”আমি আর পাঁচজনের মতো—কোনও তফতাই নেই?” কমল প্রায় ফিসফিস করে বলল।
রথীনের মুখে অস্বস্তিকর বেদনার ছাপ মুহূর্তের জন্য পড়ে মিলিয়ে গিয়েই কঠিন হয়ে উঠল।
”বিপুল ঘোষ, রণেন দাস কি সতু সাহার মতো কেরানিদের সঙ্গে আমার তফাত নেই, রথীন এ তুই কী বলছিস! আমি ইন্ডিয়া টিমে খেলেছি, দেশের জন্য আমার কন্ট্রিবিউশন আছে। জীবনের সেরা সময়ে দিনের পর দিন পরিশ্রম করেছি, কষ্ট করেছি, লেখাপড়া করার সময় পাইনি, জীবনের নিরাপত্তার কথা ভাবিনি, সংসারের দিকে তাকাইনি। কী স্যাক্রিফাইস ওরা করেছে, বল? ওরা আর আমি সমান হয়ে যাব কোন যুক্তিতে?”
রথীন চুপ করে থাকল। গাড়ি চালানোয় ওর মনোযোগটাও বেড়ে গেল হঠাৎ।
”আমি এখনও ফুটবলের জন্য কিছু করতে চাই। প্লেয়ার তৈরি করতে চাই। তাই অফিস থেকে আগে বেরোই। আর অফিস লিগে খেলাটা তো এলেবেলে।”
”কমল, আমাদের দেশে খেলোয়াড়কে ততদিনই মনে রাখে যতদিন সে মাঠে নামে। তারপর স্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। নতুন ‘হিরো’ আসে, তাকে নিয়ে নাচানাচি করে। দ্যাখ না, যাত্রীতে এখন প্রসূন ভটচাজকে নিয়ে কী কাণ্ড চলছে,অথচ ওর বাবাকেই একদিন সাপোর্টাররা মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল ঘুষ খেয়েছে বলে। তোকে মনে রাখবে এমন একটা কিছু কর।”
”রথীন, আমার বয়স হয়ে গেছে। এখন আর কিছু করার মতো সামর্থ্য নেই। ফুটবলারের সামর্থ্য তো শরীর।”
”তা হলে মন দিয়ে চাকরিটা কর। তোকে চাকরি দেওয়ায় ইউনিয়ন থেকে পর্যন্ত অপোজিশন এসেছিল। সবাই বলেছিল উঠতি নামী অল্প বয়সীকে চাকরি দিতে। তুই তো জানিস, সেকেন্ড ডিভিশনে খেলে অপূর্ব ছেলেটাকে চাকরি দেওয়া হবে বলে গত বছর আটটা ম্যাচ খেলানো হয়। ভালই খেলে কিন্তু এখনও চাকরি পায়নি। কমিটি মেম্বাররা বড় বড় নাম চায়। ইস্টবেঙ্গল—মোহনবাগানের চার জনের নাম উঠেছিল। আমি তর্ক করে বলি, অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, অফিসের খেলায় এইসব বড় ক্লাবের নামী প্লেয়াররা একদমই খেটে খেলে না। ওরা থেকেও টিম হারে। এতে অফিসের কোনও লাভ হয় না। বরং পড়তি প্লেয়াররা ভাল সার্ভিস দেয়। তোর জন্য এ জি এম পর্যন্ত ধরাধরি করেছি। এখন তুই যদি অফিসের হয়ে না খেলিস তা হলে আমার মুখ থাকে কোথায়? অফিসে নানা দিকে নানা দিকে নানা কথা উঠেছে, এরকম ফাঁকি দিলে তো আমাকে তোর এগেনস্টে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নিতে হবে।”
”কিন্তু আমার পক্ষে শোভাবাজারের ম্যাচের দিন পাঁচটা পর্যন্ত অফিসে থাকা কিংবা অফিসের হয়ে খেলা সম্ভব নয়।”
কমল গোঁয়ারের মতো গোঁজ হয়ে বসল। রথীনের মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল।
”অনেকগুলো চাকরি তো ছেড়েছিস। এই বয়সে এই চাকরিটা যদি হারাস, তা হলে কী হবে ভেবে দেখিস। আমার তো মনে হয় না, আর কোথাও পাবি। দেশের লেখাপড়া জানা বেকার ছেলেদের সংখ্যাটা কত জানিস?”
