সাংবাদিক টুক করে তার নোটবইয়ে ‘হামবাগ’ কথাটা লিখে প্রশ্ন করল, ”আপনার লাস্ট ম্যাচ কোনটা যেটা খেলে রিটায়ার করেন?”
”রিটায়ার, আমি? লাস্ট ইয়ারেও দুটো ম্যাচ খেলেছি হাফ টাইমের পর। দরকার হলে এ বছরও খেলব। সলিলটা আজ হাঁটুতে চোট পেয়েছে, সারতে মাসখানেক লাগবে। হয়তো আমাকে নামতে হতে পারে। স্টপারে খেলা, ছোট একটা জায়গা নিয়ে, খুব একটা অসুবিধে হয় না।”
”স্ট্যানলি ম্যাথুজ তো প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত ফার্স্ট ডিভিশন ফুটবল খেলে গেছেন। ইংল্যান্ডের হয়েই তো খেলেছেন তেইশ বছর।”
”মহাপুরুষ ওঁরা। তাও উইং ফরোয়ার্ডে। অত বয়সে ওই পজিশনে খেলা ভাবতে পারি না। আমি প্রথম যখন ফার্স্ট ডিভিশনে শুরু করি, রাইট ইনে খেলতাম।”
”কোন ক্লাবে?”
”এখানে শোভাবাজার স্পোর্টিংয়েই প্রথম দু’বছর, তারপর ভবানীপুর, দু’বছর পর এরিয়ানে, যেখানে এক বছর কাটিয়ে যুগের যাত্রীতে চার বছর, মোহনবাগানে এক বছর,আবার যুগের যাত্রীতে দু’বছর, তারপর আবার শোভাবাজারে। টু ব্যাক সিস্টেমে খেলা শুরু করে, থ্রি ব্যাক পার করে, ফোর ব্যাকে পৌঁছে গেছি। রাইট ইন থেকে পল্টুদা আমাকে স্টপারে আনেন।”
”কে পল্টুদা?” সাংবাদিক বল—পেন উঁচিয়ে প্রশ্ন করল।
”চিনবেন না আপনি। পল্টু মুখার্জি, আমার গুরু। থার্টি ফাইভে উনি খেলা ছেড়েছেন। দুখিরাম বাবুর হাতে তৈরি, খেলতেনও এরিয়ানে। ওঁর আড্ডা ছিল এই শোভাবাজার টেন্টে তাস খেলার। জুয়া, রেস, নেশাভাঙ করে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। কিন্তু তৈরি করেছেন অনেক ফুটবলার। ফুটবলের যতটুকু শিখেছি বা যতটুকু খ্যাতি পেয়েছি সবই ওঁর জন্য। গুরুর ঋণ আমি কোনওদিনই শুধতে পারব না। বলতে গেলে, রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আমাকে মানুষ করেছেন। কতদিন ওর বাড়িতেই খেয়েছি, থেকেছি। উনিই আমাকে ম্যাট্রিক পাশ করিয়েছেন।”
কমল গুহ হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে জামা খুলতে শুরু করল। সাংবাদিক অবাক হয়ে থাকার মধ্যেই চট করে নোটবইয়ে লিখে ফেলল, ‘গুরুবাদী’।
জামাটা গলা পর্যন্ত তুলে কমল গুহ পিছন ফিরে বলল,”দেখছেন ঘাড়ের নীচে শিরদাঁড়ার কাছে?”
একটা বহু পুরনো, প্রায় দু’ইঞ্চি দাগ দেখতে পেল সাংবাদিক। ”হ্যাঁ, বুটের দাগ।”
”বুটের নয়, কাঁসার বগিথালা দিয়ে পিটিয়েছিলেন।”
”থালা দিয়ে!”
