দৌড়ের পর, পার্টি করে খেলা, তারপর কিছু শুটিং প্র্যাকটিস সেরে ওরা যখন তাঁবুতে ফিরল তখন দাশুদা অপেক্ষা করছে জ্যোতির জন্য।
”যাত্রীর ম্যাচটায় তুই খেলছিস।”
জ্যোতিরও মনে হয়েছিল, তাকে নামতে হবে। সাধন নাথ যতই অনিচ্ছুক থাকুক, তাকে না নামিয়ে আর উপায় নেই। টিম এখন ছন্নছাড়া অবস্থায়, ইনজুরি আর অসুখে আরো কাহিল হয়ে পড়েছে। রিজার্ভে এখন কেউ নেই যাকে এই ম্যাচে নামান যায়।
”মিড ফিল্ডে খেলতে হবে?”
”হবে! যা বলছে তাই কর।”
”দাশুদা অনেকবার বলেছি, আমাকে আমার জায়গায় খেলতে দিন। ব্যাণ্টাম ওয়েটকে যদি বলেন, এখন থেকে তুমি হেভিওয়েট তা হলেই কি সে হেভিওয়েট হয়ে যাবে?”
”তোর যা ট্যালেণ্ট তাতে তুই সব জায়গায় খেলতে পারিস।”
”হ্যাঁ এই ট্যালেণ্টটাই এখন সাধন নাথের দরকার।”
”যাক ওসব কথা, আজ সন্ধেবেলায় আসছিস।”
অর্থাৎ ওর ফ্ল্যাটে। বীয়ার খাওয়ার বা ব্লু ফিল্ম দেখার জন্য?
”না, সময় নেই।”
জ্যোতি দ্রুত স্নানের ঘরের দিকে চলে গেল।
.
এত লোক খেলা দেখতে আসবে জ্যোতি তা ভাবেনি। সবুজ গ্যালারিতে তিল ধারণের জায়গা নেই। যাত্রীর আর সারথির পতাকা আন্দোলিত হচ্ছে গ্যালারিতে অন্যান্য বছরের থেকে এবারের টেনশন অনেক বেশি। দুটি দলেরই সমান খেলায় সমান পয়েণ্ট। তৃতীয় স্থানের জন্য লড়াই এবং আজকের খেলাতেই সেটা স্থির হয়ে যাবে।
সারথির ড্রেসিং রুমেও টেনশন। কেউ কারুর সঙ্গে কথা বলছে না। সাধন নাথ থমথমে মুখ দিয়ে নিজের ঘরে। মাঠের গুঞ্জন ঘরে আসছে। শৈবাল জানলা বন্ধ করে দিল। জবেদ উঠে গিয়ে জানলা খুলে দিল।
”খুললি কেন?”
”গরম লাগছে।”
”লাগুক।” শৈবাল শব্দ করে পাল্লা বন্ধ করল।
”না, খোলা থাকবে।” জবেদকে হঠাৎ হিংস্র দেখাল।
জ্যোতি চুপ করে হোজ পরতে পরতে দেখছে দু’জনের ব্যাপারটা। টেনশনের প্রকাশ এভাবেই ঘটে। সে নিজেও শান্ত নেই। একটা ঝাঁঝালো অবস্থা তার মধ্যেও তৈরি হচ্ছে।
পাশ থেকে অজিত বিড়বিড় করল, ”আমাকে রাখতে হবে ওদের লেফট উইংটাকে। নতুন ছেলে, খুব ফাস্ট।…সাধনদা বলেছে না পারলে মাঠের বাইরে চালান করতে।”
”মারবি?”
