”পারবি যেতে?” মুচকি হাসলেন পল্টুদা, ”যদি বলি আমার সামনে তুই শুধু দাঁড়িয়ে থাক। আমি তোকে দেখব আর সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠবে তোর বল কন্ট্রোল, মুখ তুলে বলটাকে পায়ে স্ট্রোক দিতে দিতে এগিয়ে যাওয়া, এধার—ওধার তাকানো। আমার তখন কেন জানি না অভিমন্যুর কথা মনে পড়ত। শুটিংয়ের পর ফলো থ্রু—র ভঙ্গিটা, আর সেই ডজটা। ডান দিকে হেলে, বাঁ দিকে ঝুঁকেই আবার ডান দিকে—একটুও স্পিড না কমিয়ে। পারিস এখনও?”
”না। আমার বয়স হয়ে গেছে পল্টুদা।”
”না, হয়নি। চেষ্টা করলেই পারবি। করবি?”
কমল বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল পল্টুদার মুখের দিকে। শীর্ণ মুখে দুটি চোখ কোটরে ঢুকে গেছে। কিন্তু কী অদ্ভুত জ্বলজ্বল করছে। প্রায় কুড়ি বছর আগে অমন করে তাকাতেন।
”তুই আমার কাছ থেকে যা শিক্ষা পেয়েছিস সেটা দেখাবি?” পল্টুদার সেই হুকমের গলা নয়, মিনতি।
কমলের হাত অদৃশ্য সুতোর টানে পুতুলের মতো মাথায় উঠে গেল। চুলগুলো ফাঁক করে মাথা হেঁট করল পল্টুদাকে দেখাবার জন্য। তারপর আস্তে আস্তে মাথাটা হেলিয়ে অস্ফুটে বলল, ”হ্যাঁ করব।”
তার চোখে পড়ল খাটের নীচে একটা রবারের বল, সম্ভবত পিণ্টুর। কমল বলটা পা দিয়ে টেনে আনল। চেটোর তলা দিয়ে বলটাকে ডাইনে বাঁয়ে খেলাল। তাই দেখে পিণ্টু খাট থেকে নেমে গুটি গুটি কমলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎ কচি পা—টা বাড়িয়ে দিল। বলটা ছিটকে দেয়ালে গিয়ে লাগল। ঘরে একমাত্র পিণ্টু ছাড়া আর কেউ হেসে উঠল না।
ছিলে টানা ধনুকের মতো কমল কুঁজো হয়ে গেল নিজের অজান্তেই। সামনে যেন একজন প্রতিদ্বন্দ্বী বল কেড়ে নিতে অপেক্ষা করছে। কমল একদৃষ্টে পিণ্টুর দিকে তাকিয়ে বলটাকে চেটো দিয়ে ডাইনে—বাঁয়ে, সামনে—পিছনে গড়িয়ে গড়িয়ে সারা ঘরটা ঘুরতে লাগল, পিণ্টু এলোপাথাড়ি লাথি ছুঁড়ছে, বলে পা লাগাতে পারছে না। কমল হঠাৎ একটা পাক দিয়ে পিণ্টুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কোমর থেকে শরীরের উপরটা ডাইনে ঝাঁকিয়ে বাঁয়ে হেলেই সিধে হয়ে গেল। পিণ্টু ব্যালান্স হারিয়ে মেঝেয় পড়ে গিয়ে ফ্যালফ্যাল করে সকলের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর লাফ দিয়ে উঠে অরুণাকে জড়িয়ে ধরল লজ্জা লুকোবার জন্য।
কমলের কোনও খেয়াল নেই। আস্তে আস্তে সে ভুলে গেল ঘরটাকে, ঘরের মানুষদের, মৃত্যুপথযাত্রী পল্টুদাকেও। তার মনে হচেছ সে মাঠেই নেমে খেলছে। গ্যালারি ভরা দর্শক তাকে তুমুল উচ্ছ্বাসে তারিফ জানাচ্ছে। প্রমত্ত নটরাজের মতো কমল বুঁদ হয়ে আপন মনে বলটাকে নিয়ে দুলে দুলে সারা ঘর ঘুরছে। কাল্পনিক প্রতিপক্ষকে একের পর এক কাটাচ্ছে। বলটাকে পায়ের পাতার উপর তুলে নাচাতে নাচাতে ঊরুর উপর, সেখান থেকে কপালে আবার ঊরু, আবার পাতা—কমলের সর্বাঙ্গে বল খেলা করছে।
পল্টুদা নির্নিমেষে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুখ হাসিতে ভরে রয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ বুজলেন।
কিছুক্ষণ পর মৃদুস্বরে অরুণা বলল, ”কমলদা, বাবা বোধ হয় মারা গেলেন!”
