ওধার থেকে জবাব শোনার জন্য অপেক্ষা করে কমল বলল, ”যুগের যাত্রী টেন্টে? এখনি? হ্যাঁ, হ্যাঁ দশ মিনিটেই পৌঁছোচ্ছি।”
কমল রিসিভারটা ছুড়েই ক্রেডলের উপর ফেলল। তাঁবু থেকে দ্রুত বেরিয়ে বেড়ার দরজা পার হয়ে ময়দানের অন্ধকারে ঢোকার পর সে প্রায় ছুটতে শুরু করল যুগের যাত্রীর তাঁবুর দিকে।
.
।।দুই।।
গত পনেরো বছরে কমল দু’বার চাকরি, ছয় বার বাসা এবং ছয় বার ক্লাব বদল করেছে। শোভাবাজার স্পোর্টিং, ভবানীপুর, এরিয়ান, যুগের যাত্রী, মোহনবাগান এবং আবার যুগের যাত্রী হয়ে এখন শোভাবাজারে আছে। এই সময়ে সে দর্জিপাড়া, আহিরিটোলা, শ্যামপুকুর, কুমারটুলি, আবার শ্যামপুকুর হয়ে এখন বাগবাজারে বাসা নিয়েছে। ক্লাবের জন্ম শোভাবাজারে এবং নাম শোভাবাজার স্পোর্টিং হলেও তার কোনও অস্তিত্ব জন্মস্থানে এখন আর নেই, যেমন কমলের জন্ম ফরিদপুরে হলেও, তিন বছর বয়স সেখান থেকে চলে আসার পর আর সে দেশের মুখ দেখেনি। শোভাবাজার স্পোর্টিং এখন ময়দানের তাঁবুতে আর বেলেঘাটায় কেষ্টদার অর্থাৎ কৃষ্ণপ্রসাদ মাইতির বাড়িতেই বিদ্যমান।
কমল যুগের যাত্রীর তাঁবুতে শেষ বার পা দিয়েছিল সাত বছর আগে। মোহনবাগান থেকে যাত্রীতে আসার জন্য ট্রান্সফার ফর্মে সে সই করে এক হাজার টাকা আগাম নিয়ে। কথা ছিল পাঁচ হাজার টাকা যাত্রী তাকে দেবে।
বছর শেষে সে মোট পায় চার হাজার টাকা। দিল্লিতে ডুরান্ডে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে আসার পরই সে গুলোদার কাছে বাকি টাকাটা চায়। যুগের যাত্রীর সব থেকে ক্ষমতাশালী গুলোদা অর্থাৎ ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রতাপ ভাদুড়ি। সকালে প্র্যাকটিসের পর প্লেয়াররা কী খাবে, কোন ম্যাচে কোন প্লেয়ার খেলবে, কোন প্লেয়ারকে যাত্রীতে নেওয়া হবে, এবং কত টাকায়, এসব স্থির করা ছাড়াও গুলোদা এবং তার উপদলের নির্দেশেই নির্বাচিত হয় ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক, ফুটবল সম্পাদক, এমনকী প্রেসিডেন্টও। ফুটবল চ্যারিটি ম্যাচের বা ক্রিকেট টেস্ট ম্যাচের টিকিট গুলোদার হাতেই প্রথমে আসে, তারপর মেম্বারদের বিক্রি করা হয়। আই এফ এ এবং সি এ বি—র তিন—চারটি সাব কমিটিতে গুলোদা আছে। একটি ছোট্ট প্রেসের মালিক গুলোদা গত বছরে দুটি বাড়ি করেছে ভবানীপুরে ও কসবায়।
গুলোদা নম্রস্বরে বিনীতে ভঙ্গিতে কথা বলে।
”সে কী, তুই টাকা পাসনি এখনও!” গুলোদার বিস্ময়ে কমল অভিভূত হয়ে যায়।
”ছি ছি, অন্যায়, খুব অন্যায়। আমি এখুনি তপেনকে বলছি।”
গুলোদা অ্যাকাউন্ট্যান্ট তপেন রায়কে ডেকে পাঠাল। সে আসতেই ঈষৎ রুষ্টস্বরে বলল, ”একী, কমলের টাকা পাওনা আছে যে? না না, যত শিগগিরি পারো দিয়ে দাও, কমল আমাদের ডিফেন্সের মুল খুঁটি, ওকে কমজোরি করলে যাত্রী শক্ত হয়ে দাঁড়াবে কী করে!”
