”আচ্ছা, ওর মার নাম কি?” আচমকা জ্যোতি বলল।
”কেন? মার নাম দিয়ে তোর কি দরকার?” অরবিন্দর চোখ সরু হয়ে গেল।
”আচ্ছা অরবিন্দদা, আপনার কাছে আমি প্রথম হাজির হয়েছিলাম যেদিন আপনার কি সেদিনের কথা মনে আছে?”
”সারথির টেণ্টে তো? তোকে ডেকে পাঠিয়ে এনে বলেছিলুম সামনের বছরই সারথিতে চলে এস। হ্যাঁ, মনে আছে। তুই বললি ভেবে দেখব।”
”না না, ওই দিনের কথা নয়। যেদিন সল্ট লেকে আপনার ফ্ল্যাটে প্রথম গিয়ে হাজির হই।”
”মনে আছে। তোকে কেমন যেন উদভ্রান্তের মত দেখাচ্ছিল। প্রথমেই বললি, সারথিতে আমি খেলব। আর আমি বাড়ি ফিরব না, আমায় কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দিন। শুনে আমার অবাকই লেগেছিল।”
”আজও আবার সেই আপনার কাছে এসেছি। পালিয়ে এসেছি। সেদিনও আপনার কাছে গেছলাম একজনের কাছ থেকে পালিয়ে। কেন জানি এই মুহূর্তে তার কথাই মনে পড়ছে। আমার এই পালানো ব্যাপারটা শেষ করা দরকার।”
বুড়ুম বাইক থেকে নামার চেষ্টা করছে। দেখতে পেয়ে জ্যোতি থালা রেখে উঠে দাঁড়াল। ”দাঁড়াও দাঁড়াও, বাইক আর তুমি দুজনেই পড়বে।”
জ্যোতি এগিয়ে গিয়ে বুড়ুমকে নামাবার সময় মৃদুস্বরে বলল, ”তুমি এটায় চড়ে ঘুরবে?”
ফ্যালফ্যাল করে বাচ্চচা ছেলেটির তাকিয়ে থাকা দেখতে দেখতে জ্যোতির বুকের মধ্যে কাঁপন ছুঁয়ে গেল। বুড়ুম যেন বিশ্বাস করতে পারছে না এমন সৌভাগ্য তার হবে! সে মাথাটা শুধু হেলাল।
”কোথায় যাবে বলো? মার কাছে?”
”হ্যাঁ।”
”মা কোথায় এখন?”
”কাজে গেছে। হেলথ সেণ্টারে।”
”মার নাম কি?”
”উষা।”
অরবিন্দ এবং প্রভাতী তাকিয়ে ছিলেন দুজনের দিকে। বাইকের পিছনে বুড়ুমকে বসিয়ে জ্যোতিকেও উঠে বসতে দেখে অরবিন্দ চেঁচিয়ে উঠলেন, ”অ্যাই অ্যাই, এখন আবার বুড়ুমকে নিয়ে কোথায় ঘুরতে বেরোচ্ছিস, পরে যাস।”
”ঘুরে আসছি অরবিন্দদা। বৌদি, নিজের জন্য শান্তি নিজেই যোগাড় করতে পারি কিনা সেটাই এবার দেখতে যাচ্ছি।”
বাইক স্টার্টের প্রচণ্ড গর্জনে বুড়ুম ভয় পেয়ে জ্যোতিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল।
.
।।চোদ্দ।।
দরজার পাশে ‘বহির্বিভাগ’ লেখা একটা টিনের পাতে। ময়লা নীল হ্যাণ্ডলুম পর্দাটা একটা ঠেঁটো লুঙ্গির মত দরজার সামনে দড়িতে ঝুলছে। ঘরের মধ্যে অনেক লোক। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে জ্যোতি। তার বাঁদিকে লম্বা একটা করিডোর, একধারে পর পর তিনটে দরজা। ভিতরে কয়েকটি খাটে রোগীদের সে দেখতে পাচ্ছে। বুড়ুম তার ডানদিকের পর্দা ঝোলানো ঘরটাতেই এখন ঢুকেছে।
”তুই! এখন? এখানে?…কি করে এলি?”
জ্যোতির মনে হল এই ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর তার চেনা। সে অস্বস্তি বোধ করল।
”কাজের সময়…কার সঙ্গে এসেছিস?”