”তা ছাড়া আর কি করব।” অজিত মাথা নীচু করে বুটে ফিতে পরাতে লাগল।
হঠাৎ একটা গোলমালের শব্দ ভেসে এল। একটু পরেই ঘরে ঢুকল চঞ্চল মৈত্র।
”সবুজ গ্যালারিতে মারপিট শুরু হয়ে গেছে। বোতল, ইঁট চলছে, সারথি সাপোর্টার কয়েকজনের মাথা ফেটেছে। ওর বদলা চাই।” চঞ্চল দু হাত ঝাঁকিয়ে প্রায় উন্মাদের মত চিৎকার করে উঠল। ”এর শোধ তোরা নিবি। আমাদের লোক মার খাচ্ছে, তোরা যদি মানুষের বাচ্চচা হোস, যদি মায়ের দুধ খেয়ে থাকিস তা হলে আজ জিতে ফিরে আসবি।”
সবাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে। জ্যোতির গলা শুকিয়ে আসছে। থরথর করে হাতের আঙুল কেঁপে উঠল। ম্যাচ শুরুর আগেই মারামারি, রক্তারক্তি। এটা ভাল লক্ষণ নয়। সারা মাঠ যে কি টেনশনে রয়েছে, তারই প্রমাণ এইসব।
ম্যাচে জিততেই হবে। নরখাদক বাঘ গুড়ি মেরে অপেক্ষায় রয়েছে সারা মাঠ ঘিরে। তীক্ষ্ন নজরে তার প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ্য করে যাবে।
আগের ম্যাচের কথা মনে পড়ল তার। জ্যোতি বিশ্বাস ইচ্ছে করে ক্লাবকে ডোবাচ্ছে,…পলিটিক্স করছে…ক্লাব সাদা হাতি পুষছে…যারা মাথায় তুলে নেচেছে এখন ভুল ভাঙছে তাদের…নিজের খেলা খেলছে না,…জ্যান্ত চামড়া তুলে নেব।
তার কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে সে দু—তিন মিনিটের বেশি আর দৌড়তে পারবে না। পা দুটো ভারী লাগছে। শট নেবার জন্য পা বোধহয় তুলতে পারবে না।
কে একজন এসে কপালে সিঁদুর লাগিয়ে দিল। কিন্তু কালিঘাটের কালী কি এখন তার ঝাপসা চোখ পরিষ্কার করে দিতে পারবেন? সে কিছুই তো দেখতে পারছে না।
”সবাই রেডি।” সাধন নাথ দরজায় এসে দাঁড়াল। ”যা বলার তাতো বলেই দিয়েছি। মাঠে আজ দারুণ টেনশন। তোমরা রিল্যাকসড থেকে খেলে যাও।”
তাঁবু থেকে সবার সঙ্গে বেরিয়ে জ্যোতি মাঠের দিকে এগোল। সারথিকে দেখামাত্র ক্র্যাকার ফাটিয়ে অর্ধেক মাঠ গর্জন করে উঠতেই তার চটকাটা ভাঙল। হঠাৎই বুকটা তার কেঁপে উঠল। এই গর্জনটায় সে অভ্যস্ত, তাকে মধুর উত্তেজনায় ভরিয়ে দেয় এই বিশাল ধ্বনিপুঞ্জ। সে জানে এই গর্জন তার জন্যই, বিরাট প্রত্যাশা লুকিয়ে থাকে এর আড়ালে যেটা ঝলসে ওঠে তার কাছ থেকে গোল পাবার পর।
কিন্তু এখন সে ভয় পেল। এই গর্জন তাকে স্বাগত জানাতে হয়নি। আহত ক্রুদ্ধ একটা নরখাদক শিকারের উপর লাফিয়ে পড়ার আগের মুহূর্তে যে গর্জন করে, এটা তাই।
”ভগবান, আজ যেন খেলতে পারি।”
মনে মনে জ্যোতি বলল এবং জীবনে এই প্রথমবার। ভগবানে বিশ্বাস তার কখনো ছিল না। অরবিন্দদার একটা কথা মনে পড়ছে তার। ‘যেভাবে খেললে তুই স্বচ্ছন্দ বোধ করবি, সেই ভাবেই খেলবি। আর কোন কিছু নিয়ে মাথা ঘামাবি না।’
কিন্তু চারপাশে এখন কি হচ্ছে? কিভাবে স্বচ্ছন্দ বোধ করব? আমাকে সাধন নাথ চেপে, কুঁকড়ে, পিষে দিয়েছে। কোথায় আমার স্বাধীনতা? কোথায় আমার গতি? এসপার—ওসপার মনোভাব? হঠাৎ ঝলসানি দেওয়ার ইচ্ছা? মনের সঙ্গে তাল রেখে শরীর কেন আর চলে না?
রাগে ক্ষেপে উঠছে? জ্যোতির এবার চোয়াল শক্ত হল। রগের কাছটায় টিপটিপে ব্যথা জমছে। সাধন নাথের মুখের দিকে সে তাকাল মাঠকে প্রমাণ করে নামার আগে। এই লোকটা কিংবা এই গর্জন কিংবা এই বেইমান সাপোর্টাররা সবাইকে সে শিক্ষা দেবে। বুঝিয়ে দেবে জ্যোতি বিশ্বাস মরে যায়নি।
