”জ্যোতিকে ভুলে গেছে বলছ কেন?” প্রভাতী স্বামীর দিকে তাকিয়ে তাঁর কোমল স্বরে দৃঢ়ভাবে বললেন, ”যতবার উষা বুড়ুমের দিকে তাকিয়েছে ততবারই জ্যোতিকে মনে পড়েছে। ভোলা কি এত সহজই?”
”বৌদি, কাল অনেকগুলো লোক আমার জন্য মরেছে। আমি সারারাত দগ্ধে মরেছি। আমি পালিয়ে এসেছি এখানে। আমি আর মাঠে ফিরতে পারব কিনা জানি না।” জ্যোতির গলায় গোঙানির মত আওয়াজ। ভয়ার্ত চোখে সে প্রভাতীর দিকে তাকিয়ে।
”ফিরতে পারবি না বলছিস কেন? নিশ্চয় পারবি। জীবনে কি মাঠ শুধু একটাই? সাতটা বছর একটা সহায়সম্বলহীন মেয়ে লড়ে গেছে, এখনো যাচ্ছে। তোর ফুটবল মাঠের লড়াইয়ের থেকে এটা কম কিসে? দাঁড়া, তোর কোচকে এবার ধরে আনি।”
অরবিন্দ মোড়া থেকে উঠে বাড়ির ভিতরে গেলেন। জ্যোতি উবু হয়ে বসেছিল দালানে। এখন দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ চেপে রইল। প্রভাতী তার কাজের স্ত্রীলোকটিকে ডেকে রান্নার নির্দেশ দিতে লাগলেন।
পরিষ্কার ধুতি—পাঞ্জাবি পরে অরবিন্দ ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন। প্রভাতী মুখ তুলে তাকিয়ে অবাক স্বরে বললেন, ”কোথায় চললে এখন?”
”হেলথ সেণ্টারে।” বলতে বলতে অরবিন্দ দালানের সিঁড়ি দিয়ে উঠোনে নেমেছেন তখন প্রভাতী ডাকল।
”কি বলবে ওকে?”
”বলব আর কি, এখন তো বোঝাব। মানুষ ভুল করে, ভুলের খেসারতও দেয়। জ্যোতিকে তুমি মাপ করে দাও, সে অনুতপ্ত, সে—।”
”না।” প্রভাতীর গলায় যে পাথরের মত এমন কাঠিন্য আছে অরবিন্দও তা জানতেন না। তিনি হতভম্বের মত ফিরে তাকিয়ে রইলেন।
”আমাদের নাতিকে নিয়ে বৌমা যেন এখনি তার শাশুড়ীর কাছে চলে আসে, এখুনি। আমাদের ছেলেকে কষ্ট দেবার অধিকার তার আছে কিনা সেটা আমি দেখতে চাই। আমি পঙ্গু বটে কিন্তু মরে যাইনি। বলে দিও আমি তার জন্য অপেক্ষা করছি। সে সাত বছর লড়েছে, আমি কত বছর?”
জিজ্ঞাসু চোখে প্রভাতী নির্নিমেষে তাকিয়ে রইলেন স্বামীর দিকে। অরবিন্দর মুখের উপর দিয়ে ভেসে গেল মমতা, ভালবাসা, বন্ধুত্ব আর শ্রদ্ধার ছায়া। কি একটা কথা বলতে গিয়েও বললেন না। শুধু জ্যোতির দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে প্রভাতীকে দেখালেন আর বললেন, ”জীবনটা কি বিশাল দেখেছিস!”
