”ওরা ভুল, মিথ্যে কথা লিখবে।”
”লিখুক, যা খুশি লিখুক। দু—চারদিন লোকে মনে রাখবে, তারপর ভুলে যাবে। তুই বেরিয়ে গিয়ে বোস গাড়িতে। বুট, হোজ এগুলো খুলে ফেল, এই লুঙ্গিটা পর আর গামছাটা গায়ে মাথায় জড়িয়ে নে।”
”আমার মোটরবাইকটা…”
”থাকুক এখানে। চাবিটা দে, কাউকে দিয়ে আনিয়ে নেব। এখন তোর বাইক চাপা উচিত নয়।”
”কোথায় যাব?”
”আমার ওখানে আপাতত। তোকে খুঁজতে মেসে যাবেই, হয়তো টিটাগড়ও যাবে।”
জ্যোতি নির্বিঘ্নেই রাস্তায় বেরিয়ে এল। অন্য দিনের মতই রাস্তা। স্বাভাবিক, ব্যস্ত, আমুদে। ফুটবল মাঠের দর্শকরা বিস্ময় আর বিষাদ নিয়ে ফিরে গেছে। গঙ্গার দিকের আকাশে সূর্যাস্তের রূপ ধরছে। তাই দেখে জ্যোতির মনে গভীরতা স্পর্শ করল।
দাশুদার ফ্ল্যাটে অন্ধকার ঘরে সে শুয়ে। ছবির মত চোখের উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে, সকাল থেকে সারা দিনটা। একসময় নীচে মোটর বাইকের শব্দ হল। তার বুলেট ফিরে এল। দরজায় বেল বাজাল। দুজনের কথা হচ্ছে। একটু পরে নাণ্টু ঘরে ঢুকল।
”জ্যোতিদা, তোমার জামা—প্যাণ্ট আর চাবিটা রইল।”
সে জবাব দিল না। নাণ্টু বেরিয়ে গেল। রাতে সে আধ—ঘুম, আধ—জাগরণের মধ্যে এপাশ—ওপাশ করে একসময় উঠে পড়ল। ঘড়িতে দেখল চারটে বাজে। নাণ্টু সোফায় ঘুমোচ্ছে, মেঝেয় একটা গল্পের বই পড়ে, আলো জ্বলছে।
আধঘণ্টা পর সে নিঃসাড়ে বেরোল ফ্ল্যাটের দরজা খুলে। অল্প পাওয়ারের আলো জ্বলছে গেটে। নাইট গার্ড জেগেই ছিল। তাকে সে চেনে।
”বাহাদুর, গেটটা খুলে দাও।”
”এখনো তো আঁধার রয়েছে!”
”হ্যাঁ, এই সময়টায় বেড়াতে খুব ভাল লাগে।”
খোলা গেট দিয়ে বুলেটটা বেরিয়ে এসে ছুটল হাওড়া ব্রিজের দিকে। গঙ্গা পেরিয়ে হাওড়া ময়দান থেকে বাঁদিকে ঘুরল। শিবপুর হয়ে একসময় বোম্বে রোড ধরে জ্যোতির বাইক ছুটল পশ্চিমে রূপনারায়ণ নদীর দিকে।
.
