওঠার আগেই সে প্ল্যাটফর্মে ছিটকে পড়ে গেল। বোকামামা তার হাত ধরে টেনে সরিয়ে না আনলে দু—তিনজন লোকের পায়ের তলায় সে পড়ে যেত।
দিলুর ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা থেঁতলে গেছে। ডান পায়ের চটির চামড়ার ফিতেটা ছিঁড়ে পা থেকে খুলে ট্রেনের কামরাতেই রয়ে যাওয়ায় সে ফ্যালফ্যাল চোখে ছেড়ে দেওয়া ট্রেনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
