”আপনার ছেলেমেয়ে ক’টি?”
কমল গুহর মুখের উপর দিয়ে ক্ষণেকের জন্য বেদনা ও হতাশার মেঘ ভেসে চলে গেল। ”একটি মাত্র ছেলে। বয়স সতেরো, প্রি—ইউ পড়ে। আমার বিয়ে হয়েছিল খুবই অল্প বয়সে।”
”কোথায় খেলে এখন?”
”কোথাও না। জীবনে কোনওদিন ফুটবলে পা দেয়নি। হি হেটস ফুটবল। এমনকী খেলা পর্যন্ত দেখে না। আমার খেলাও দেখেনি কখনও। ভাবতে খুব অবাকই লাগে, তাই নয়?”
”আপনার স্ত্রীর ইন্টারেস্ট নেই আপনার খেলা সম্পর্কে?”
কমল গুহ মাথা নাড়ল ক্লান্ত ভঙ্গিতে। ”নেই নয়, ছিল না। দশ বছর আগে মারা গেছে, আমার খেলার জীবনের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারেনি একদিনও। অমিতাভ তার মা’র কাছ থেকেই ফুটবলকে ঘৃণা করতে শিখেছে। পলিটিক্সের কথা বলে, তাই নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক করে, গান গায়, কবিতা লেখার চেষ্টা করে, কিন্তু ফুটবল সম্পর্কে একদিনও একটি কথা বলেনি।”
”স্ট্রেঞ্জ।” সাংবাদিক তারপর নোটবইয়ে লিখল, ‘স্যাড লাইফ’।
কমল গুহ আনমনা হয়ে স্থির চোখে বহুদূরে এসপ্ল্যানেডের একটা নিওন বিজ্ঞাপনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সাংবাদিক অপেক্ষা করতে লাগল। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। যেসব ফুটবলার খালি গায়ে শুয়ে—বসে ছিল, তারা স্নান সেরে ফিটফাট হয়ে এখন পাঁউরুটি আর মাংসের স্টু খাওয়ায় ব্যস্ত। তাঁবুর মধ্য থেকে ভেসে আসা টুকরো টুকরো কথা শোনা যাচ্ছে।
”কালীঘাটের খেলার রেজাল্ট কী হল রে…”
”চলে না দাদা, চলে না, ওসব প্লেয়ার কলকাতা মাঠে সাতদিন খেলবে। বৃষ্টি নামুক, দেখবেন তখন কীরকম মাল ছড়াবে…”
”একশো টাকা হারব যদি কখনও নিমু হেড করে গোল দেয়…”
”আমাদের নেক্সট ম্যাচ কার সঙ্গে রে…”
”তুই বলটা শ্রীধরকে না দিয়ে গোপালকে চিপ করলি কেন, এয়ারে নায়িমের সঙ্গে কি ও পারে?”
”আপনার আর কি প্রশ্ন আছে?”
সাংবাদিক ইতস্তত করে বলল, ”বহু প্রশ্ন ছিল।”
”যেমন?” কমল গুহ নিরুৎসুক স্বরে জানতে চাইল।
”আপনি ফিফটি সিক্স ওলিম্পিকে যাবেন বলেই সবাই ধরে নিয়েছিল কিন্তু যেতে পারেননি। কী তার কারণ? আপনি চারবার সন্তাোষ ট্রফিতে খেলেছেন, রাশিয়ান টিমের সঙ্গে দুটো ম্যাচ খেলেছেন, ইন্ডিয়ার সেরা স্টপার হিসেবে আপনার নাম ছিল। অথচ কত আজেবাজে প্লেয়ার এশিয়ান গেমসে বা মারডেকায় খেলতে গেল আর আপনি একবারও ইন্ডিয়ার বাইরে যেতে পারেননি, কেন?”
”আর কী প্রশ্ন?”