কথাটা কে বলল দেখার জন্য সাংবাদিক পিছন ফিরে তাকাতেই তার শরীর সিরসিরিয়ে উঠল। একটা বনমানুষ যেন জামা প্যান্ট করে দাঁড়িয়ে। নিকষ কালো রং, ভুরুর এক ইঞ্চি উপর থেকে শুরু মাথার চুল, চোখ দুটো কুতকুতে গর্তে ঢোকানো। নীচের ঠোঁট এত পুরু যে ঝুলে পড়েছে।
কমল গুহ সামনে ফিরে, দু’হাতে মাথার চুলগুলোকে দুধারে টেনে বলল, ”এখানে আছে একটা খড়ম পরতেন তারই প্রমাণ রেখে দিয়েছেন।”
”এইভাবে মার খেয়েছেন, কই, কখনও তো বলেননি!” ছেলেটির মুখ দেখে বোঝা যায় না তার মনে ভয় বা শ্রদ্ধার উদয় হয়েছে! কপাল থেকে চিবুক পর্যন্ত মুখের জমি প্রায় সমান। যেন ভূমিষ্ঠ হবার সময়ই মুখে প্রচণ্ড থাবড়া খেয়েছে। কণ্ঠস্বর ওর মনের ভাব প্রকাশ করে।
”খেলা শেখার মাশুল; দস্তুর মতো মার খেয়ে শিখেছি। থালাটা পিঠে পড়েছিল আমাকে সিনেমা হল থেকে বেরোতে দেখে, খড়মটা মাথায় পড়ে টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট দেখে।” বলতে বলতে কমল গুহর গলার স্বর ভারী হয়ে এল। চিকচিক করে উঠল চোখের সাদা অংশ। ”গুরু হতে গেলে যা হয়, তাই ছিলেন। এখন এভাবে খেলা শেখার কথা ভাবাই যায় না। শট মারতেও শিখল না, বলে কত টাকা দেবেন? যদি বলো ট্রেনিংয়ে আসনি কেন, অমনি চোখ রাঙিয়ে বলবে, আমি কি ক্লাবের চাকর? ওই জন্য কিছু আর বলি না। পচা পচা, সব পচা। যে হতে চায় তাকে তাগিদ দিতে হয় না।”
কমল গুহ কথাগুলো বলল ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে। মুখ নামিয়ে ছেলেটি দাঁড়িয়ে।
”আজই ডাক্তারের কাছে যাবি। হাঁটু খুব বিশ্রী ব্যাপার, কোনওরকম গাফিলতি করবি না। বহু ভাল ফুটবলারকে শেষ করে দিয়েছে এই হাঁটু। ট্যাক্সিতে যা, টাকা আছে তো?”
ছেলেটি ঘাড় নাড়ল।
কমল গুহ সন্দিহান হয়ে বলল। কই টাকা দেখি?”
”ঠিক চলে যাবখন।” ছেলেটি ব্যস্ত হয়ে বলল। কমল গুহ পকেট থেকে একটা পাঁচটাকার নোট বার করে এগিয়ে ধরল।
”না, না বাসেই চলে যেতে পারব।”
”যা বলছি তাই কর।”
ছেলেটিই শুধু নয়, সাংবাদিকও সেই গম্ভীর আদেশ শুনে কুঁকড়ে গেল। নোটটা নিয়ে ছেলেটি কমল গুহকে প্রণাম করল। কমল গুহ আলতো হাত রাখল পিঠে, তারপর ও চলে গেল বাঁ পা টেনে টেনে।
”ছেলেটা সিরিয়াস। গুড মেটিরিয়াল। পড়াশুনা হয়নি, বুদ্ধি কম, কিন্তু খাঁটি সোলজার। যা হুকুম হবে তাই পালন করবে। প্রাণ দিতে বললে দেবে। এমন প্লেয়ারও দরকার হয়। দেখি কতখানি তৈরি করা যায়।” কমল গুহর স্বর এই প্রথম কোমল শোনা গেল।
”আপনি কি ওর কোচ?” সাংবাদিক বলপেন বাগিয়ে ধরল।
”কোচ? ওহ না ক্লাবে এন আই এস থেকে পাশ করা কোচ একজন আছে। তবে সলিলকে আমি নিজের হাতে গড়ছি। বস্তিতে থাকে, ন’টা ভাই বোন, যতটুকু পারি সাহায্য করি। বেঁচে থাকার লোভ তো সকলের মধ্যেই আছে, কিন্তু একটা সময় আসে যখন মানুষকে মরতেই হয়। তখন সে বেঁচে থাকে বংশধরের মধ্য দিয়ে। ফুটবলারকেও একসময় মাঠ ছাড়তে হয়। কিন্তু সে বাঁচতে পারে ফুটবলার তৈরি করে। সলিলই আমার বংশধর।”
