পল্টুদা ইজিচেয়ারে খাড়া হয়ে বসেছেন। নাকের পাটা ফুলে উঠেছে। দু’চোখে ঘনিয়ে উঠেছে রাগ।
”অরু!” পল্টুদা ঘরের দিকে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর গলায় ডাকলেন, ”অরু, শুনে যা।”
পল্টুদার বড় মেয়ে অরুণা ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই পল্টুদা বললেন, ”আমার লাঠিটা নিয়ে আয়।”
কমল শোনা মাত্র অজান্তে এক পা পিছিয়ে গেল। অরুণা অবাক হয়ে বলল, ”এখন আবার কোথায় বেরোবে?”
”লাঠিটা নিয়ে আয় বলছি।” পল্টুদা হুঙ্কার দিলেন।
বাচ্চচা ছেলের মতো কমলের সন্ত্রস্ত মুখটা দেখে অরুণা আঁচ করতে পারল যে, লাঠি আনার কাজটা উচিত হবে না। এরকম দৃশ্য সে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে। শুধু মজা করার জন্য বলল, ”মোটা লাঠিটা আনব বাবা?”
পল্টুদা উত্তর দিলেন না। অরুণা ঘরের দিকে পা বাড়ানো মাত্র কমল আর একটিও কথা না বলে ঘুরেই দ্রুত ছুটতে শুরু করল। যতক্ষণ দেখা যায় অপসৃয়মাণ ছুটন্ত কমলকে দেখতে দেখতে পল্টুদা এগিয়ে গেলেন। রাস্তার ধারে এসে থুতনি তুলে চেষ্টা করলেন কমলকে দেখার।
অবাক হয়ে রাস্তার লোকেরা তাকিয়ে। বহু লোক কমলকে চেনে। এত বড় এক নামকরা ফুটবলারকে জুতো, জামা আর ফুলপ্যান্ট পরা অবস্থায় সকাল আটটার সময় গিজগিজে ভিড়ের রাস্তা দিয়ে ছুটতে দেখবে, এমন দৃশ্য কল্পনাও করতে পারে না।
পল্টুদা অবসন্নের মতো ফিরে এসে ইজিচেয়ারে বসলেন। বাঁ হাতটা চোখের উপর রাখলেন। অরুণা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বাবার কপালে সে হাত রাখতেই পল্টুদা চোখ থেকে বাঁ হাতটা নামালেন। জলের শীর্ণ ধারা দুটি গাল বেয়ে নেমে আসছে।
”মনে বড় দাগা পেয়েছে ছেলেটা। দুঃখ তো জীবনে আছেই, কিন্তু এমন অন্যায় পথ ধরে দুঃখগুলো কেন যে আসে!” পল্টুদা আবার চোখের উপর হাত রাখলেন।
অনেকক্ষণ পর পল্টুদার রান্নাঘরের জানলায় উঁকি দিল দরদর ঘাম ঝরা আর পরিশ্রমে লাল হয়ে ওঠা কমলের মুখ।
”অরু!”
অরুণা মুখ তুলল বাটনা বাটা বন্ধ করে।
”কমলদা? এখনও তো—।”
”অ্যাঁ, এখনও?”
”হ্যাঁ, লাঠিটা তো হাতেই রেখেছে দেখলাম। তুমি যাদবপুর স্টেশন পর্যন্ত ঠিক গেছ তো?”
‘ফুটবলের দিব্যি।”
”দাঁড়াও দেখে আসি।”
আধ মিনিট পরেই অরুণা ফিরে এসে বলল, ”সদর দরজা দিয়ে এসো। না, হাতে লাঠি নেই আর।”
পল্টুদা তখন ছুঁচ—সুতো নিয়ে জামার বোতাম লাগাতে ব্যস্ত। কমলকে একনজর দেখে বললেন, ”খেয়ে এসেছিস?”
”হ্যাঁ।”
”ছেলে কেমন আছে? বয়স কত হল?”
