”এটাকে বলে মোটরবাইক।” ছেলেটির কাঁধে হাত রেখে কথাটা বলে অরবিন্দ তাকাল জ্যোতির দিকে। ”আমাদের এখানে পৌঁছে দিয়ে ফিরে যাবার জন্য গাড়িতে উঠে দাশুই আমাকে বলেছিল। সারথি থেকে আমি যাতে বিদায় নিতে বাধ্য হই সেজন্যই ও এই কাজটা করেছে। ও জানত আমি আর কিছু সারথিকে দিতে পারব না। পরিবেশ, মানসিকতা সব কিছুই বদলে গেছে, আমি এখন মিসফিট। এখন এইসব ছেলেদের নিয়ে সাকসেস পেতে হলে অন্যভাবে খেলাতে হবে, অন্য ধরনের কোচ চাই। কিন্তু ক্লাবের বড় একটা গোষ্ঠী আমাকেই রাখতে চায়। এই কাণ্ডটা করিয়ে দাশু তাদের—” অরবিন্দ অর্থপূর্ণ হাসি হাসল।
”জ্যোতি ভেতরে এসো, অনেক দিন দেখি না তোমায়।” প্রভাতী আবার চেঁচিয়ে বললেন।
”যাই বৌদি।”
বাইক নিয়ে জ্যোতি ভিতরে ঢুকল। ধানের গোলার কাছে বাইকটা রেখে সে প্রভাতীর কাছে এগিয়ে এল। প্রণাম করে দালানের কিনারে বসল পা ঝুলিয়ে।
”পথ চিনে আসতে অসুবিধে হয়নি?” প্রভাতী হাসিমুখে জানতে চাইলেন।
”অরবিন্দদার কোচিংয়ে গোলের পথ যে চিনেছে তার পক্ষে রাজপুরের পথ চেনাটা কোন ব্যাপারই নয়।”
”নিশ্চয় ভোরে বেরিয়েছ, পেটে কিছুই এখনো পড়েনি।”
”সত্যিই খিদে পেয়েছে বৌদি।”
”আমি দেখছি।” অরবিন্দ ব্যস্ত হয়ে বললেন। ”জ্যোতি, মুড়ি খাবি নারকোল দিয়ে?”
”তার সঙ্গে খেজুরগুড় যদি থাকে!”
”গুড় নেই, বাতাসা আছে। মাছ ধরিয়ে তারপর ভাজা খাওয়াব। এখানে এর বেশি আর কিছু দিতে পারব না।”
”আমি এর বেশি আর চাইও না।”
ফটকের কাছে চার—পাঁচটি বাচ্চচা ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে কৌতূহলভরে বাইকটার দিকে তাকিয়ে। যে ছেলেটি অরবিন্দর কাছে জানতে চেয়েছিল ‘দাদু এটা কি?’, সে বাইকটার গায়ে হাত দিয়ে ভয়ে ভয়ে জ্যোতির দিকে তাকাল। প্রভাতী চেঁচিয়ে বললেন, ”হাত দিও না বুড়ুম, পড়ে যাবে।”
”দিক হাত, পড়বে না। অরবিন্দদাকে দাদু বলল, নাতি নাকি?”
প্রভাতী হাসলেন। ”এই পাশেই থাকে। হেলথ সেণ্টারে ওর মা কাজ করে। যখন ডিউটিতে যায় তখন এখানে ছেলেকে রেখে যায়।”
জ্যোতির মাথার মধ্যে হেলথ সেণ্টার শব্দ দুটো পুকুরে ঢিল ফেলার মত কাজ করল। স্মৃতির কিছু তরঙ্গ তাতে কেঁপে উঠল। জ্যোতি ছেলেটির দিকে আর একবার কেন যে মুখ ফিরিয়ে তাকাল তা সে নিজেই জানে না।
”জ্যোতি, তোমার খবর কি, খেলছ কেমন? আমরা তো এখানে খবরের কাগজ রাখি না তাই কিছু জানি না। রেডিও আছে, তাতেই যতটুকু খবর পাই।”
”আপনাদের অসুবিধা হয় না?”
”প্রথম প্রথম হত, এখন হয় না। এখানকার সবকিছুর সঙ্গে এখন আমরা মিলেমিশে গেছি। বড় শান্ত এই জায়গাটা। পাখির ডাক শুনতে পাই, বাতাসের শব্দও শোনা যায়। এমন কি গাছের পাতায় রোদ পড়ে রঙ বদলে গেলেও চোখে পড়ে। খুব শান্তিতে আমরা আছি।”
”এই শান্তি থেকে আমাকে একটু ভাগ দেবেন বৌদি?”