কমল গুহর নিরুৎসুক স্বর একটুও বদলায়নি। সাংবাদিক তাইতে গম্ভীর হয়ে ওঠা উচিত মনে করল। ”কলকাতার মাঠে আপনাদের মতো ফুটবলার আর পাওয়া যাচ্ছে না, তার কারণ কী? নব্বুই মিনিটের ফুটবল আমাদের পক্ষে খেলা সম্ভব কি না? ফুটবল সিজন শীতকালে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলে খেলা আরও ভাল হবে কি না…।”
সাংবাদিক থেমে গেল। তাঁবুর মধ্যে ফোন বাজছিল। একজন চিৎকার করে ডাকল, ”কমলদা, আপনার ফোন।”
কমল গুহ চেঁচিয়ে তাকে বলল, ”আসছি, এক মিনিট ধরতে বল।”
তারপর দ্রুত সাংবাদিককে বলল, ”আপনার প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে অনেকক্ষণ সময় লাগবে, আপনি বরং আর একদিন আসুন।”
”যদি আপনার বাড়িতে যাই?”
তাঁবুর দিকে যেতে যেতে কমল গুহ বলল, ”তাও পারেন। ছুটির দিনে আসবেন। সকালে।”
সাংবাদিক তার নোটবইটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে কিছু একটা হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করল এবং গভীর বিরক্তিতে ভ্রু কুঞ্চিত অবস্থায় শোভাবাজার স্পোর্টিয়ের বেড়ার দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে একবার পিছু ফিরে তাকাল। তাঁবুর একটা জানলার মধ্যে দিয়ে কমল গুহকে দেখা যাচ্ছে, ঘাড় নিচু করে ফোনে কথা বলছে।
”অরু! অরুণা? কী ব্যাপার, হঠাৎ যে…অ্যাঁ! পল্টুদা পড়ে গেছেন? ব্লাডপ্রেশার আবার…ডাক্তার কী বলেন!… দেখানো হয়নি! হ্যাঁ হ্যাঁ যাচ্ছি, এখুনি রওনা হচ্ছি। টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে, তুমি ডাক্তার আনো।” ফোন রেখে কমল ঘরের একমাত্র লোক শোভাবাজারের সহ সম্পাদক অবনী মণ্ডলকে বলল, ”কিছু টাকা এখুনি চাই, শ’খানেক অন্তত।”
”অ্যাক—শো! এখন কোথায় পাব?”
”যেখান থেকে হোক, যেভাবে হোক এখনি।”
”চাই বললেই এখন কোথায় পাই, শোভাবাজারের ক্যাশে কত টাকা তা তো আপনাকে বলার দরকার নেই।”
কমল একটা অসহায় রাগে আচ্ছন্ন হয়ে কথা বলতে পারল না কিছুক্ষণ। অবনী যা বলল তা সত্যি। কিন্তু এখনি টাকাও চাই। এই তাঁবুতে যারা গল্প করছে বা তাস খেলছে তারা কেউ একশো টাকা পকেটে নিয়ে ঘোরে না।
”পল্টুদার স্ট্রোক হয়েছে, এই নিয়ে তিনবার। ওর বড় মেয়েই ফোন করেছে। কিন্তু কী করে এই মুহূর্তে টাকা পাওয়া যায় বলুন তো? বাড়িতে আছে কিন্তু এখন বাগবাজারে গিয়ে আবার নাকতলায় যেতে গেলে দেরি হয়ে যাবে।”
”তাই তো, গড়ের মাঠে এই সময় একশো টাকা—” অবনী মণ্ডলের চিন্তিত গলা থেমে গেল। কমল ফোনটা তুলে দ্রুত ডায়াল করছে।
”রথীন মজুমদার আছে? আমি কমল, কমল গুহ শোভাবাজার টেস্ট থেকে বলছি। খুব দরকার…হ্যাঁ ধরছি।”
মিনিট দুয়েক অধৈর্য প্রতীক্ষার পর ওদিকে থেকে সাড়া পেয়ে কমল বলল, ”কমল বলছি। সংক্ষেপে একশো টাকা চাওয়ার কারণটা জানিয়ে বলল, ”যদি পারিস তো দে, চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব তোর কাছে। অনেক তো করেছিস আমার জন্যে, এটাও কর। গুরুদক্ষিণা তো জীবনে দেওয়া হল না, চিকিৎসাটুকুও যদি করতে পারি। কালই অফিসে নিশ্চয়ই টাকাটা দিয়ে দেব।”
