শোনা মাত্রই ঝাঁঝিয়ে ওঠে কমলের মাথা। দিনের পর দিন হাজার হাজার লোকের সামনে আনকোরা প্লেয়ারের মতো সেজেগুজে লাইনের ধারে বসে থাকার লজ্জা আর অপমানের ক্ষতে যেন নুনের ছিটে এই দশ মিনিটের জন্য খেলতে নামানো।
”এতদিনে হঠাৎ মনে পড়ল যে?” কমল অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা স্বরে বলে।
”রাগ করিসনি ভাই, বুঝিসই তো, আমার কোনও হাত নেই। সবই একজনের ইচ্ছেতেই তো হয় এখানে।” বিভাস চোরের মতো এধার—ওধার তাকিয়ে বলে, ‘খেলার আগেই গুলোদা বলে দেয় কমলকে দশ মিনিট আগে নামিও।”
কমল বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পিছু ফিরে গ্যালারির দিতে তাকায়। একেবারে উপরে গুলোদা তার নির্দিষ্ট জায়গাটিতে বসে। কমল সটান উঠে এসে গুলোদার সামনে দাঁড়াল। জার্সিটা গা থেকে খুলে হাতে ধরে বলল, ”বয়স হয়েছে, খেলাও পড়ে এসেছে। কিন্তু কমল গুহ যতদিন বল নিয়ে ময়দানে নামবে, ততদিন এই জার্সিকে সে ভয়ে কাঁপাবে।”
জার্সিটা হতবাক গুলোদার কোলে ছুড়ে দিয়ে,খালি গায়ে কমল শত শত লোকের কৌতূহলী দৃষ্টির ভিড় কাটিয়ে গ্যালারি থেকে নেমে আসে। তাঁবুতে এসে জামা প্যান্ট পরে, নিজের বুট এবং অন্যান্য জিনিসগুলো ব্যাগে ভরে যখন সে বেরোচ্ছে, তখন খেলা শেষের বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে হাউইয়ের মতো একটা উল্লাস আকাশে উঠে প্রচণ্ড শব্দে ফেটে পড়ল। কমল থমকে পিছন ফিরে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে অস্ফুটে বলল, ”এই শব্দকে কাতরানিতে বদলে দেব।”
যুগের যাত্রী তাঁবুর চৌহদ্দিতে কমল আর পা দেয়নি। পরের বছর ট্রান্সফারের প্রথম দিনেই সে সই করে আসে শোভাবাজার স্পোর্টিংয়ে খেলার জন্য। লিগ তালিকায় শেষের পাঁচ—ছ’টি দল প্রথম ডিভিশনে টিকে থাকার জন্য জোট পাকায় আর পয়েন্ট ছাড়াছাড়ি করে, শোভাবাজার তাদেরই একজন। তিনটি খেলায় এগারো গোল খেয়ে সে বছর ওদের খেলা পড়ে যায় যাত্রীর সঙ্গে। কমল খেলতে নেমেছিল এবং শুধু তারই জন্য যাত্রীর ফরোয়ার্ডরা পেনাল্টি বক্সের মাথা থেকেই বার বার ফিরে যায়। খেলা ০—০ শেষ হয়। শেষ বাঁশির সঙ্গে মাঠে থমথমে গাম্ভীর্য নেমে আসে। কমল শোভাবাজারের দু’জন প্লেয়ারে কাঁধে ভর দিয়ে টলতে টলতে মাঠ থেকে বেরোবার সময় বলে ”শরীরে আর একবিন্দুও শক্তি নেই রে, নইলে এখন আমি একটা দারুণ চিৎকার করতুম।”
ফিরতি লিগে শোভাবাজারের যখন পঁচিশটা খেলায় চোদ্দো পয়েন্ট, তখন পড়ল যাত্রীর সামনে। লিগ তালিকায় যাত্রী তখন মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহামেডান আর এরিয়ান্সের পরে, বি এন আরের ঠিক উপরে। চ্যাম্পিয়ান হওয়ার কোনও আশা তো নেই—এটা শুধু ছিল মানরক্ষার খেলা।
