খেলা দু মিনিট না গড়াতেই জ্যোতি বুঝে গেল আজ সে পাহারায় রয়েছে। যাত্রীর অসিত আজ তাকে খেলতে দেবে না। নিশ্চয় কোচের নির্দেশেই সে জ্যোতির দু গজের বাইরে নিজেকে রাখছে না। অসিত ঝগড়া করে সারথি ছেড়ে গেছে। প্রতিশোধ নেওয়ার জেদ তাকে ক্ষেপিয়ে রেখেছে। জ্যোতিকে অকেজো করার দায় তার উপরই পড়েছে এবং অসিত তাতে অখুশি নয়।
আজ ফরোয়ার্ডদের খেলানোর দায়িত্ব, আক্রমণ তৈরি করে দেওয়ার কাজ জ্যোতির। প্রায় দশ মিনিট হয়ে গেল অসিত তাকে বল ছুঁতে দেয়নি। ছায়ার মত সঙ্গে লেগে রয়েছে।
গ্যালারিতে যাত্রীর গর্জন আর সারথির হতাশা খেলার মাঠ ছুঁয়ে বয়ে যাচ্ছে। শৈবাল খিঁচিয়ে হাত নেড়ে জ্যোতিকে গালাগাল দিল। জ্যোতি না শোনার ভাণ করল।
অবশেষে পিছন থেকে পাওয়া একটা বল সেণ্টার লাইনের কাছে ধরে সে অসিতকে টলিয়ে দু পা এগোতেই অসিত তাকে ট্রিপ করে ফেলে দিল। নিজেই ফ্রি কিক নিয়ে ডান দিকে বিষ্ণুকে দিয়ে, বলটা ফেরত পাবার আশায় সে সামনে দৌড়ল, পাশাপাশি অসিতও। বিষ্ণু উঁচু ক্রস পাঠাল, বলটা মাথায় নেবার জন্য জ্যোতি লাফাতেই অসিত কনুই দিয়ে পাঁজরে মারল। বুক চেপে সে বসে পড়ামাত্র যাত্রীর স্টপার বলটা পেয়ে মাঝ মাঠে পাঠাল।
”আমাকে টাইট মার্কিংয়ে রেখেছে…কি করব…মূর্তিকে আমার পাশে খেলতে বল।” জ্যোতি ছুটে গিয়ে শৈবালকে বলল।
”সাধনদা যা বলে দিয়েছে…তুই যেভাবে পারিস চালিয়ে যা। আর একটু নেমে খেল।”
জ্যোতি আরো তিনবার বল ধরে এগোন মাত্র অসিত তাকে ফেলে দিল। রেফারি দুবার তাকে হুঁশিয়ার করে অবশেষে অসিতকে হলুদ কার্ড দেখালেন।
গ্যালারিতে চিৎকার, বিদ্রূপ এবং গালিগালাজ শুরু হল। বল সাইডলাইনের বাইরে যাওয়ায় থ্রো ইনের জন্য বলটা কুড়োতে গিয়ে জ্যোতির চোখ দর্শকদের উপর পড়ল। খালি গায়ে, দু হাত ঝাঁকিয়ে উন্মাদের মত চাহনি নিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে। ঠোঁটের কষে গ্যাঁজলা। এক কিশোর টলতে টলতে ছুটে গ্যালারির ভিড় ঠেলে নেমে এসে কাঠের বেড়ায় কপাল ঠুকতে লাগল। বলটা কুড়িয়ে সে একবার পিছনে তাকাল। কপাল থেকে রক্ত ঝরছে।
হাফ টাইমে খেলা গোলশূন্য।
”হয় আমাকে বসিয়ে দিন নয়তো অন্য কোথাও খেলান।”
সাধন নাথ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন জ্যোতির দিকে।
”অসিতকে তুমি ছাড়াতে পারছ না, এটা আমায় বিশ্বাস করতে হবে? তোমার নখের যুগ্যি ও নয়।”
”আপনি বলতে চান অসিত কোন প্লেয়ারই নয়, ও খেলতেই জানে না?”
”অসিত তোমার খেলা নষ্ট করছে, কেন তুমি কি ওর খেলাটা নষ্ট করতে পার না? আসলে তুমি চেষ্টাই করছ না। শুনেছ, গ্যালারিতে কি বলছে তোমার সম্পর্কে?”
