মাঠে খেলা শুরু হয়ে গেছে। শেষ হতে ছয় মিনিট তখনো বাকি। দেখা গেল, গ্যালারি ও মাঠের মাঝখানে কাঠের বেড়ার উপরের কাঁটাতার টেনে নামিয়ে ফেলছে কয়েকজন লোক। কয়েকটা দেহ বেড়ার ওধার থেকে ধরাধরি করে নামিয়ে দেওয়া হল মাঠের ধারে। পুলিশ ঢাল আর ব্যাটন নিয়ে গ্যালারিতে উঠে এলোমেলো পিটোতে শুরু করেছে।
শেষ হুইশল বাজার আগেই জ্যোতি তাঁবুতে চলে এসেছিল। আজ সে ফেরার সময় কোন জনতার সামনে পড়ল না। ড্রেসিং রুমে সে একাই বসেছিল। দেয়ালে ঠেশ দিয়ে চোখ বন্ধ করে সে ঘটনাটা মনে মনে আবার তৈরি করার চেষ্টা করছিল।
বাইরে ক্লাবলনে কিছু একটা হচ্ছে মনে হওয়ায় সে জানলা খুলে তাকাল এবং বিমূঢ় হয়ে গেল। রেলিংয়ের ধারে শত শত মানুষ নির্বাক দাঁড়িয়ে। সাত—আটটি দেহ লনের উপর শোয়ান। আরো দেহ কাঁধে, ঘাড়ে, পাঁজাকোলা করে আনা হচ্ছে। দেহগুলির দিকে আর একবার তাকিয়ে জ্যোতির বুঝতে অসুবিধা হল না সেগুলিতে প্রাণ নেই।
ধীরে ধীরে জ্যোতির চেতনা থেকে আলো সরে গিয়ে অন্ধকার নেমে এল। অজ্ঞান হয়ে মেঝেয় পড়ে যাবার আগে সে শুধু বলেছিল, ”ভগবান, আমার জন্যই…”
।।বারো।।
এগারো জন মারা গেছে।
কেউ পায়ের চাপে, কেউ বেড়ায় বা বন্ধ দরজায় ভিড়ের চাপে পিষে, দম—বন্ধ হয়ে। মৃতরা পালাতে চেয়ে দিগভ্রান্তের মত সরু পথ দিয়ে দরজার দিকে ছুটেছিল বেরোবার জন্য। কাঠের দরজার খিল খোলার আগেই তারা ভিড়ের চাপে পড়ে যায়। ওরা ভয় পেয়ে হঠাৎই একসঙ্গে ছুটেছিল।
ভয় জ্যোতিও পেয়েছিল। দিনের পর দিন সে নিজের খেলা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তার ভয় হচ্ছিল নিজের ফুটবল জীবনকে সে হারিয়ে ফেলছে। চারিদিক থেকে পরিস্থিতিগুলো তার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। তাকে ঘিরে দম—বন্ধ—করা একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সে বাঁচার জন্য খেলার মধ্যে আসতে চেয়েছিল। ফুটবলের বাইরে তার জীবনের কোন অর্থ নেই। ছোটবেলা থেকে এটাই সে জেনে এসেছে।
অ্যাম্বুলেন্স আসার আগে অনেকেই তাদের গাড়িতে অসাড় দেহগুলোকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেছে, সরকারীভাবে মৃত ঘোষণার জন্য। তাঁবুর মধ্যে শ্মশানের মুহ্যমানতা। যাত্রীর খেলোয়াড়রাও নিজেদের তাঁবুতে ফিরে যায়নি। বড় হল ঘরে তারা সারথির খেলোয়াড়দের সঙ্গে বসে। তাঁবুর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করা।
এখন কি কথা যে বলবে ওরা ভেবে পাচ্ছে না। পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে ওরা চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। সান্ত্বনা দেবার জন্য কাউকে ওরা পাচ্ছে না, সান্ত্বনা নেবার ইচ্ছাও যেন ওদের নেই। প্রত্যেকেই নিজেকে অপরাধী ভাবছে।
