অবসন্ন লাগছে নিজেকে। চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। নিজের সম্পর্কে তার ভয় হচ্ছে হয়তো তার মাথা খারাপ হয়ে যাবে। জ্যোতির মনের মধ্যে অস্পষ্ট ক্ষীণ একটা কাতর কণ্ঠের স্বর অতীত থেকে ভেসে আসছে—”আমার কি হবে?’ সেদিনও তার এইরকম অবস্থা হয়েছিল। মনে হয়েছিল পাগল হয়ে যাবে। সেদিন সে বাড়ি ছেড়ে, টিটাগড় ছেড়ে পালিয়ে গেছল। এবারও কি তাকে পালাতে হবে? কিন্তু কোথায় যাবে সে?
।।এগারো।।
জ্যোতি দু সপ্তাহ মেসে আসেনি। সারথির লোক টিটাগড়ে গিয়ে তাকে পায়নি। দশ দিন আগে সে বাইক রেখেই বেরিয়েছে। বলে গেছে মালদা, কৃষ্ণনগর, গোবরডাঙ্গা হয়ে ফিরবে। বাইকে চলাফেরা আর নিরাপদ নয় ভেবেই সেটা রেখে গেছে। বাংলার গ্রামের দিকে সারথির সাপোর্টাররা একটু বেশিমাত্রায় খবরের কাগজকে বিশ্বাস করে। বাইক আটকে তাকে উত্তপ্ত করে মেজাজ নষ্ট করতে পারে।
বাড়িতে ফিরে খবর পেয়ে জ্যোতি মেসে ফিরল। তার জায়গায় মিড ফিল্ডে অজিতকে আর নতুন একটি ছেলেকে খেলান হয়েছে। চারটি খেলায় আরো এক পয়েণ্ট গেছে। তেরো খেলায় মোট ছয় পয়েণ্ট হারিয়ে সাধন নাথ এখন চিন্তার মধ্যে। যত ঢাক—ঢোল পিটিয়ে এবং আশা জাগিয়ে শুরু হয়েছিল তার সিকি ভাগও পূরণ হয়নি। সারথি যে’কটা ম্যাচ জিতেছে তাতে খেলা দেখে গ্যালারির দর্শকরা খুশি হয়নি, স্বস্তি পায়নি।
লিগ চ্যাম্পিয়ান কেন, চতুর্থ স্থানে আসার সম্ভাবনাও আর নেই। এখন সমর্থকদের মনে শুধু একটাই বাসনা তীব্র হয়ে উঠেছে। যুগের যাত্রীকে হারাতেই হবে।
ডেসিং রুমে জ্যোতির সঙ্গে কথা বলায়, গৌতম ছাড়া আর কেউ উৎসাহ দেখাল না। সে লক্ষ্য করল, সবার মধ্যেই কেমন গা—ছাড়া ভাব। দু’দিন পরেই যাত্রীর সঙ্গে খেলা কিন্তু কেউই তাই নিয়ে ভাবছে না। গত বছর যাত্রী তাদের এক গোলে হারিয়েছিল?
”বাচ্চচুদার বিয়ে কি সেই মেয়েটার সঙ্গেই ঠিক হল?” গৌতম জানতে চাইল।
”তবে আবার কার সঙ্গে ঠিক হবে!” বিপ্লব বিস্ময় প্রকাশ করল। ”সাত বছর ধরে বাচ্চচু লেগে আছে। কম ঝামেলা করেছে মেয়ের বাপ? ফুটবল প্লেয়ারের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে কিছুতেই দেবে না ঠিক করেছিল। সাধনদা, চঞ্চলদা কথা বলে রাজি করিয়েছে।”
”বাচ্চচু তো এখনই প্রতিজ্ঞা করেছে, ছেলে হলে কবাডি প্লেয়ার বানাবে তবু ফুটবলার কিছুতেই নয়।”
”ওরে বাবা এখনই ছেলের কথা ভাবছে! আরে আগে বিয়েটা হোক, বৌকে নিয়ে…” বিপ্লব চোখ মারল সারা ঘরের উদ্দেশ্যে।
অরবিন্দ মজুমদারের আমলে ড্রেসিং রুমে এই ধরনের রসিকতা হত না। জ্যোতি মুখ ফিরিয়ে রথীনের দিকে তাকাল। অপ্রতিভ রথীন চেঁচিয়ে উঠল, ”আর দেরী নয়, সাধনদা মাঠে চলে গেছে। হারি আপ।”