”না, জানি না, জানার ইচ্ছেও নেই। এখানে থামা।”
কমল অধৈর্য ভঙ্গিতে প্রায় চিৎকার করে উঠল। রথীন একটু অবাক হয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ব্রেক কষে গাড়ি থামল।
”আরও এগিয়ে তোকে নামিয়ে দিতে পারি।”
”না, এখানেই নামব আর টাকাটা কাল তোকে অফিসেই দিয়ে দেব।”
কমল গাড়ি থেকে নেমে অনাবশ্যক জোরে দরজাটা বন্ধ করে হনহনিয়ে পিছন দিকে হাঁটতে শুরু করল বাস স্টপের দিকে।
.
।।চার।।
বাসে উঠে দমবন্ধ করা ভিড়ে কমল মাথার উপরের রড ধরে মনে করতে চেষ্টা করল পুরনো কথা। তেরো বছর আগে প্রথমবার যুগের যাত্রীতে খেলার সময় রথীন ছিল রাইট ব্যাক, কমল স্টপার। রথীন সে বছর ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ক্যাপ্টেন হয়ে লখনৌ থেকে স্যার আশুতোষ ট্রফি এনেছে। মোটামুটি কাজ চালাবার মতো খেলত। তখন ডাকত ‘কমলদা’। রথীন ছিল গুলোদার খুবই প্রিয়পাত্র। মালয়েশিয়ায় নতুন টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছে মারডেকা নামে। ইন্ডিয়া টিম খেলতে যাবে। বোম্বাইয়ে ট্রেনিং ক্যাম্পে বাংলা থেকে বারো জন গিয়েছিল। যাত্রী থেকে তিনজন—রথীন, আমিরুল্লা আর সুনীত। বলা হয়েছিল, কমলের হাঁটুতে চোট আছে তাই ট্রায়ালে পাঠানো হয়নি, তা ছাড়া চোখেও নাকি কম দেখছে। দুটোই ডাহা মিথ্যে কথা।
কমল সামান্য একটু চোট পেয়েছিল ইস্টার্ন রেলের সঙ্গে খেলায়। পরের ম্যাচে কমল বসে, রথীন স্টপারে খেলে কালীঘাটের বিরুদ্ধে।
ভালই খেলেছিল। তার পরের ম্যাচে এরিয়ান্সের কাছে এক গোলে যাত্রী হারে। কমল একটা হাই ক্রসের ফ্লাইট বুঝতে না পেরে হেড করতে গিয়ে ফসকায়। সেন্টার ফরোয়ার্ড পিছনে ছিল, বলটা ধরেই গোল করে। খেলার পর ক্লাবে কানাঘুষো শোনা যায়, কমল চোখে ভাল দেখতে পাচ্ছে না।
কমল ছুটে গেছল পল্টু মুখার্জির কাছে।
”পল্টুদা, এরা আমায় বসিয়ে দিল একেবারে।”
”সে কী রে, একেবারে বসে গেছিস!” পল্টুদা সদর দরজার বাইরে একচিলতে সিমেন্টের দাওয়ায় ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে কাগজ পড়ছিলেন। খুব একচোট প্রথমে হো হো করে হাসলেন।
”বসে গেছিস? কই দেখছি না তো, দিব্বি তো দাঁড়িয়ে আছিস।”
”না পল্টুদা, ঠাট্টা নয়। আর ভাল লাগছে না কিছু। আমি খেলা ছেড়ে দেব।”
”ভাল লাগছে না বুঝি! আচ্ছা, ভাল লাগার ব্যবস্থা করছি। এখান থেকে একদৌড়ে যাদবপুর স্টেশন যাবি আর একদৌড়ে আসবি। এখুনি।”
কমল কথাটাকে আমল না দিয়ে বলল, ”আমি সত্যিই খেলা ছেড়ে দেব। এমন জঘন্য অন্যায়, নখের যুগ্যি নয় রথীন, সে—” বলতে বলতে কমল থেমে গেল।