হঠাৎ কে একজন অস্ফুটে বলল, ”পড়ে গিয়ে উঠল, তখনো চেষ্টা করলে বলটা কন্ট্রোলে নিতে পারত।”
কেউ কথা বলল না। শুধু জ্যোতির মাথাটা নীচু হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগে তার মুখে জলের ঝাপটা দেওয়া হয়েছে। ভিজে চুল থেকে টপটপ জল পড়ল কোলে।
হয়তো ঠিকই বলেছে। বলটা আবার সে দখলে এনে গোলের দিকে এগিয়ে যেতে পারত। শুধু গোলকিপার ছাড়া তো সামনে আর কেউ ছিল না। কিন্তু তা না করে সে অসিতের দিকে ছুটে গেল। কেন? সারা জীবন তাকে এর উত্তর খুঁজতে হবে এবং উত্তর পাবে না।
জীবনে অনেক ব্যাপারেরই উত্তর পাওয়া যায় না। তবু খোঁজাখুঁজি চলে। এগারোটা প্রাণ চলে গেল। জ্যোতি বুঝে উঠতে পারছে না, কেন গেল? তার ওই লাথিটাই কি দায়ী? লাথি মারা দেখেই কি গ্যালারিতে তাণ্ডব শুরু হল? সবাই তাই বলবে।
কিন্তু এই খেলাটার মধ্যেই কি হিংস্রতার বীজ নেই? সেটাকেই চমৎকারভাবে বার করে আনার, বাড়িয়ে তোলার জন্য কি লিগ আর টুর্নামেণ্টের ব্যবস্থা রাখা হয়নি? ম্যাচ জেতাটাই বড় কথা আর সেজন্যই চাই গোল। খেলোয়াড়রাই নয়, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষ চায় জিততে। যে—কোন পন্থায়।
আমিই কি শুধু দায়ী? যারা মারা গেল তারাও এসেছিল জয় দেখতে। তারা কোন দলের সমর্থক জ্যোতি তা জানে না, কিন্তু ভয় না পেলে ওরা হয়তো এখন জীবন্ত থাকত।
এটাকে ভয় বলা যায় কি, না শোভনতা, রুচি, শান্তি রক্ষার জন্য চেষ্টারই একটা প্রকাশ। ভয়ের বদলে ওরাও তো আত্মরক্ষার জন্য হিংস্র হয়ে উঠতে পারত! জীবনের ভাল দিকটা ওরা দেখাতে চেয়েছিল কি? আর আমিই সেটা ধ্বংস করলাম। কাকে যেন বলেছিলাম, হাজার হাজার মানুষকে আমি খেলার মধ্য দিয়ে আনন্দ দিই? দুঃখকষ্টের জীবন থেকে মুক্তি দিই?
”জ্যোতি আর এখানে নয়, আমার সঙ্গে চল।”
চোখ তুলে সে দাশুদার ঝুঁকে পড়া মুখটার দিকে তাকাল। নির্বাক অর্থহীন চাহনি তার। যাত্রীর লোকেরা নিঃশব্দে কখন নিজেদের তাঁবুতে চলে গেছে।
”কাগজের লোকেরা তোকে ধরার জন্য দাঁড়িয়ে। তোর স্টেটমেণ্ট চায়। বলেছি নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছে, শুয়ে আছে ট্রাঙ্কুইলাইজার খেয়ে। টুক করে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আমার গাড়িতে গিয়ে বোস।”
”আমি কথা বলব।”
”না।’ দাঁতে দাঁতে চেপে দাশুদা গজরে উঠল। ”একটি কথাও নয়। এই মুহূর্তে তোর একটা বেফাঁস কথায় সারথির সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে।”
”আমি নিজের কথা বলব, সারথিকে কোন কিছুতেই টানব না। দাশুদা প্লিজ…”
”চুপ কর শুয়োরের বাচ্চচা। তুই এখনো সারথির প্লেয়ার, এখনো তোর গায়ে সারথির জার্সি। যা বলবি সেটা ক্লাবেরই কথা হয়ে যাবে। আর নিজের কথা তোর কি—ই বা বলার আছে, কি সাফাই গাইবি? রাস্তায় বেরোতে পারবি? লোকে খুনী বলবে তোকে।”
