কথা না বলে ওরা চলে গেল। কমল আবার চোখ বন্ধ করল এবং মিনিট দশেকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।
প্রতিদিনের মতো ঠিক পাঁচটায় ওর ঘুম ভাঙল। ঘরের আলোটা পর্যন্ত নেভানো হয়নি, জামা প্যান্টও বদলানো হয়নি। কমল তড়াক করে লাফিয়ে উঠল।
আধ ঘণ্টার মধ্যেই সে হিটারে চায়ের জল বসিয়ে, প্রতিদিনের মতো অমিতাভর ঘরের দরজায় কয়েকটা টোকা দিয়ে, খাওয়ার টেবিলে এসে অপেক্ষা করতে লাগল। অমিতাভ এসে যখন চেয়ার টেনে বসল তখন চা তৈরি হয়ে গেছে।
”পরশু আমার গুরু মারা গেলেন, তাই বাড়ি ফেরা হয়নি।”
অমিতাভ ভ্রূ কুঞ্চিত করে বলল, ”কে?”
”পল্টু মুখার্জি।” কমল আর কিছু না বলে অমিতাভর একমনে রুটিতে জেলি মাখানো দেখতে লাগল।
”তুমি অবশ্য ওঁর নাম নিশ্চয় শোনোনি।”
”না। খেলার আমি কিছুই জানি না।”
”পল্টুদা হচ্ছেন,” কমল উৎসাহ দেখিয়ে বলে উঠল, ”সাহিত্যে যেমন ধরো…”
অমিতাভর পুরু লেন্সের ওধারে চোখ দুটোকে কৌতূহলভরে তাকিয়ে থাকতে দেখে কমল ঘাবড়ে গেল।
”যেমন রবীন্দ্রনাথ?”
”না না, অত বড় নয়!” কমল অপ্রতিভ হয়ে পড়ল। এবং অবস্থাটি কাটিয়ে ওঠার জন্য মরিয়া হয়ে বলল, ”কিন্তু আমার জীবনে উনি রবীন্দ্রনাথের মতোই।”
”তা হলে আপনি খুবই আঘাত পেয়েছেন।”
কমল চুপ করে রইল।
”মা মারা যেতে আঘাত পেয়েছিলেন কি?”
কমল তীব্র দৃষ্টিতে অমিতাভর দিকে তাকাল। সে মাথা নামিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিল।
”তোমার মামানিয়ে নিতে পারেনি আমার জীবনকে, আকাঙ্ক্ষাকে। একজন ফুটবলারের স্ত্রী হতে গেলে তাকে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়, সহ্য করতে হয়। তা করার মতো মনের জোর তার ছিল না। ট্রেনিং ক্যাম্পে গিয়ে থেকেছি, টুর্নামেন্ট খেলতে বাইরে গেছি—এসব সে পছন্দ করত না। তাই নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া হত। ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধেই যাত্রীর সঙ্গে রোভার্সে খেলতে যাই। তখনই ঘটনাটা ঘটে।”
”মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার পর আপনাকে টেলিগ্রাম করা হয়েছিল। কিন্তু আপনি আসেননি।” অমিতাভ কঠিন ঠাণ্ডা গলায় অভিযুক্ত করল কমলকে। ‘আসেননি’—র পর নিঃশব্দে একটি ‘কেন’ আপনা থেকেই ধ্বনিত হল কমলের কানে। সঙ্গে সঙ্গে রাগে পুড়ে গেল তার মুখের কোমল বিষাদটুকু।
”আগেও বলেছি তোমায়, সেই ট্রেলিগ্রাম আমাদের ম্যানেজার গুলোদার হাতে পড়ে। সেটাকে তিনি চেপে রাখেন, কেননা পরদিনই ছিল হায়দ্রাবাদ পুলিশের সঙ্গে সেমি ফাইনাল খেলা। আমাকে বাদ দিয়ে যাত্রীর পক্ষে খেলতে নামা সম্ভব ছিল না।” কথাগুলো বলতে বলতে কমল তীক্ষ্ন চোখে তাকাল অমিতাভর দিকে।
বাঁকানো ঠোঁটের কোলে মোটা দাগে আগের মতোই অবিশ্বাস ফুটে রয়েছে। আজও ওকে বোঝানো গেল না, টেলিগ্রামটা পেলে সে অবশ্যই খেলা ফেলে মুম্বই থেকে ছুটে আসত।
কমল খাওয়ার টেবিল থেকে উঠে পড়ল। ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাড়িতে হাত বোলাল। বেশ বড় হয়েছে। কিন্তু অফিসে যেতে ইচ্ছে করছে না। দাড়ি না কামালেও চলে। গালে কয়েকটা পাকা চুল। কমল কাঁচি দিয়ে সেগুলো সাবধানে কাটতে বসল।
সদর দরজা খোলার শব্দ হল। কালোর মা বোধ হয়, কিংবা খবরের কাগজওলা। কমল কাঁচি রেখে প্যান্টের পকেট থেকে টাকা বার করতে লাগল। বাজার করে কালোর মা। টাকা পেতে দেরি করলে গজগজ শুরু করে।
”কমলদা!”