জ্যোতির স্নায়ু এবং হৃৎপিণ্ড একই সঙ্গে ঝাঁকুনি খেল। পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠল। মাথা নীচু করে বসে রইল মাঠে নামা পর্যন্ত।
অসিত প্রথমার্ধের মত একইভাবে তাকে পাহারা দিতে লাগল। সে নিজে খেলছে না, জ্যোতিকেও খেলতে দিচ্ছে না এবং সারথির সমন্বয় বা সংগঠন এর ফলে ক্রমশ বাঁধন ছেঁড়া এলোমেলো হতে শুরু করল। ম্যাচটা যাত্রীর মুঠোয় ধীরে ধীরে এসে গেছে। পেনাল্টি এলাকায় অবিরাম চাপ তৈরি হচ্ছে। যে—কোন সময় সারথি গোল খেয়ে যেতে পারে।
যাত্রীর সমর্থকদের উল্লাস এবং রণহুঙ্কার একটানা বয়ে চলেছে। সারথির ডিফেন্স তছনছ। আটজনে উঠে এসে ওরা ঘিরে ধরেছে, নয়জনে প্রতিরোধ করে যাচ্ছে। ঠিক এই সময় জবেদের একটা ক্লিয়ারেন্স ছিটকে সোজা এল বাঁদিকে জ্যোতির পায়ে। অসিত একটু দূরে। যাত্রীর গোল প্রায় ষাট গজ দূরে। সামনে বাধা শুধু একজন স্টপার।
বল নিয়ে জ্যোতি দৌড়ল। কয়েক মুহূর্তের জন্য গ্যালারি নিস্তব্ধ রইল অপ্রত্যাশিত ব্যাপারটায়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে জ্যোতি মোক্ষম মারণাস্ত্রের মত নিখুঁত। কি হতে যাচ্ছে বুঝে উঠতেই সারথির সমর্থকরা কলজে ফাটানো চীৎকার করে উঠল।
অসিত তাকে তাড়া করেছে। স্টপার বুঝতে পারছে না চ্যালেঞ্জ দিয়ে এগোবে, না আর একটু পিছিয়ে ট্যাকলে যাবে। সে হাফ লাইনের কাছে জ্যোতির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তৈরি হয়ে রইল।
কাছাকাছি হয়ে জ্যোতি ডজ করার ঝুঁকি আর নিল না। বলটা স্টপারের পাশ দিয়ে ঠেলে দিয়েই তাকে পাশ কাটিয়ে সে বোরোতে দেখল সামনে শুধু গোলকিপার। অবধারিত গোল হচ্ছে জেনে গ্যালারিতে ক্র্যাকার ফাটল।
জ্যোতি বলটাকে আবার দখলে আনতে পায়ে সবেমাত্র ছুঁয়েছে সেই সময় অসিত পিছন থেকে শেষ চেষ্টা করল তার পায়ের গোছে লাথি মেরে। হুমড়ি খেয়ে জ্যোতি মুখ থুবড়ে পড়ল এবং অদ্ভুত এক ব্যাপার করে বসল। লাফ দিয়ে উঠে বলটা আবার আয়ত্তে আনার বদলে সে ছুটে গিয়ে জমিতে পড়ে—থাকা অসিতের বুকে লাথি কষাল।
সারা মাঠ স্তম্ভিত। ছুটে এল দু দলের কয়েকজন ঘুঁষি তুলে। তাদের বাধা দিতে ছুটে এল কয়েকজন। জটলা এবং ধস্তাধস্তির মধ্যে রেফারি লাল কার্ড তুলে দু’জনকে দেখালেন।
এই সময়ই দেখা গেল গ্যালারির একদিকে কি যেন ঘটছে। পরপর তিনটে ক্র্যাকার ফাটল। একদল লোক দিশেহারা হয়ে হুড়মুড় করে নীচে নেমে আসছে। খালি গায়ে ঝাকড়া চুল একজন একটা ছুরি হাতে এলোপাথাড়ি ডাইনে বাঁয়ে ঘোরাচ্ছে। গ্যালারির ওইদিকের অংশটা দ্রুত খালি হয়ে যাচ্ছে। মাটিতে গাদাগাদি, ভয়ার্ত চিৎকার। সবাই দরজার দিকে যাবার চেষ্টা করছে।