কমল সতর্ক হয়ে বলে, ”গুলোদা, টাকাটা রোভার্সে যাবার আগেই পাচ্ছি তো?”
”তুই ভাই তপেনের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করে নে।” বলতে বলতে গুলোদা ফোন তুলে ডায়াল করতে শুরু করে দেয়।
তপেন তিন দিন ঘুরিয়ে টাকা দেয়নি। কমলও রোভার্সে যায়নি। ফুটবল সেক্রেটারির কাছে খবর পাঠায়, হাঁটুর ব্যথাটা বেড়েছে। তাই শুনে গুলোদা শুধু বলেছিল, ”বটে।”
পরের মরশুমের জন্য ফুটবল ট্রান্সফার শুরু হবার আগে গুলোদা ডেকে পাঠায় কমলকে। ও আসা মাত্র ড্রয়ার থেকে একশো টাকার দশটি নোট বার করে একগাল হেসে গুলোদা বলে,”গুনে নে। তোরা যদি রাগ করিস, তা হলে যাত্রী চলবে কী করে বলতে পারিস? না না কমল, ছেলেমানুষি করা তোর পক্ষে শোভা পায় না। দশ বছরের ওপর তুই ফার্স্ট ডিভিশনে খেলছিস। ইন্ডিয়া কালার, বেঙ্গল কালার পরেছিস। চ্যাংড়া ফুটবলারদের মতো তুইও যদি টাকা নিয়ে…না না, তোকে দেখেই তো ওরা শিখবে, ক্লাবকে ভালবাসবে। ইউ মাস্ট বি ডিগনিফায়েড। এবার ভাল করে গুছিয়ে টিম কর। কাকে কাকে নিতে হবে সে সম্পর্কে ভেবেছিস?”
গুলোদা সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে বসতে ইশারা করল। কমল হাতের নোটগুলো প্যান্টের পকেটে রেখে চেয়ারে বসতেই গুলোদা আবার শুরু করে, ”প্লেয়ার কোথায়? একটু আগে দেবু টাকা চাইতে এসেছিল। বললুম, টাকা তো দেব, কাগজ পেনসিল নিয়ে বসে একবার হিসেব কর, ক’মিনিট খেলেছিস, কত গজ দৌড়েছিস, ক’টা ভুল পাশ দিয়েছিস, ক’টা বল রিসিভ করতে পারিসনি, ক’টা ওপেন নেট পেয়ে বাইরে মেরেছিস। … মেম্বাররা লিগ চায়, শিল্ড চায়, আরে বাবা, যে ক’টা প্লেয়ার, সবই তো মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল নিয়ে বসে আছে। প্লেয়ার না হলে ট্রফি আনবে কে! একা কমল গুহ যা খেলে তার সিকিও যদি দুটো ব্যাক খেলতে পারত, তা হলে ইন্ডিয়ার সব ট্রফি আমরা পেতাম। ক্লাস—ক্লাস, ক্লাসের তফাত। তোর ক্লাসের প্লেয়ার কলকাতা মাঠে এখন ক’টা আছে আঙুলে গুনে বলা যায়। তুই কিন্তু ট্রান্সফারের প্রথম দিনেই উইথড্র করবি।”
কমল বলতে শুরু করে, ”কিন্তু টাকার কথাটা তো…”
”আহ, ওসব নিয়ে তোর সঙ্গে কি দর কষাকষি করতে হবে। গত বছর যা পেয়েছিস এবারও তাই পাবি।”
কমল ট্রান্সফারের প্রথম দিনেই ওল্ড ফ্রেন্ডসে সই করেই উইথড্র করে। লিগে সাতটি ম্যাচে তাকে ড্রেস করিয়ে সাইড লাইনের ধারে বসিয়ে রাখা হয়। অষ্টম ম্যাচ স্পোর্টিং ইউনিয়নের সঙ্গে পাঁচ গোলে এগিয়ে থাকা অবস্থায় খেলা শেষের দশ মিনিট আগে কোচ বিভাস সেন এসে বলে, ”কমল নামতে হবে, ওয়ারম আপ করো।”
