তাজ্জব হয়ে কমল জিজ্ঞাসা করল, ”পেনাল্টি কীসের জন্য?”
”নো নো, ইটস পেনাল্টি।’ রাধাকান্ত বলটা হাতে নিয়ে দাগের উপর বসাল।
”বক্সের অনেক বাইরে ফাউল হয়েছে।” কমল নাছোড়বান্দার মতো তর্ক করতে গেল।
”নো আরগুমেন্ট। আই অ্যাম কোয়ায়েট সিওর অফ ইট।”
”বুঝেছি।” কমল তির্যককণ্ঠে বলল। রাধাকান্ত না শোনার ভান করে বাঁশি বাজাল। কমল চোখ বন্ধ করে দু’কানের পাশে তালু চেপে ধরল। এখনি সেই মর্মান্তিক চিৎকারটা উঠবে।
একটা প্রবল দীর্ঘশ্বাস মাঠের উপর গড়িয়ে পড়ল। কমল অবাক হয়ে চোখ খুলে দেখল, ভরত বলটা দু’হাতে বুকের কাছে আঁকড়ে উপুড় হয়ে। এরপর শোভাবাজার দ্বিগুণ বিক্রমে যাত্রীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হাফটাইমের আগের মিনিটে রাইট উইং বল নিয়ে টাচ লাইন ধরে তরতরিয়ে ছুটে চমৎকার সেন্টার করে। বলটা পেনাল্টি বক্সের মাথায় দাঁড়ানো রাইট ইন বুক দিয়ে ধরেই সামনে বাড়িয়ে দেয়। লেফট উইং যাত্রীর দুই ব্যাকের মধ্যে দিয়ে ছিটকে ঢুকে এসে বলটা গোলে প্লেস করা মাত্র রাধাকান্ত বাঁশি বাজিয়ে ছুটে আসে। অফসাইড। তখন কমল মনে মনে বলে, ”আক্রমণ, স্টপার কী করে এই আক্রমণ রুখবে!”
যুগের যাত্রী খেলাটা ১—০ জিতেছিল। প্রায় শেষ মিনিটে ফ্রি কিক থেকে শোভাবাজার গোলের মুখে বল পড়েছিল। ভরত এগিয়ে পাঞ্চ করতেই যাত্রীর রাইট উইংয়ের মাথায় বল আসে। সে হেড করে গোলের দিকে পাঠাতেই ভরত পিছু হটে বলটা ধরতে গিয়ে আটকে যায়। যাত্রীর লেফট ইন তার প্যান্ট ধরে আছে। বিনা বাধায় বল গোলে ঢোকে।
খেলা শেষে মাঠের মধ্যে শোভাবাজার প্লেয়াররা ভিড় কমার জন্য অপেক্ষা করছিল। এমন সময় রথীনকে দেখতে পেয়ে কমল হেসে এগিয়ে এসে বলল, ”আজ আমরা এক গোলে জিতেছি!”
রথীন শুকনো হেসে বলল, ”এ বছর আমি যাত্রীর ফুটবল সেক্রেটারি।”
”ওহ, তাই তো। মনেই ছিল না। সরি, আমার বরং বলা উচিত, রেফারি আজ জিতেছে। এভাবে না জিতে ভাল করে টিম কর। খেলার মতো খেলে জেত।”
কথাটা গায়ে না মেখে রথীন বলল, ”এভাবে কদ্দিন তুই আমাদের জ্বালাবি বল তো?”
”আমি জ্বালাচ্ছি! তুই তা হলে ফুটবলের ‘ফ’—ও বুঝিস না। তোদের গুলোদাকে জিজ্ঞেস কর, তিনি বোঝেন বলেই আমাকে দু’বছর আগেই ড্রেস করিয়ে সাইড লাইনের বাইরে বসিয়ে রাখতেন।”
”তোকে দেখলে হিংসে হয়। এখনও দিব্যি খেলাটা রেখেছিস, আর আমরা কেমন বুড়িয়ে গেলুম।”
”তার বদলে তুই আখেরটা গুছিয়ে নিতে পেরেছিস। শুনেছি প্রগ্রেসিভ ব্যাঙ্কে এখন বেশ বড় পোস্টে আছিস। একটা চাকরিবাকরি দে না।” হাসতে হাসতে কমল বলল, ”তা হলে আর যাত্রীকে জ্বালাব না। খেলে কি আর তোদের মতো বড় ক্লাবের সঙ্গে পারা যায়!”
