”কে বলল তোমায়?”
”কে আবার আমায় বলবে, শুনছিলুম বলাবলি হচ্ছিল।”
”ওহ।” তারপর জ্যোতি বলল, ”আমি কিছু খাব না। আর কাল বাড়ি যাব? ক’দিন মেসে থাকব না।”
দুটো ম্যাচ বসে যাওয়া মানে এক সপ্তাহ। কি হবে এখানে বাস করে! বাড়িতে অতদিন থাকাটাও বিরক্তির, একঘেয়ে। বরং গোবরডাঙ্গায় বিকাশের বাড়িতে গিয়ে ক’টা দিন কাটিয়ে এলে হয়! ওদের বাগানের ল্যাংড়া আমের স্বাদ সহজে ভোলা যায় না। কিন্তু মুশকিল একটাই, বিকাশের লেখার বাতিকটা। সে নানান ম্যাগাজিনে এক সময় তাকে নিয়ে লিখেছিল ‘নতুন তাজা আদর্শ ও রোমাঞ্চের খোঁজে ব্যস্ত আধুনিক যুবমানসের প্রতিভূ জ্যোতি বিশ্বাস।’ যে নাকি ‘তার প্রজন্মের স্বপ্নকে রূপায়িত করছে তার খেলার মধ্য দিয়ে।’
অন্ধকার ঘরে বিছানায় এপাশ—ওপাশ করতে করতে জ্যোতির চোখের সামনে ভেসে উঠছে গ্যালারিতে এবং সরু পথটায় দেখা মুখগুলো। কি তীব্র ঘৃণা! এমন ঘৃণার সামনে সে জীবনে কখনো পড়েনি। এ সবই তৈরি হয়েছে তার ক্রমান্বয় ব্যর্থতাকে কেন্দ্র করেই। বছর বছর প্রতিটি ম্যাচেই তাকে ভাল খেলতে হবে, গোল করতে হবে, এই ওদের ইচ্ছা বা দাবী। গাধা! নির্বোধদের খুশিতে ডগমগ করে রাখার জন্যই কি সে ফুটবল খেলছে?
কিন্তু একটা সময় গেছে যখন সে ক্লাব অনুগামীদের খুশি করেছে প্রতি ম্যাচে। তখন সে ভাবেওনি, যেদিন তা পারবে না সেদিন কি করবে?
বিকাশ একবার রেডিওর ‘যুববাণী’ প্রোগ্রামে তার ইণ্টারভিউ নিয়েছিল। প্রশ্ন করেছিল, ‘যদি আপনি ফুটবল খেলোয়াড় না হতেন তা হলে কি করতেন?’ সঙ্গে সঙ্গে সে জবাব দিয়েছিল, ‘কিছু না’। ‘কিছু না’? ‘যদি ফুটবল না খেলতাম তা হলে অন্য কিছু করবার ইচ্ছাই আমার হত না।’
এখন তার মনে হচ্ছে একমাত্র টাকা পাওয়া ছাড়া ফুটবল থেকে সে কিছুই পায়নি। নিজেকে তার পরিপূর্ণ ভরাট মনে হচ্ছে না। গভীর আনন্দ জীবনের পাত্রটি থেকে উপচে পড়ছে বা হৃদয়ের অন্তস্থলে আশ্রয় নেবার মত প্রশান্তির কোন ছায়া, কিছুই তার চোখে পড়ছে না। রাস্তার একটা মাস্তানের যে মর্যাদা, তার বেশি আর কিছু নিজেকে সে দিতে পারছে না।
বিপিন স্যারের যে কথাগুলো স্মৃতি থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা অহরহ সে করে, ঘুরে ঘুরে সেগুলো তাকে মাকড়সার জালের মত ঘিরে নেয়।
‘তোমার সাধনার দ্বারা তুমি কি মানুষকে ভালবাসার পথে, মঙ্গলের পথে নিয়ে যেতে পেরেছ?’
যে মুখগুলো আজ বিকেলে ঘৃণায় দুমড়ে মুচড়ে গেছল সেগুলো কার সৃষ্টি? স্যারকে চ্যালেঞ্জের ভঙ্গিতে সেদিন বলেছিল, ‘যদি মাঠে যান তা হলে দেখতে পাবেন।’ কি দেখতে পাবেন? তাঁর ছাত্র, মানুষদের কতখানি শান্তি, সম্প্রীতি, স্পোর্টসম্যানশিপের স্তরে তুলে দিয়েছে?
.