অরবিন্দ বেরিয়ে যাচ্ছেন, সেই সময় জ্যোতি প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ার মত প্রভাতীর কোলে মুখ গুঁজে, দু’হাতে পা জড়িয়ে ধরল। তারপর বহুদিনের জমানো কান্না বার করে দিতে শুরু করল। প্রভাতীর হাত এসে পড়ল জ্যোতির মাথায়। অস্ফুটে তিনি বললেন, ”পুরুষমানুষদের কিছু কিছু ভুল করতে দিতে হয়।”
প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর। ইজিচেয়ারে পিছনদিকে মাথা হেলিয়ে প্রভাতী আকাশের দিকে তাকিয়ে। তাঁর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে জ্যোতি। গভীর শ্বাস—প্রশ্বাসে ফুলে উঠছে তার পিঠ।
হাল্কা শব্দ হল ফটক খোলার। প্রভাতী মাথা নামিয়ে তাকালেন। ফটকে দাঁড়িয়ে উষা। তিনি স্মিত চোখে হাসলেন। কুণ্ঠিত পায়ে উষা এগিয়ে আসতে আসতে আঁচলটা মাথায় তুলে দিল।
”শ্বশুর আর ছেলে কোথায়?” জ্যোতির ঘুম যাতে না ভাঙ্গে সেজন্য প্রভাতীর স্বর নিচু।
”এখানকার পুরুতমশায়ের বাড়িতে গেলেন বুড়ুমকে সঙ্গে নিয়ে।” প্রণাম করার জন্য উষা নীচু হয়ে হাত বাড়াতে গিয়ে দেখল প্রভাতীর পায়ের পাতা আঁকড়ে রয়েছে জ্যোতির হাত। হাতের উপর উষা হাত রাখল।
স্টপার
স্টপার – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস
।।এক।।
”এসে গেছেন! আচ্ছা এক মিনিট, আপনি বরং এখানেই বসুন।”
অনুরোধ নয়, যেন নির্দেশ। তরুণ সাংবাদিক ঢোঁক গিলে ঘাড় নাড়ল এবং নড়বড়ে লোহার চেয়ারটায় বসে সপ্রতিভ হবার জন্য রুমাল দিয়ে ঘাড় গলা মুছে, পায়ের উপর পা তুলে প্যাকেট থেকে সিগারেট বার করল, তারপর কী ভেবে সিগারেটটা আবার প্যাকেটে ভরে রাখল।
তার দশ গজ দূরেই ছড়িয়ে রয়েছে হাফপ্যান্ট পরা, কতকগুলো আদুড় দেহ। তারা ঘাসের উপর চিত হয়ে, উপুড় হয়ে বা পা ছড়িয়ে বসে। ঘাম শুকিয়ে এখন ওদের চামড়ার রং ঝামা ইটের মতো বিবর্ণ, খসখসে। সন্তর্পণে তারা শ্রান্ত হাত পা বা মাথা নাড়ছে। চোখের চাহনি ভাবলেশহীন এবং স্থির।
ওদের একজন গভীর মনোযোগে পায়ের গোছে বরফ ঘষছে; ধুতি পাঞ্জাবি পরা স্থূলকায় এক মাঝবয়সী লোক তার সামনে উবু হয়ে দু’বার কী বলল, মাথা নিচু করে ছেলেটি বরফ ঘষেই যাচ্ছে, জবাব দিল না।
উপুড় হয়ে দুই বাহুর মধ্যে মাথা গুঁজে এতক্ষণ শুয়েছিল যে ছেলেটি, সে হঠাৎ উঠে বসে কর্কশস্বরে চিৎকার করল, ”কেষ্ট, কতক্ষণ বলেছি জল দিয়ে যেতে।”
তাঁবুর পিছন দিক থেকে একটা চাপা গজগজানি এর জবাবে ভেসে এল।
তরুণ সাংবাদিক তাঁবুর ভিতরে তাকাল। তাঁবুর মাঝখানে সিমেন্টের একফালি চত্বর। পাতলা কাঠের পাল্লা দেওয়া স্প্রিং—এর দরজা দু’ধারে। দরজাগুলো ঝাপট দিচ্ছে ব্যস্ত মানুষের আনাগোনায়, চত্বরটার পিছনটা খোলা। সেখান দিয়ে পাশের তাঁবু এবং একটা টিউবওয়েল দেখা যাচ্ছে। একটা গোল স্টিলের টেবিল চত্বরের মাঝখানে, সেটা ঘিরে সাত—আটজন লোক বসে এবং গলা চড়িয়ে তারা তর্ক করছে। কয়েকটা চায়ের কাপ টেবিলে। একজন চোখ বুজে টোস্ট চিবোচ্ছে। পাখা ঘুরছে। বাইরে থেকে বোঝা যায় তাঁবুর ভিতরটায় ভ্যাপসা গুমোট।
”আপনার চা।”
সাংবাদিক চমকে তাকাল। গেঞ্জি পরা একটা ছেলে, হাতে ময়লা কাপ। দুটি বিস্কুট কোনওক্রমে কাপের কিনারে পিরিচে জায়গা করে রয়েছে।