”আর ইউ সিরিয়াস, চাকরি সম্পর্কে? তা হলে টেন্টে আয়, কথা বলা যাবে।”
”সরি রথীন।” কঠিন হয়ে উঠল কমলের মুখ। ”চাকরি আমার দরকার, দু’মাস ধরে বেকার। কিন্তু যাত্রীর টেন্টে যাব না।”
আর কথা না বলে কমল সরে আসে রথীনের কাছ থেকে। এসব পাঁচ বছর আগের ঘটনা।
.
।।তিন।।
যুগের যাত্রীর টেন্টের সামনে রাস্তায় একটা সবুজ পুরনো ফিয়াট মোটর দাঁড়িয়ে। কমল দেখা মাত্র চিনল, এটি রথীনের। মাস ছয়েক আগে রথীনের পদোন্নতি হয়ে ডিপার্টমেন্টাল ইনচার্জ হয়েছে। এখন মাইনে সতেরো শো। ব্যাঙ্কে রীতিমতো ক্ষমতাবান। চলাফেরা কথাবাতায় সেটা সে সর্বদা বুঝিয়েও দিতে চায়। তা ছাড়া রথীন সুদর্শন, যদিও এখন ভুঁড়ি হয়ে আগের মতো আর ততটা কমবয়সী দেখায় না।
পাঁচ বছর আগে সেদিন রথীনকে নিছকই ঠাট্টা করে কমল চাকরির কথা বলেছিল। পরের দিনই রথীন শোভাবাজার টেন্টে ফোন করে তাকে দেখা করতে বলে। কমল খুবই অবাক হয়ে গিয়েছিল। গোঁয়ারের মতো এক কথায় বেঙ্গল জুট মিলের চারশো টাকার চাকরিটা ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে দু’মাস ধরে অবস্থাটা শোচনীয় হয়ে আসছিল। কমল ব্যাঙ্কে গিয়ে রথীনের সঙ্গে দেখা করে। রথীন বলে, ”আমাদের অফিস টিমে তোকে খেলতে হবে। অফিস স্পোর্টস ক্লাবের সেক্রেটারির সঙ্গে কথা হয়েছে। যত তাড়াতাড়ি পারিস দরখাস্ত দিয়ে যা। ডেসপ্যাচ সেকশনে লোক নেওয়া হবে।”
”মাইনে কত?” কমল প্রশ্ন করে।
রথীন ওর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে, ”যদি বলি একশো টাকা! দু’মাস বেকার আছিস, মাইনে যদি পঞ্চাশ টাকাও হয়, সেটাও তো তোর লাভ।”
কমল আর কথা বাড়ায়নি। পরদিনই দরখাস্ত নিয়ে হাজির হয় এবং যে চাকরিটি পায় তার বেতন এই পাঁচ বছরে ৪৬১ টাকায় পৌঁছেছে। কমল জানে, তার যা শিক্ষাগত যোগ্যতা তাতে এই চাকরি কোনও ভাবেই তার পক্ষে পাওয়া সম্ভব হত না, যদি না রথীন পাইয়ে দিত। পঞ্চান্ন থেকে ষাট নাগাদ কমল গুহর যে নাম ছিল, এখন তার অর্ধেকও নেই। ফুটবল ভাঙিয়ে চাকরি পাওয়ার দিন তার উতরে গেছে। তবু পেয়েছে একমাত্র রথীনের জন্যই।
সাত বছর পর যাত্রীর টেন্টে আবার ঢুকতে গিয়ে কমলের মনে হল, তাকে দেখে সবাই নিশ্চয়ই অবাক হবে। কিন্তু কেউ যদি অপমান করার চেষ্টা করে? অবশ্য নিজের জন্য টাকা চাইতে নয় এবং ফুটবল সেক্রেটারি আসতে বলেছে বলেই এসেছি, সুতরাং কমল মনে মনে বলল—আমার মনে গ্লানি থাকার কোনও কারণ নেই।
টেন্টের বাইরে ইতস্তত ছড়ানো বেঞ্চে যাত্রীর প্রবীণ মেম্বাররা গল্পে ব্যস্ত। তারা কেউ কমলকে লক্ষ করল না। টেন্টের মধ্যে ঢুকে কমলের সঙ্গে প্রথম চোখাচোখি হল যুগের যাত্রীর অ্যাকাউন্ট্যান্ট তপেন রায়ের। টেবিলে আরও দু’জন লোক বসে। একজনকে কমল চেনে। গুলোদার ‘চামচা’ হিসাবে খ্যাতি আছে তার।