হাফ টাইমে যাত্রীর মেম্বাররা কুৎসিত গালিগালাজ করতে করতে গুলোদার দিকে জুতো, ইট, কাঠের টুকরো ছুড়তে শুরু করে। তাদের চিৎকারের মধ্যে একটা গলা শোনা গেল, ”কমলকে কেন ছেড়ে দেওয়া হল?” খেলার ফল তখন ০—০।
এরপর গুলোদার এক পার্শ্বচর দ্রুত গ্যালারি থেকে নেমে গিয়ে শোভাবাজারের সম্পাদক কৃষ্ণ মাইতির সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে এল।
হাফ টাইমের পর মাঠে নামতে গিয়ে কমল অবাক হয়ে দেখল, যে সিধু এতক্ষণ দারুণ খেলে অন্তত তিনটি অবধারিত গোল বাঁচাল, তাকে বসিয়ে নতুন ছেলে ভরতকে গোলে নামানো হচ্ছে। খেলা শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই যাত্রীর লেফট হাফ প্রায় তিরিশ গজ থেকে একটি অতি সাধারণ শট গোলে নিল। কমল শিউরে উঠে দেখল, বলটা ধরতে ভরত সামনে এগিয়ে এসে হঠাৎ থমকে গেল, তার সামনেই ড্রপ পড়ে মাথা ডিঙ্গিয়ে বল গোলে ঢুকল। …মিনিট দশেক পর কমলের পায়ে আবার বল। যাত্রীর দুটো ফরোয়ার্ড দু’পাশ থেকে এসে পড়েছে। ওদের আড়াল করে কমল ফাঁকায় দাঁড়ানো রাইট ব্যাককে বলটা দিতেই ছেলেটি কিছু না দেখে এবং না ভেবে আবার কমলকেই বলটা ফিরিয়ে দিল। যাত্রীর লেফট ইন ছুটে এল বল ধরার জন্য। পরিস্থিতিটা এমনই দাঁড়াল যে, কর্নার করা অথবা গোলকিপারকে বলটা ঠেলে দেওয়া ছাড়া কমলের আর কোনও পথ নেই। সে গোলের দিকে বলটা ঠেলে দিয়ে দেখল, ভরত অযথা একটা লোকদেখানো ডাইভ দিল এবং বল তার আঙুলে লেগে গোলে ঢুকল। ০—২ গোলে শোভাবাজার হেরে গেল। গ্যালারির মধ্যেকার সরু পথটা দিয়ে যখন মাথা নিচু করে বেরাচ্ছে, উপর থেকে চিৎকার করে একজন বলল, ”কী রে কমল, যুগের যাত্রীকে কাপাবি না?”
তিনদিন পর ভরতকে আড়ালে ডেকে কমল জিজ্ঞাসা করেছিল, ”একরকম করলি কেন?”
ভরতের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তর্ক করার ব্যর্থ চেষ্টা করে অবশেষে স্বীকার করে, ”কেষ্টদা বলল, রেগুলার খেলতে চাস যদি তা হলে দুটো গোল আজ ছাড়তে হবে। রাজি থাকিস তো নামাব। আমি লোভ সামলাতে পারলুম না কমলদা। দু’বছর রিজার্ভেই কাটালুম, মাত্র চারটে পুরো ম্যাচ খেলেছি।” তারপরেই সে ঝুঁকে কমলের পা দু’হাতে চেপে ধরল। ”আমাকে মাপ করুন কমলদা, এমন কাজ আর করব না।” কমল তখন আপন মনে নিজেকে উদ্দেশ করেই বলে, ‘স্টপার, কোন দিকের আক্রমণ তুমি সামলাবে!”
পরের বছর যাত্রীর সঙ্গে লিগের প্রথম খেলায়, শুরু সাত মিনিটেই কমল পেনাল্টি বক্সের একগজ বাইরে নিরুপায় হয়ে একজনকে ল্যাং দিয়ে ফেলে দেয়। বাঁশি বাজাতে বাজাতে রেফারি রাধাকান্ত ঘোষ ছুটে এল পেনাল্টি স্পটের দিকে আঙুল দেখিয়ে।
