”আরে, কমল যে, কী ব্যাপার!”
”রথীন কোথায়? এইমাত্র ফোনে আমায় এখানে আসতে বলল।”
”হ্যাঁ, আমার কাছে একশো টাকা চেয়েছিল তোমাকে দেবার জন্য।”
বলতে বলতে তপেন বুকপকেট থেকে একটি নোট বার করে এগিয়ে ধরল। কমলের মনে হল টাকা নিয়ে তপেন যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছে।
গুলোদার চামচাটি ব্যস্ত হয়ে বলল, ”ভাউচারে সই করাতে হবে না?”
তপেন তাচ্ছিল্যভরে বলল, ”না, এটা ক্লাবের টাকা নয়। কমল তো যাত্রীর টাকা ছোঁবে না, আমার পকেট থেকেই দিচ্ছি।”
কমল গম্ভীর গলায় বলল, ”টাকাটা কালই রথীনের হাতে দিয়ে দেব। ও এখন কোথায়?”
”ঘরে কথা বলছে প্লেয়ারদের সঙ্গে। কাল কুমারটুলির সঙ্গে খেলা।”
কমল ইতস্তত করল। রথীনকে একবার বলে যাওয়া উচিত। কিন্তু প্লেয়ারদের সঙ্গে হয়তো কালকের খেলা সম্পর্কে আলোচনা করছে, তা হলে যাওয়াটা উচিত হবে না বাইরের লোকের।
”কমল এ বছর খেলছ তো?” তপেন রায় হাই চাপার জন্য মুখের সামনে হাত তুলে রেখে বলল। তারপর স্বগতোক্তির মতো মন্তব্য করল, ”আর কত দিন চালাবে!”
কমল হাসল মাত্র।
”তপেনদা, কমলের বডিটা দেখেছেন!” চামচা বলল। ”এখনকার একটা ছেলেরও এমন ফিট বডি নেই।”
তপেন কথাগুলো না শোনার ভান করে তার আগের কথার জের ধরে বলল, ”চার ব্যাক হয়ে বয়স্ক ডিফেন্সের প্লেয়ারদের সুবিধেই হয়েছে। কেরিয়ারটার সঙ্গে সঙ্গে রোজাগারটাও বাড়াতে পেরেছে। শোভাবাজার থেকে এখন পাচ্ছ কত?”
”একটা আধলাও নয়।”
তপেনের ভ্রূ কুঞ্চিত হল কয়েক সেকেন্ডের জন্য।
”ফ্রি সার্ভিস এই বাজারে!” চামচা অবাক হল। ”অবশ্য কমল লিগে দুটো ছাড়া তো ম্যাচই খেলে না।”
”শুধু দুটো ম্যাচ! কেন, আর খেলে না?” তপেন প্রশ্ন করল চামচাকে।
”লাস্ট টু ইয়ার্স তো কমল শুধু আমাদের এগেনস্টেই খেলেছে।” চামচা চোখ পিটপিট করল। ”যাত্রীকে কিন্তু কাঁপাতে পারেনি কমল। আমরা ফুল পয়েন্ট তুলেছি। যাত্রীর জার্সি সকলের সামনে খুলে ছুড়ে ফেলেছিল বটে, কিন্তু দম্ভ রাখতে পারেনি। ফুটবল কি একজনের খেলা!”
কমলের বলতে ইচ্ছে হল, ”প্লেয়ার, অফিসিয়াল, রেফারি, সবকিছু ম্যানেজ করেই তো ফুল পয়েন্ট তুলেছ।” কিন্তু বলতে পারল না। রথীন স্প্রিংয়ের পাল্লা ঠেলে এই সময় ঘর থেকে বেরোল। সঙ্গে চারটি ছেলে। কমলকে দেখে সে বলল, ”অঃ, কখন এলি? তপেনদা দিয়ে দিয়েছেন?”
তপেন ঘাড় নাড়তেই রথীন বলল, ”আমি টালিগঞ্জের দিকেই এখন যাব। কমল, তুই তো নাকতলায় যাবি, যদি মিনিট কয়েক অপেক্ষা করিস, তা হলে আমার সঙ্গে যেতে পারিস।”
কমল বলল, ”আমি তোর গাড়িতে গিয়ে বসছি। তুই তাড়াতাড়ি কর।”
তপেন মৃদুস্বরে বলল, ”টাকাটা ফেরত দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হতে হবে না, কমল।”
”কেন?”