সলিল ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ইতস্তত করছে।
”কী রে, এত সকালে?”
”মাঠ থেকে আসছি। প্র্যাকটিস করতে গেছলুম।”
”তোর না পায়ে চোট!”
”ডাক্তারবাবু বললেন কিছু নয়, রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।” সলিল খাটের উপর বসল। কমলের মনে হল ও যেন অন্য কিছু বলতে এসেছে।
”পল্টুদা মারা গেলেন!”
”হুঁ। তিয়াত্তর বছর বয়স হয়েছিল।” কমল দাড়ি কাটতে কাটতে আয়নার মধ্যে দিয়ে সলিলকে লক্ষ করতে লাগল।
”কিছু বলবি আমায়?”
সলিল মাথা নিচু করে পায়ের বুড়ো আঙুলটা মেঝেয় কিছুক্ষণ ঘষাঘষি করে ধরা গলায় বলল, ”কমলদা, দু’দিন আমাদের কিছু খাওয়া হয়নি। আমাদের সংসারে আটটা লোক।”
কমল ভেবে পেল না এখন সে কী বলবে! এ রকম কথা প্রায়ই সে শোনে ময়দানে। প্রথম প্রথম একটা দীর্ঘশ্বাস বুকের মধ্যে কেঁপে উঠত, এখন শুধু তার চোয়ালটা শক্ত হয়ে যায়।
”একটা কার্ডবোর্ড কারখানায় কাজ পেয়েছি, হপ্তায় আঠারো টাকা। আজ থেকেই কাজে লাগতে হবে।”
”ফুটবল?”
সলিল আবার মাথা নামিয়ে চুপ করে রইল। কমল দেখল, টসটস করে ওর চোখ বেয়ে জল পড়ছে। তারপর নিঃসাড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওকে ডাকবে ভেবেও কমল ডাকল না।
জীবনে প্রথম বড় সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে ছেলেটা। এখন ওর মধ্যে লড়াই শুরু হয়েছে ফুটবলের সঙ্গে সংসারের। আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মায়া—মমতা—ভালবাসার। যদি ফুটবলকে ভালবাসে, বড় খেলোয়াড় হবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যদি থাকে, তা হলে ওকে নিষ্ঠুর হতে হবে। সংসারের সুখ—দুঃখ থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। বাঙালিরা বড় কোমল। বেশির ভাগ ছেলেরাই তা পারে না। সংসারের সর্বগ্রাসী হাঁ—এর মধ্যে ঢুকে যায়। ও নিজেই নিক। দু—চারটে টাকা দিয়ে করুণা করে ওকে ফুটবলার হয়ে ওঠায় সাহায্য করা যায় না।
কমলের নিজের কথা মনে পড়ে গেল। মা মারা যাওয়ার পর সংসার দেখাশুনোর জন্য জোর করে বাবা তার বিয়ে দেয়। তখন বয়স মাত্র কুড়ি। তারপর অদ্ভুত একটা লড়াই তাকে করে যেতে হয় অমিতাভর মায়ের সঙ্গে। কিন্তু ছেলে সেসব কথা বুঝবে না। ওর বন্ধুরা আগ্রহ নিয়ে আলাপ করতে আসে অথচ অমিতাভ তার বাবার খেলা সম্পর্কে উদাসীন। একদিনও বলেনি, টিকিট দেবেন—খেলা দেখতে যাব! কমলের বহুদিনের সাধ ছেলে তার খেলা দেখতে আসুক।
