”না, পারি না। জীবনটা যে কত বিশাল সে ধারণাই আমার নেই।”
”আমারও নেই, কিন্তু তাতে কি এসে যায়! যেমন যেমন জানছি তেমন তেমন করে চলি। তোর মত হতাশা আমারও এসেছিল। তাই আমি ভেতরে ভেতরে আলগা হয়ে গেছলুম, কোচিং করা আর আমার ভাল লাগত না। টিম হেরে গেলে আগে প্লেয়ারদের পাশে দাঁড়াতুম, সান্ত্বনা দিতুম, সহানুভূতি জানাতুম, ভুল ত্রুটি দেখিয়ে দিতুম। তুই নিজেও তো দেখেছিস আমায়। কিন্তু পরে বিরক্ত হয়ে মুখ দিয়ে যা—তা কথা বেরোত। এইসব গাধাদের পিটিয়ে ঘোড়া করা যায় না, এমন কথাও বলেছি। তাই তো আমার বিরুদ্ধে অনেকেই চটে যায়। তাদের অনেকের মন্তব্য কাগজেও বেরোয়।”
”হ্যাঁ জানি সেসব, পড়েছিও।”
”টানা সাফল্য ফুটবলে কখনো চিরকাল থাকে না। জীবনেও তেমন হয় না। তুই লক্ষ্য কর পৃথিবীর বড় বড় ক্লাবগুলোকে, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, কি রিয়্যাল মাদ্রিদ, ইণ্টার মিলান, টটেনহাম হস্পার কিংবা বেয়ার্ণ মিউনিখ। এরা এক এক সময় উঠেছে, পড়েছে, আবার উঠেছে। এই ওঠা—পড়ার পিছনে কতকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করেছে। কোচ, প্লেয়ার, ম্যানেজমেণ্ট, সাপোর্টার সব মিলিয়ে ক্লিক করে গেলেই ওঠা। সারথিও এই কারণে উঠেছিল। সাফল্যই আবার পতনের কারণগুলো তৈরি করল। এটা অবধারিত ছিল। আমি শুধু অপেক্ষা করছিলুম কবে, এটা আসবে। তারপর গত বছর থেকেই দেখলুম পতন শুরু হচ্ছে।”
”আমায় তো কখনো বলেননি!”
”ইচ্ছে করেই বলিনি। আমি চেয়েছিলুম তুই ঠেকে শেখ। ফুটবলার হিসেবে তোর যা দেবার তা তুই দিয়ে ফেলেছিস। এখন তুই দেখছিস কিছুই ফিরে পাসনি।”
জ্যোতি মাথা নাড়ল। ”না অরবিন্দদা, কিছুই পেলাম না।”
”কেন, টাকা পয়সা, নাম যশ? এগুলো কি কিছুই নয়?”
”অনেক কিছুই। কিন্তু—।” জ্যোতি থেমে গেল। অরবিন্দ মজুমদার তার কাঁধের উপর মুখ ঝুঁকিয়ে দিলেন।
”কিন্তুটা কি?”
”টাকা বা খ্যাতিটাই সব কিছু নয়।”
অরবিন্দর মুখে সকালের রোদের মত ছড়িয়ে পড়ল হাসি। জ্যোতির পিঠে চাপড় মেরে বললেন, ”তাহলে বললি কেন হেরে যাচ্ছি? টাকা আর খ্যাতির বাইরেও মস্ত একটা জীবন আছে, এটা তো এবার বুঝতে পারছিস। সেই জীবনে গিয়ে এবার খেল, জেতার চেষ্টা কর। জীবনে অনেক ট্রফি ছড়িয়ে রয়েছে, গুনে শেষ করতে পারবি না।”
”জানেন অরবিন্দদা, সেদিন বিপিনস্যারকে বড় মুখ করে বলেছিলাম, আমার খেলাই আমার সব কিছু, গোটা অস্তিত্ব। মানুষকে আনন্দ দেওয়াই আমার কাজ, তারও একটা গুরুত্ব সমাজে আছে। হাওয়াভরা ওই গোল জিনিসটাই আমার ভগবান। তখন জানতাম না কয়েক মাসের মধ্যেই আমার ভগবান চুপসে যাবেন। বড় বড় কথা আর চিন্তার সঙ্গে বাস্তবের যে কত পার্থক্য!”