পরদিন সকালে প্রভাত সংবাদের খেলার পাতায় প্রথমেই দু লাইন, তিন কলাম হেডিংটায় জ্যোতির চোখ আটকে গেল। ‘মাঠের ভিতরে লাল কার্ড, মাঠের বাইরে রক্তচক্ষু দেখলেন জ্যোতি।’
এরপর স্টাফ রিপোর্টার শুরু করেছে—”সারথির একদা নামী ও দামী স্ট্রাইকার বর্তমানে মিড ফিল্ডার জ্যোতি বিশ্বাস মঙ্গলবার দমদম একতার লেফট ব্যাক সুব্রত বসুকে বিশ্রিভাবে লাথি মারায় তাতে লাল কার্ড দেখান। মরশুমের শুরু থেকেই ব্যর্থ জ্যোতি যখন মাঠ থেকে বেরিয়ে আসছেন তখন কিছু সদ্যস্যের হাতে তিনি লাঞ্ছিত হন। খেলার পর ড্রেসিং রুমে কোচ সাধন নাথের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় একসময় প্রায় হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কিন্তু সাধন নাথ তা অস্বীকার করে বলেন, ‘জ্যোতি এখনো সারথির অ্যাসেট, সব খেলোয়াড়ের জীবনেই ফর্ম হারানোর একটা পালা আসে। মনে হয় ও নিয়মিত প্র্যাকটিস করে ফর্মে ফিরে আসবে।’ কিন্তু ক্লাবের এক কর্মকর্তা (নামপ্রকাশে বারণ করেছেন) বললেন, জ্যোতি প্রথম থেকেই সাধন নাথের সঙ্গে অসহযোগিতা করে আসছে। প্র্যাকটিসে সিরিয়াস নয়। তাকে মিড ফিল্ডে খেলানোর জন্য সে কোচের বিরোধিতা করে যাচ্ছে এবং কোচকে ভুল প্রমাণের জন্য নিজের খেলা খেলছে না। ক্লাব কমিটি জ্যোতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার কথা ভাবছে।’
”বেশি রাতে সারথির মেসে জ্যোতির সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। সে মাঠ থেকে তখনো ফেরেনি। তবে কয়েকজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, টিমের কেউই তার খেলা সম্পর্কে আর ভরসা রাখেন না। একজন তো বললেনই, ‘টাকা দিয়ে সাদা হাতি পোষা হচ্ছে। জ্যোতি বিশ্বাস আগের খেলা ভুলে গেছে। এখন হাত পা ছুঁড়ে মাঠে ভয় দেখায়। সারথির পয়েণ্টগুলো তো অপোনেণ্ট নেয়নি, নিয়েছে জ্যোতি।’ আর একজন বললেন, ‘এতকাল ওকে যারা মাথায় তুলে নেচে এসেছে এখন তাদের ভুল ভাঙছে। ফুটবল একজনের খেলা নয়।’ গোটা সারথি শিবিরই এখন জ্যোতি সম্পর্কে হতাশ এবং সমর্থকরাও।”
এরপর রয়েছে ড্রেসিং রুমে তার সঙ্গে সাধন নাথের কথাবার্তার প্রায় নিখুঁত বিবরণ। এমনভাবে সাজিয়ে লেখা হয়েছে যাতে জ্যোতিকে উদ্ধত ও অবাধ্য বলে মনে হয়। সাফল্যের জন্য সাধন নাথের চেষ্টা যে কত আন্তরিক এবং তা বানচাল করার জন্য জ্যোতির তরফে যে আগ্রহ রয়েছে সেটাও চাপাভাবে বিবরণ থেকে ফুটে উঠেছে।
ঘুলিয়ে উঠল জ্যোতির শরীর। আস্তাকুঁড়ের এঁটোকাটা যেন এতক্ষণ সে চিবোচ্ছিল। কাগজটা হাত থেকে পড়ে গেল মেঝেয়। তোলার চেষ্টা করল না। ‘কয়েকজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে কথা বলে’! রঞ্জন কাদের সঙ্গে কথা বলেছে সেটা খোঁজ করে বার করে ফেলা যায়। কিন্তু জেনে কি লাভ হবে? এ ধরনের বলাবলি ইদানীং অনেকেই করে, তার কানেও আসে। অগ্রাহ্য করেছে। এই রিপোর্টও অগ্রাহ্য করবে কিন্তু সারথির হাজার হাজার পাগল সাপোর্টাররা কি এসব অগ্রাহ্য করবে? ছাপার অক্ষরে মিথ্যা কথা বেরোতে পারে না, এটাই তো ওরা বিশ্বাস করে!