”যখন দরকার হবে আমি চেয়ে নেব। তোমার প্রয়োজনের সময় দিতে পেরেছি, শুধু এইটুকু মনে রাখলেই আমি খুশি হব। তুমি বিপদে পড়ে যাত্রীর কাছেই এসেছ এটা ভাবতে আমার ভালই লাগছে।”
শুনতে শুনতে কমলের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে এল। সে বলল, ”আমি টাকা চেয়েছি রথীনের কাছে, যাত্রীর কাছে নয়। চেয়েছি অন্যের জন্য, নিজের জন্য নয়।”
কমল বলতে যাচ্ছিল, এ টাকা যদি যাত্রীর হয় তা হলে এখনি ফিরিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু পল্টুদার মুখটা ভেসে উঠতেই আর বলতে পারল না। তার মনে হচ্ছে, অদ্ভুত একটা খাঁচার মধ্যে সে ঢুকে পড়েছে, যার চারদিকটাই খোলা অথচ বেরোনো যাচ্ছে না।
তপেন তার স্মিত হাসিটা কমলের মুখের উপর অনেকক্ষণ ধরে রেখে বলল, ”যদি আরও টাকার দরকার হয় আমাকে বাড়িতে ফোন কোরো। পল্টু মুখার্জির চিকিৎসায় আমাদেরও সাহায্য করা কর্তব্য। এ টাকা ধার নয় কমল, পল্টুদাকে আমার…যুগের যাত্রীর প্রণামী।”
কমল শুনতে শুনতে হঠাৎ নিজেকে অসহায় বোধ করল। তার মনে হচ্ছে, পেনাল্টি বক্সের মধ্যে বল নিয়ে দুটো ফরোয়ার্ড এগিয়ে আসছে। সে একা তাদের মুখোমুখি। ব্যাকেরা কোথায় দেখার জন্য চোখ সরাবার সময়ও নেই।
.
গাড়িতে দু’জনের কেউই অনেকক্ষণ কথা বলল না। রেড রোড ধরে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের পশ্চিম দিয়ে যখন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের কাছে পৌঁছেছে তখন রথীন মুখ ফিরিয়ে বলল, ”অফিসের দুটো খেলায় তুই খেলিসনি!”
”এসব খেলা অর্থহীন, আমার ভাল লাগে না খেলতে। তা ছাড়া শোভাবাজারের প্র্যাকটিস ম্যাচ ছিল। কতকগুলো নতুন ছেলে কেমন খেলে দেখার জন্যই গেছলুম।”
”কিন্তু ব্যাঙ্ক চাকরি দিয়েছে তার হয়ে খেলার জন্য।’
কমল চুপ করে রইল।
”এই নিয়ে কথা উঠেছে। তা ছাড়া রোজই তুই কাজ ফেলে সাড়ে তিনটে—চারটেয় বেরিয়ে যাস।”
”কে বলল, নিশ্চয় রণেন দাস?”
”যেই বলুক, সেটা কোনও কথা নয়। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি তারা মিথ্যে বলেনি।”
পুলিশ হাত তুলেছে। রথীন ব্রেক কষল। ডানদিকে মোড় ফিরে হরিশ মুখার্জি রোডে এবার গাড়ি ঢুকবে। কমল পুলিশটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। রথীন মোড় ঘুরে গিয়ার বদল করে শান্ত মৃদু স্বরে বলল, ”বুঝিস না কেন, তোর আর আগের মতো নাম নেই, খেলা নেই। এখনকার উঠতি নামী প্লেয়াররা যে অ্যাডভান্টেজ অফিসে পায় বা নেয়, তোর পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। তোকে এখন চাকরিটাকেই বড় করে দেখতে হবে। তার জন্য যে সব নিয়ম মানতে হয় মেনে চলতে হবে। অন্য পাঁচজনের থেকে তুই এখন আর আলাদা নোস।”
