”আমার! আমি তো—”
”কমলবাবু পাঠিয়ে দিলেন।”
সাংবাদিক হাত বাড়িয়ে পিরিচটা ধরল, আর চা খেতে খেতে মনের মধ্যে গুছিয়ে নিতে লাগল গত দু’দিন ধরে তৈরি করে রাখা প্রশ্নগুলো।
”তোকে পইপই বললাম, ডানদিকটা চেপে থাক, তবু ভেতরে চলে আসছিলিস।”
”আমি কী করব, শম্ভুটা বার বার বলছে—রাখতে পাচ্ছি না, রাখতে পাচ্ছি না, বলাই একটু এধারে এসে আগলা। সাইড আর মিডল দুটো ম্যানেজ করব কী করে?”
”সলিলটা যদি চোট না পেত! ভালই খেলছিল। সুকল্যাণের ওই শট গোললাইনে বুক দিয়ে আটকানো, বাপস। আমি তো ভাবলাম বুকটা ফেটে গেল বুঝি।”
”সলিলের লেগেছে কেমন?”
”কে জানে, কমলদা তো ভেতরে নিয়ে গিয়ে কী সব ওষুধ টষুধ দিচ্ছে।”
”পুষ্যিপুত্তুর কিনা, তাই ওর বেলা ওষুধ আর আমাদের বেলা বরফ ঘষো।”
”ট্যালেন্ট। ওর মধ্যে ট্যালেন্ট আছে আর আমাদের মধ্যে গোবর। যাকগে, ছোটমুখে বড় কথা বলে লাভ নেই; বলাই, মনে থাকে যেন কাল ঠিক সাড়ে পাঁচটায় বসুশ্রীর গেটে।”
”এখনও তোর কাছে চার আনা পাই।”
”কীসের চার আনা?”
”ভুলে মেরে দিচ্ছ বাবা, ‘দিলকো—দেখো’—র টিকিট কাটার সময় ধার নিয়েছিলি না?”
”উঃ, কবেকার কথা ঠিক মনে রেখে দিয়েছিস তো। চার আনা আবার পয়সা নাকি!”
সাংবাদিক কান খাড়া করে ওদের কথা শুনছে। ডিগডিগে লম্বা যে ছেলেটি এতক্ষণ চিত হয়ে দু’হাতে চোখ ঢেকে শুয়েছিল, অস্ফুট একটা শব্দ করে হাত নামিয়ে তাকাতেই সাংবাদিকের সঙ্গে চোখাচোখি হল।
”রেজাল্ট?” সাংবাদিক চাপা গলায় জানতে চাইল।
”পাঁচ।”
সাংবাদিক সমবেদনা জানাতে চোখ মুখে যথাসম্ভব দুঃখের ভাব ফুটিয়ে তুলল। ছেলেটি শুকনো হেসে বলল, ”ডজন দিতে পারত, দেয়নি।”
”সিজনের প্রথম খেলা এটা?”
ছেলেটি ঘাড় নেড়ে উঠে বসল। ঢোঁক গিলল, শুকনো ঠোঁট চাটল, জিরজিরে বুক। কাঁধে উঁচু হয়ে রয়েছে হাড়। কোমর থেকে পাতা পর্যন্ত পা দুটো সমান। পেশির ওঠানামা কোথাও ঘটেনি। সাংবাদিকের মনে হল ছেলেটিকে গোল পোস্টের মাঝখানে ছাড়া মাঠের আর কোথাও ভাবা যায় না।
”সরি, অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলাম। চা দিয়ে গেছে তো?”
একটা চেয়ার টানতে টানতে কমল গুহ সাংবাদিকের পাশে এনে রাখল।
”আর এক কাপ হোক।”
”না, না, আমি বেশি চা খাই না।”
”ভাল। বেশি চা খেলে স্বাস্থ্য থাকে না। গত পঁচিশ বছরে আমি ক’কাপ চা খেয়েছি বলে দিতে পারি। ফুটবলারের সব থেকে আগে দেখা উচিত নিজের শরীরটাকে। নয়তো বেশিদিন খেলা সম্ভব নয়। ফার্স্ট ডিভিশনেই কুড়ি বছর, হ্যাঁ, প্রায় কুড়ি বছরই খেলছি।”
সাংবাদিক ইতিমধ্যে তার নোটবই খুলে বল পেনের আঁচড়ে দু’চার কথা লিখে ফেলেছে।
”আপনার বয়স কত এখন?”
”আপনিই বলুন।”
”কুড়ি বছর যদি ফার্স্ট ডিভিশনে হয় তা হলে অন্তত চল্লিশ।”
কমলের চোখে আশাভঙ্গের ছাপ ফুটে উঠল। ”আপনি আমার কেরিয়ার থেকে হিসেব করে বললেন। কিন্তু আমায় দেখে বলুন তো বয়স কত?”