”জ্যোতি, বাঁদিকে একতলা গোলাপি বাড়িটা হেলথ সেণ্টার, ওর উল্টোদিকেই ডানদিকের সরু রাস্তাটায় নামবি। ওই যে আমগাছগুলো, ওর পেছনেই আমার বাড়ি।”
কথামত জ্যোতি বাইকটা ডান দিকে ঘুরিয়ে রাস্তা থেকে নেমে কাঁচা পথ ধরল, আমবাগানের পাশ দিয়ে একতলা একটা বাড়ির সামনে এল। বাড়িটা খুবই পুরনো। দেয়ালে সম্প্রতি কিছু কিছু জায়গায় পলেস্তারা করা হয়েছে। ছাদে পাঁচিল নেই। বাইরের দিকে দুটো দরজা, তার সামনে টানা খোলা সিমেণ্টের দালান। তারপর নিচু পাঁচিল ঘেরা মাটির উঠোন যাতে একটা ভলিবল কোর্ট হতে পারে। উঠোনের ধারে ধানের গোলা, কাগজি লেবু, লঙ্কা, গাঁদা, জবা, স্থলপদ্ম ইত্যাদির গাছ। এক প্রৌঢ়া কাজের লোক উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে। রান্নার কাঠের জন্য একটি লোক কুড়ুল দিয়ে একটা গুঁড়ি ফাড়ছে। ছ’সাত বছরের একটি ছেলে কুড়ুল চালনা দেখছে একমনে।
দালানে ইজিচেয়ারে বসে প্রভাতী। মোটরবাইকের শব্দ শুনে কৌতূহলে মুখ তুলে রয়েছে। পাঁচিলের ফটকের সামনে জ্যোতি বাইক থামিয়ে ভিতরে তাকিয়ে বলল, ”বৌদি কেমন আছেন, অরবিন্দদা?”
”একই রকম।” অরবিন্দ বাইক থেকে নেমে কাঠের ফটকটা খুলতে খুলতে হেসে বললেন, ”তোর বৌদিকে সব বলেছি।”
”কি বলেছেন?”
”রিপন স্ট্রীটে ধরাপড়ায় কথা।”
”সে কি! কেন বলতে গেলেন?” জ্যোতি ক্ষুব্ধ চোখে তাকাল। তার মনে হল, অরবিন্দদা এই সততা দেখিয়ে স্ত্রীর মনের উপর অত্যাচার করেছেন। ব্যাপারটা চেপে গেলে এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হত না। ”এটা আপনার বাড়াবাড়িই বলব।”
”প্রভাতী চোদ্দ বছর পঙ্গু হয়ে রয়েছে। ও নিজেই আমাকে যেতে বলত। আমি কয়েক বছর ধরেই যাচ্ছিলাম। প্রভাতী তা জানে। পুলিস রেইড আগেও হয়েছে। ধরা পড়েছি, চিনতে পেরে ছেড়েও দিয়েছে। দরকার পড়লে দাশুকে ফোন করে ছাড়া পেয়েছি।”
দালান থেকে প্রভাতী চেঁচিয়ে বলল, ”জ্যোতি না?”
”হ্যাঁ বৌদি, আমি।” জ্যোতিও চেঁচিয়ে উত্তর দিল। তারপর অরবিন্দর দিকে তাকিয়ে বলল, ”তাহলে সেদিন দাশুদাকে ফোন করলেন না কেন?”
”করেছিলাম।” ফটকের খোলা পাল্লাটা এক হাতে ধরে রেখে তিনি বললেন, ”ভেতরে আয়। পুলিশ রেইডটা দাশুই করিয়েছিল। খবরের কাগজে যাতে ভাল করে ছাপা হয় সে ব্যবস্থাটাও করেছিল।”
”জানলেন কি করে?”
জ্যোতি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল অরবিন্দর মুখের দিকে। কুড়ুল চালানো থামিয়ে লোকটি অবাক হয়ে মোটরবাইক দেখছে। বাচ্চচা ছেলেটি গুটিগুটি এগিয়ে এসে ফটকের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। ফিসফিস করে সে অরবিন্দকে বলল, ”দাদু, এটা কি?”