এই সকালেই মাঠের ফেন্সিংয়ের ধারে, গ্যালারিতে জনা পঞ্চাশ ছেলে প্র্যাকটিস দেখতে এসেছে। তাদের মধ্যে খবরের কাগজেরও একজন রয়েছে। শৈবালের সঙ্গে সে কথা বলছিল পরশুর ম্যাচ সম্পর্কে। পাশ দিয়ে যাবার সময় জ্যোতি শুনতে পেল—”নতুন কি আর বলার আছে। ভাল তো খেলতেই হবে। নিজেদের খেলা খেলতে পারলে ম্যাচ আমরা বার করে দেব।”
জ্যোতির মনে হল শৈবালের কথার মধ্যে আত্মবিশ্বাসটাই যেন ঝিমিয়ে রয়েছে। নেহাত বলতে হয় তাই বলা। জবেদের মাসল পুল, পরিতোষের জ্বর। ওরা খেলতে পারবে না।
”ওয়ার্ক রেট অনেক কমে গেছে, উন্নতি ঘটাতে হবে।” সাধন নাথ সবাইকে দাঁড় করিয়ে প্রথম কথা বলল। শুক্রবারের ম্যাচ আমাদের জিততেই হবে। না জিততে পারলে জেনে রেখ, গড়ের মাঠে আমাদের আর পা দিতে হবে না, হাড়গোড়ও আস্ত থাকবে না। আর সব খেলার হারি বা জিতি তাতে এমন কিছু যায় আসে না, কিন্তু এই ম্যাচটা আমাদের চাই—ই, হাজার হাজার সাপোর্টার তোমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে…”
সাধন নাথ একটানা বলে যাচ্ছে। জ্যোতি তখন পায়ের বলটা নাড়াচাড়া করছিল। সেটা লক্ষ্য করে সাধন হঠাৎ কথা বন্ধ করে বলল, ”এবার দৌড় শুরু করা যাক। প্রথমে মাঠে কুড়ি পাক তারপর বেরিয়ে রেড রোড ধরে যেমন দৌড়ও।”
জ্যোতি বুঝে গেছে, সাধন নাথের বিশ্বাস ফিটনেসই হল আসল জিনিস। সে ধরেই রেখেছে, বল নিয়ে যা কিছু করার জন্য যে স্কিল দরকার খেলোয়াড়দের মধ্যে সেটা তো থাকবেই। বল কণ্ট্রোলের জন্য প্র্যাকটিসকে সে সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু মনে করে না। কেউ যদি বলকে আপনা থেকেই কণ্ট্রোল করতে না পারে তা হলে তার ফুটবল খেলাই উচিত নয়। আর সব কিছুর মূলে রয়েছে এনডিওরেন্স। গতি না কমিয়ে টানা নব্বই বা সত্তর মিনিট যদি খেলোয়াড়রা দৌড়তে পারে তা হলে ম্যাচ জেতা হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া যায় শুরুর আগেই। ম্যাচ জিততে না পারলে সাধন নাথ প্রথমেই বলে, ‘ট্রেনিংয়ে ঢিলেমি দেওয়ার ফলটা পেলে তো।’ তারপর তার প্রিয় বাক্যটি বলবে, ‘ওয়ার্ক রেট আরো বাড়াতে হবে।’ কিন্তু কোন খেলোয়াড়ই নিশ্চিত ভাবে জানে না ওয়ার্ক রেট বলতে কি বোঝাতে চায়। তবে এই ধারণাটুকু তাদের হয়েছে যে না—থেমে দৌড়নর সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।
একবার দৌড়তে দৌড়তে গৌতম বলেছিল, ‘যে রেটে ছোটাচ্ছে তাতে তো ওলিম্পিক ম্যারাথনে কোয়ালিফাইট করে যাব!’ ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে ম্যাচের আগে দু মাইল দৌড়ের পর দু মিনিটের জন্য বিশ্রামের সময় সে বলেছিল, ‘শুধুই ইস্টবেঙ্গল ক্লাব না হয়ে মোহনবাগানের মত অ্যাথলেটিক ক্লাব যদি হতো, তা হলে ফুটবল ম্যাচের বদলে অ্যাথলেটিক কম্পিটিশন করলে আমরা নির্ঘাৎ জিতে যেতাম।’