বুড়ুমের জবাবটা জ্যোতি শুনতে পেল না। বোধ হয় ভয়ে সিঁটিয়ে গেছে। তার মনে হল, ভিতরে গিয়ে এখন বোধ হয় ওর মাকে বললে ভাল হয়—আমিই ওকে নিয়ে এসেছি, আবার সঙ্গে করে বাড়িতে পৌঁছে দেব।
”বাইকে চড়ে? কার বাইক, কে তিনি?…স্যার, আমি একটু দেখে আসছি। কি ঝঞ্ঝাট যে এই ছেলেকে নিয়ে হয়!”
পর্দা সরিয়ে উষা বেরিয়ে আসতেই জ্যোতির বুকে একটা ধাক্কা লাগল। ঊষা বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে। বুড়ুম মুখ তুলে দুজনের মুখভাব লক্ষ করছে।
”কি ব্যাপার!” উষা দ্রুত ধাতস্থ হয়ে গম্ভীর গলায় জানতে চাইল।
”অরবিন্দ মজুমদারের বাড়িতে এসেছি। উনি আমার গুরু, পিতৃতুল্য। সেখানেই বুড়ুমের সঙ্গে আলাপ। ওকে বাইকে চড়িয়ে একটু ঘোরাবার জন্য বেরিয়ে, এখানে এসে পড়লাম।” জ্যোতি কৈফিয়ৎ দেবার মত কথাগুলো বলেই হাত বাড়িয়ে বুড়ুমকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, ”মাকে দেখা হল তো, চলো এবার।”
জ্যোতি হাসার চেষ্টা করল। সাত বছর বয়স বেড়েছে উষার। কত বয়স এখন? চব্বিশ, পঁচিশ বড়জোর। মুখটি ভরাট হয়েছে। কাঁধ, গলা, হাত আগের থেকেও সুডৌল। কোমরে বেল্টের বাঁধন থেকে জানা যাচ্ছে ক্ষীণকটি। কিন্তু ওর চোখ দুটিতে প্রচুর বয়স জমা হয়েছে। দুই ঠোঁট কঠিন মনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বুড়ুমকে নিয়ে যাবার জন্য পা বাড়িয়েই জ্যোতি ঘুরে দাঁড়াল। উষার কাছে এসে প্রায় ফিসফিস করে বলল, ”বুড়ুম আমার ছেলে?” তারপরই সে এগিয়ে গিয়ে ছেলের হাত ধরে টানতে টানতে পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।
ভিতর থেকে জ্যোতি শুনতে পেল একটা ক্রুদ্ধ স্বর, ”যার—তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়া…চুপ করে এখানে বসে থাক।”
জ্যোতি ছুটে এসে তার বুলেটে চড়ে স্টার্ট দিল। অরবিন্দদার কাছে আবার তাকে সেইভাবে হাজির হতে হবে, সাত বছর আগে যেভাবে সে সল্টলেকের ফ্ল্যাটে হাজির হয়েছিল।
.
দুজনেই অবাক হয়ে শুনে গেলেন।
”এত ব্যাপার! কই, কখনো তো আমায় কিছু বলিস নি?” অরবিন্দ অনুযোগ নয়, তাঁর বিস্ময়কেই প্রকাশ করলেন।
”বলার মত ব্যাপার কি?”
”বলছ কি জ্যোতি, বুড়ুম তোমারই ছেলে? কি অদ্ভুত যে ব্যাপার, কি আশ্চর্য যোগাযোগ!” প্রভাতী অবাক হওয়ার শেষ প্রান্তে এসে গেছেন।
”অরবিন্দদা, আমি বিয়ে করব। এখানে, এখনি। আপনি ব্যবস্থা করে দিন। অনেক কিছুই তো আমার জন্য করেছেন, এটাও আপনাকে করতে হবে।”
”তুই তো চাস, কিন্তু উষা কি চায়? তোর কথা শুনে মনে হল ও তোকে মন থেকে মুছে ফেলেছে। সাত—সাতটা বছর যথেষ্ট সময় একটা লোককে ভুলতে, সাত মিনিটেও তো ভুলে যাওয়া যায়। এই সাত বছরে তোর জন্য ওর মনে কত যে ঘৃণা জমেছে!”