”ভাল, পাঁচ বছর পূর্ণ হবে এই সেপ্টেম্বরে।”
”প্র্যাকটিসটা আরও ভাল করে কর। হতাশা আসবে, তাকে জয় করতেও হবে। ইন্ডিয়া টিমে খেললেই কি বড় প্লেয়ার হয়? বড় তখনই হয়, যখন সে নিজে অনুভব করে মনের মধ্যে আলাদা এক ধরনের সুখ, প্রশান্তি। সেখানে হতাশা পৌঁছোয় না। তুই খেলা ছেড়ে দিবি বলছিস, তার মানে তুই বড় খেলোয়াড় হতে পারিসনি।”
কমল মাথা নিচু করে কাঠের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। একটা অদ্ভুত ক্ষোভ আর কান্না মিলেমিশে তখন তার বুকের মধ্যে দুলে উঠেছিল।
.
আর এখন, তেরো বছর আগের ওই সব কথা মনে করতে করতে যখন সে বাস থেকে নেমে মিনিট চারেক হেঁটে পল্টুদার বাড়িতে ঢুকল, তখন একটা অদ্ভুত মমতা আর বেদনা কমলের বুকের মধ্যে ফেঁপে উঠছিল। থাক দেওয়া তিনটে বালিশের উপর হেলান দিয়ে পল্টুদা আধশোয়া। ওকে দেখে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন।
”ভালই আছি।” মৃদুস্বরে পল্টুদা বললেন।
”কথা বলা একদম বারণ।” অরুণা কথাটা বলল কমলকে লক্ষ্য করে।
কমল তাকাল অরুণার দিকে। সাদা থান পরনে। পাঁচ বছর আগে বিধবা হয়ে একটি ছেলে নিয়ে বাপের বাড়িতেই রয়েছে। এখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। পল্টুদা আরও তিনটি মেয়ের বিয়ে দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। স্ত্রী দু’বছর আগে মারা গেছেন। সংসারে ছোট মেয়ে করুণা ছাড়াও আছে এক বিধবা বোন। শুকনো মুখে তারা খাটের ধারে দাঁড়িয়ে। অরুণার ছেলে পিন্টু দাদুর খাটের একধারে বসে।
”কেমন আছেন?” কমল ফিসফিস করে অরুণাকে জিজ্ঞেস করল। ”ডাক্তার দেখানো হয়েছে?”
”হ্যাঁ, বললেন কিছু করার নেই।”
”ওষুধ?”
”দিয়েছেন লিখে। আনা হয়নি। বাবাই বারণ করলেন।”
”প্রেসক্রিপশনটা দাও।” কমল হাত বাড়াল।
পল্টুদা ওদের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। ক্লান্ত এবং গম্ভীর স্বরে বললেন, ”আমার জন্য আর টাকা নষ্ট করার দরকার নেই।”
বাড়ানো হাতটা কমল সন্তর্পণে নামিয়ে নিল।
”আর কেউ আসেনি?” কমলের প্রশ্নে অরুণা মাথা নাড়াল। পল্টুদার হাতে গড়া চারজন প্লেয়ার ইন্ডিয়া টিমে খেলেছে, পনেরো জন বেঙ্গল টিমে।
”ব্যালান্স, কমল, ব্যালান্স কখনও হারাসনি। আমি ব্যালান্স রাখতে পারিনি তাই কিছুই রেখে যেতে পারছি না, একমাত্র তোকে ছাড়া।” পল্টুদা ডান হাতটা পিণ্টুর মাথায় রেখে চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বললেন, ”এই পৃথিবীটা ঘুরছে ব্যালান্সের ওপর। মানুষ হাঁটে ব্যালান্সে, দৌড়োয়, ড্রিবল করে, এমনকী মানুষের মনও রয়েছে ব্যালান্সের ওপর। চালচলনে, ব্যবহারে ও চিন্তাধারায় কখনও ব্যালান্স হারাসনি। কে আমায় দেখতে এল কি এল না, তাই নিয়ে আমার আর কিছু যায়—আসে না। তুই এসেছিস, জানতুম তুই আসবি।” এক মুহূর্ত থেমে বললেন, ”এদের তুই একটু দেখিস। আজ তোর কাছে এইটেই আমার শেষ চাওয়া।”
”পল্টুদা, আমি থাকলে আপনি কথা বলেই যাবেন, তার থেকে আমি বরং চলে যাই।”