.
।।পাঁচ।।
সকাল ন’টায় অফিসে বেরিয়ে পরদিন রাত ন’টায়, ছত্রিশ ঘণ্টা পর কমল বাড়ি ফিরল। চোখ দুটি লাল, চুল এলোমেলো, ক্লান্তিতে নুয়ে পড়েছে সটান শরীরটা।
একতলায় দুটি ঘর নিয়ে কমল থাকে। একটিতে সে, অপরটিতে অমিতাভ। দুটি লোকের এই সংসারের যাবতীয় কাজ ও রান্না করে দিয়ে কালোর মা রাতে চলে যায়। দশ বছর অগে শিখা মারা যাবার পরই সাত বছরের অমিতাভকে তার দিদিমা গৌহাটিতে নিয়ে চলে যান। দু’বছর আগে সে বাবার কাছে ফিরেছে। প্রথমে দু’জনের সম্পর্কটা ছিল স্কুলে ভর্তি হওয়া নতুন দুটি ছেলের মতো।
দু’বছরেও কিন্তু ওদের মধ্যে ভাব হয়নি। ওরা কথা কমই বলে, দু’জনে দু’জনকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলে। কেউ কারোর ঘরে পর্যন্ত ঢোকে না। তবে একবার রেজেস্ট্রি চিঠি সই করে নেবার জন্য অমিতাভর ঘরে কমল ঢুকেছিল কলমের খোঁজে। একটা খাতার মধ্যে কলম পায়। তখন দেখেছিল, খাতাটা কবিতায় অর্ধেক ভরা আর টেবিলের উপর থাক দিয়ে রাখা বইয়ের ফাঁকে অমিতাভর মায়ের ফোটো। ছবিটা কমলের ঘরে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে ছিল। কমল দুঃখ পেয়েছিল। অমিতাভ তার মা’র ছবিটা চুরি না করে যদি চেয়ে নিত তা হলে সে খুশিই হত। মেধাবী গম্ভীর মৃদুভাষী ছেলেকে কমল ভালবাসে। শুধু অস্বস্তি বোধ করে তার দুর্বল পাতলা শরীর ও পুরু লেন্সের চশমাটার দিকে তাকালেই। অমিতাভ তার বাবাকে ‘আপনি’ বলে। কমলের ইচ্ছে ও ‘তুমি’ বলুক।
অমিতাভর ঘরে আরও দুটি ছেলে বসে কথা বলছে। কমল একবার সেদিকে তাকিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল। ইজিচেয়ারটা পাতাই ছিল, তাতে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল। একে একে তার মনে ভেসে উঠতে লাগল গত চব্বিশ ঘণ্টার ব্যাপারগুলো। কান্না,ছোটাছুটি টেলিফোন করা, শ্মশান যাওয়া, আবার পল্টুদার নাকতলার বাড়ি। পল্টুদার জামাইরা এসেছিল, তাদের আর্থিক সঙ্গতিও ভাল নয়। একশোটা টাকা খুবই কাজে লেগেছে।
পায়ের শব্দে কমল চোখ খুলল। অমিতাভ, তার পিছনে ছেলে দুটি।
”এরা আমার কলেজের বন্ধু, আপনার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছে।” অমিতাভর বিব্রত স্বর কমলের কানে বিশ্রী লাগল। ক্লান্ত ভঙ্গিতে সে বলল, ”আজ থাক, অন্য আর একদিন এসো। আজ আমার শরীর মন দুটোই খারাপ।”