ভ্রূ কুঁচকে সাংবাদিক বোর্ডে দুরূহ কোনও অঙ্কের দিকে তাকানো মেধাবী ছাত্রের মতো ওর দিকে তাকাল। চুলগুলো কোঁকড়া, মোটা, ছোট করে ছাঁটা। দু’কানের উপরে অনেক চুল পাকা। কপালে রেখা পড়েছে তিন—চারটি। সাংবাদিকের মনে পড়ল একটা বইয়ে পাতাজোড়া স্ট্যানলি ম্যাথুজের মুখের ছবি সে দেখেছিল। তলায় লেখা—’দি ফেস অফ থারটিফাইভ ইয়ারস অফ টেনশন ইন ফুটবল।’ ম্যাথুজের কপালে পাঁচটি রেখা; ঠোঁটের কোলে একটি, তার পরেই আর একটু বড় আকারের টানাপোড়েনে থরথর দুটি ঢেউ যেন আছড়ে পড়েছে। এরপর চোখের কোণ পর্যন্ত সারা গাল বেলাভূমির মতো কুঞ্চিত। কিন্তু কমল গুহর চোখ ম্যাথুজের মতন বিশ্রামপ্রত্যাশী অবসন্ন নয়। পাথরের মতো ঝকঝকে, কোটরের মধ্যে বসানো। অসন্তুষ্ট, বিক্ষুব্ধ এবং চ্যালেঞ্জ জানায়।
সাংবাদিক নোটবইটা কাত করে, কমল গুহর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায়ই পাতার কোনায় চট করে লিখল—রাগী ভোঁতা, সেন্টিমেন্টাল।
বেশি দুধ দেওয়া চায়ের মতন গায়ের রং কিংবা মেদহীন মধ্যমাকৃতি এই বাঙালি ফুটবলারের চেহারার মধ্যে সাংবাদিক কোনও বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেল না। গলার স্বর ঈষৎ ভারী ও কর্কশ। শুধু চোখে পড়ে হাঁটার সময় দেহটি বাহিত হয় শহিদ মিনারের মতো খাড়া মেরুদণ্ড দ্বারা। হাঁটার মধ্যে ব্যস্ততা নেই।
”আটাশ, বড়জোর তিরিশ।” সাংবাদিক ইতস্তত করে বলল।
আচমকা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল কমল গুহ। সাংবাদিকের অস্বস্তি দেখে হাসিটা আরও বেড়ে গেল। তাঁবুর সামনে দিয়ে দুটো ঘোড়সওয়ার পুলিশ ডিউটি সেরে ফিরছিল। তারা বাধ্য হল ঘোড়ার রাশ টেনে ফিরে তাকাতে।
”বড্ড কমালেন কিন্তু। আমার অফিসের বয়স কমানো আছে বটে, কিন্তু এতটা কমাতে সাহস হয়নি। কিছু মনে করবেন না, আপনার বয়স কত?”
সাংবাদিক গলা খাঁকারি দিয়ে খুব গম্ভীর হতে হতে বলল, ”পঁচিশ।”
কমল গুহ ভুরু নাচিয়ে বলল, ”আসুন মাঠটা দশ পাক দৌড়ে আসি।”
”তা কী করে সম্ভব!” সাংবাদিক প্রতিবাদ করল। ”একজন ফুটবলারের সঙ্গে আমি পারব কেন। আপনাকে যদি বলি এক পাতা লিখতে, পারবেন কি আমার মতন?”
কমল গুহ’র মুখ থেকে মজার ভাবটা আস্তে আস্তে উবে গেল।
”ঠিক। বলেছেন ঠিকই। আমি পারব না এক পাতা লিখতে। কিন্তু আপনি আমার বয়স জানতে চাইলেন কেন? আমার শরীরের ক্ষমতা সম্পর্কে একটা ধারণা পাবার জন্যই তো? যদি বলি পঁচিশ তা হলে ভেবে নেবেন, অন্তত এগারো সেকেন্ডে আমি একশো মিটার দৌড়োতে পারি। যদি বলি চল্লিশ তা হলে সেটা পনেরো সেকেন্ড হয়ে যাবে। কিন্তু যদি আমরা দুজনে দৌড়োই এবং আপনাকে হারিয়ে দিই, তা হলে কি আমার বয়স পঁচিশ বছর বলে আপনি মেনে নেবেন না? সন তারিখ দিয়ে কি বয়স ঠিক করা যায়, শরীরের ক্ষমতাই হচ্ছে বয়স। বুঝলেন এখন আমার বয়স সাতাশ।”