জ্যোতির গলার স্বরে কি যেন একটা শূন্যতা রয়েছে যেটা প্রভাতীর কানে ধরা পড়ল। বললেন, ”তোমার কি কিছু হয়েছে?”
”হয়েছে, সেটা ফুটবল আর ক্লাব সংক্রান্ত। এই পরিবেশ দূষিত হয়ে যাবে সেসব কথা বললে, তাই আর বলব না। শুধু এইটুকুই এখন বলব, আমি পালাতে চাই, বৌদি, এখন আমি মাঠ থেকে পালাতে চাই।”
”দিদা!” বুড়ুম কাছে এসে প্রভাতীকে বলল, ”আমি ওই গাড়িটার ওপর একবার উঠব?”
”ওটা আমার গাড়ি নয়, এনার। উঠতে হলে এনার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।”
বুড়ুম জ্যোতির দিকে তাকাল। পরস্পরের দিকে নীরবে চোখে চোখ রেখে দুজনে তাকিয়ে রইল। তখন জ্যোতির স্মৃতিতে আবার কয়েকটা ঢেউ কেঁপে উঠল। বুড়ুমের চোখের চাউনিতে খুব চেনা একটা ছায়া যেন ভেসে রয়েছে।
”তুমি বাইকে চড়বে?”
”হ্যাঁ।”
”চলো তোমায় বসিয়ে দি।”
জ্যোতি উঠে দাঁড়িয়ে বুড়ুমের হাত ধরে বাইকের কাছে গেল। দু হাতে ওকে তুলে সীটের উপর বসিয়ে দিয়ে হঠাৎই সে জিজ্ঞাসা করল, ”বাড়িতে তোমার কে আছেন?”
”মা।”
”আর?”
”গোপালের মা…আমি এই দুটো ধরব, তুমি যেভাবে ধরেছিলে।”
বুড়ুমের দুটো হাত হ্যাণ্ডেলের উপর বসিয়ে দিয়ে জ্যোতি আবার জিজ্ঞাসা করল, ”আর কে আছেন?”
বুড়ুম বিভ্রান্ত চোখে তাকাল জ্যোতির দিকে।
”আর কেউ তো নেই। দাদু তো মরে গেছে!”
”বাবা?”
”ওরে জ্যোতি, আয়।” অরবিন্দ ডাক দিলেন। দালানে দাঁড়িয়ে, হাতে একটা কাঁসার থালা। ”বুড়ুম, মুড়ি খাবি তো আয়।”
”না, খাব না।” বুড়ুম উত্তেজিত স্বরে চেঁচিয়ে উঠল।
জ্যোতি ফিরে এসে মুড়ির থালাটা নিয়ে দালানে বসে বলল, ”ছেলেটার বাবা নেই বুঝি?”
অরবিন্দ আর প্রভাতী মুখ—চাওয়াচাওয়ি করলেন। জ্যোতি সেটা লক্ষ্য করেই খাওয়ায় মন দিল।
”বাবা নিরুদ্দেশ। মা আর ছেলে, শুধু এই দুজনই।” প্রভাতী বললেন।
”তুই ক’দিন থাকবি তো?” অরবিন্দ জিজ্ঞাসা করেই জুড়ে দিলেন, ”একটু অসুবিধে হয়তো হবে, তবে ভালও লাগবে।”
জ্যোতি মুখ নীচু করে মুড়ি খেয়ে যাচ্ছে, জবাব দিল না। নিরুদ্দেশ শব্দটা তার মাথার মধ্যে গুনগুন করে যাচ্ছে।
”জানো, জ্যোতি বলল আমাদের শান্তি থেকে ওর একটু ভাগ চাই। কিন্তু ভাগ নিতে হলে তো ওকে এখানে এসে থাকতে হবে!”
”বাহ, আমরা এত কষ্ট করে, আমোদ—আহ্লাদ ছেড়ে, ভাল খাওয়া ভাল পরা সব ত্যাগ করে যা অর্জন করলুম, তাই থেকে ওকে ভাগ দেব কেন? জ্যোতি নিজের জন্য নিজেই যোগাড় করে নিক। কি রে, তাই তো হওয়া উচিত।” অরবিন্দ মিটমিট হাসছেন।