।।তেরো।।
গর্ত আর ঢিবিতে বাইক নিয়ন্ত্রণে রাখা ক্রমশই বিরক্তকর হয়ে পড়ছে। খালি গা, ইজের পরা ছেলেটি বলে দিল এই কাঁচা রাস্তাটা ধরে আরো দশ মিনিট যেতে হবে। দূরে বড় বড় গাছের আড়ালেই রয়েছে রাজপুর। ছেলেটি অরবিন্দ মজুমদারের নাম শোনেনি। পানিত্রাসের কাছ থেকে জিজ্ঞাসা করতে করতে অবশেষে এই পর্যন্ত পৌঁছেছে। বছর চারেক আগে শরৎচন্দ্রের বাড়ি দেখতে এসেছিল। সেই পর্যন্ত পথ তার চেনাই ছিল।
পথের অবস্থার জন্য বাধ্য হয়েছে বটে কিন্তু তা না হলেও জ্যোতি বাইকের গতি মন্থর করত। সকালের গ্রাম, দু’পাশের সবুজ ধানক্ষেত, রোদের মৃদু তাত, আকাশে চিল, মাটি, জল, কাদা, লতাগুল্ম, গাছ, শস্য এবং বাতাস দ্বারা তৈরি অলৌকিক সোঁদা গন্ধ আর নির্জনতা এবং নৈঃশব্দ্য, এসব চেখে নিতে হলে ব্যস্ততা বর্জন দরকার।
কোনদিকে যে তাকাবে সে ঠিক করে উঠতে পারছে না। সূর্য ডান দিকে দূরের গাছ ছাড়িয়ে উঠেছে। বাঁ দিকে ডোবায় জাল ফেলছে গেরস্থ। ছুটে আসছে এক বালক মোটরবাইকটাকে কাছ থেকে দেখবে বলে। দুধ দোওয়া বন্ধ রেখে বৌটি মুখ ঘুরিয়ে, দেখছে, গরুটি চেটে যাচ্ছে তার বাছুরকে। দুটো বুলবুলি ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করছে নিমগাছটায়।
হঠাৎ জ্যোতির মনে হল কে যেন তাকে ডাকছে। বাইক থামিয়ে সে মুখ ফেরাল। দুশো গজ দূরে একটা ডোবার পাশে, জড়াজড়ি করা কয়েকটা খেজুর গাছের ধারে দুটি লোক। তাদেরই একজন হাত তুলে নাড়ছে আর চেঁচাচ্ছে।
”জ্যোওওতিইই…অ্যাই জ্যোওওতি…”
অরবিন্দদা! জ্যোতি দু’হাত তুলল, গোল দিয়ে সে রকম ভাবে তুলত। আশ্চর্য, যত দূরেই হোক অরবিন্দদাকে সে চিনতেই পারেনি অথচ খেজুর গাছগুলোর ওপর থেকে তার চোখ ঘুরে এসেছে।
আসমান জমি আর আলের উপর দিয়ে অরবিন্দ মজুমদার ছুটে আসছেন। গেঞ্জি আর হাঁটু পর্যন্ত গোটান ধুতি। ফুটবলারের মত অভ্যস্ত সুঠাম দৌড়।
”দূর থেকে আওয়াজ পেয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। তারপর দেখি কিন্তু তুই!”
”আমি কিন্তু চিনতেই পারিনি। এখানে কি করছেন?”
”আগে বল তুই যে এখানে?”
”পালিয়ে এলাম।”
”কি করেছিস?”
”কাগজ আসুক জানতে পারবেন।”
”খবরের কাগজ এখানে আসে না,” অরবিন্দ মজুমদার হাসলেন। ”এলেও আমি পড়ব না।”
জ্যোতি অপ্রতিভ হল। কাগজের কথা তোলাটা উচিত হয়নি।
”এখানে একটা জমিতে ধান দিয়েছি। পোকা লেগেছে, কাল ওষুধ দিয়ে গেছলাম, দেখতে এসেছি। তোর ব্যাপার কি? কিছু হয়েছে নাকি? এখনো তো লিগ চলছে আর তুই,…ক্লাবের সঙ্গে কিছু?”
”আমি অনেক কিছুই জানি না অরবিন্দদা। আমি হেরে যাচ্ছি।” বাইকের দু’পাশে পা, দুটো হাত হ্যাণ্ডেলে, কাতর স্বরে জ্যোতি রাজপুরের রাস্তায় কথাগুলো বলল।
অরবিন্দ মজুমদার বুঝে উঠতে পারলেন না। তাকিয়ে রইলেন।
”আমি ঠিক বোঝাতে পারব না আপনাকে। যা হতে চেয়েছিলাম তা হতে পারলাম না। ফুটবলকে সাধনার জিনিস করতে পারলাম না। মানুষকে মঙ্গলের পথে নিয়ে যাবার ক্ষমতা আমার নেই, এটা কাল আমি জেনেছি। আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। আমি পালিয়ে এসেছি।”
ধীরে ধীরে অরবিন্দ মজুমদারের মুখে হাসিটা ছড়িয়ে পড়ল। মাথা নাড়লেন আক্ষেপে। ”এই রকমই হয়। বড় বেশি আঁকড়ে ধরেছিলিস কিনা। ক’দিন এখানে থেকে যা। চল বাড়িতে যাই, আজ তোর বাইকে উঠব।”
”বৌদি কেমন আছেন?”
”খুব ভাল।” বলতে বলতে তিনি বাইকের পিছনে বসে দু’হাতে জ্যোতির কাঁধ ধরলেন। বাইক চলতে শুরু করার পর বললেন, ”জ্যোতি, ফুটবলটা জীবনের একটা সামান্য অংশমাত্র। এত ভেঙে পড়ছিস কেন? নিজের মত করে কি জীবনটাকে খেলাতে পারসি না?”
