”রেফারি কিছু অন্যায় করেনি তোমাকে বার করে দিয়ে।”
”আপনি কার পক্ষ নিচ্ছেন?”
”ঠিক এই প্রশ্নটা আমিও তোমায় করছি। তোমাকে নীচে থেকে খেলতে বলেছি তুমি কেন উপরে উঠে গেলে?”
”খেলা আমাকে যেখানে নিয়ে গেছে সেখানেই গেছি।”
”শৈবাল তোমাকে মিড ফিল্ডে থাকতে বলেছিল। তুমি তা অগ্রাহ্য করেছ। আমি দেখেছি ও তোমাকে বলছিল। একলাইনে দুই ইনসাইড চলেছে, একে অপরের সঙ্গে জড়ামড়ি করছে। এ সবই হয়েছে তোমার জন্য।”
”আমি তো বলেই ছিলাম চেষ্টা করব।”
”কিন্তু তা কি করেছ? কি মহৎ ইচ্ছা—চেষ্টা করব। কতক্ষণের জন্য? বড়জোর দশ মিনিট।”
”এভাবে খেলা সম্ভব নয়।”
”এভাবে নয়, বল তোমার দ্বারা সম্ভব নয়। তুমি পারছ না, পার না। তুমি চাও না। তুমি এমন ভাবে খেলাটা তৈরি করতে চাও যাতে ওপরে উঠে খেলতে পার। কিন্তু জেনে রাখ, সেভাবে আমি খেলাতে রাজি নই। কয়েকটা ম্যাচ তো দেখলাম, তা থেকেই বুঝতে পারছি তোমার মনের মধ্যে কি জিনিস কাজ করছে। হয় তোমার ইচ্ছামত খেলা হোক, নয়তো খেলবেই না।”
”আমার ইচ্ছা যা ছিল তা মরে গেছে।”
”তুমি একটা কোচকে হয়তো ম্যানেজ করেছ কিন্তু আমাকে ম্যানেজ করতে পারবে না। আগে কি ভাবে পার পেয়েছ জানি না, কিন্তু আমার কাছে কোন জারিজুরি চলবে না। আমার মত করে খেলতে হবে নয়তো একদমই নয়।”
”আপনি কি থ্রেট করছেন?”
”যদি তাই মনে কর, তা হলে তাই।”
”কিসের থ্রেট, বসিয়ে দেবেন?”
সাধন নাথ কটমটিয়ে কয়েক সেকেণ্ড তাকিয়ে থেকে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। জ্যোতি তাকিয়ে দেখল হলঘরে রঞ্জন ও কয়েকজন রিপোর্টার দাঁড়িয়ে।
তার অরবিন্দ মজুমদারকে মনে পড়ল। যদি তিনি এখন থাকতেন! যে—কোন অসুবিধায় বা বিপদে তার কাছে অনায়াসে যাওয়া যেত, কথা বলা যেত মন খুলে। উনি প্লেয়ারদেরই লোক ছিলেন। কখনো বেদীর উপর থেকে নীচের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন না। সমানে সমানে ছিল ব্যবহার। মন দিয়ে যেভাবে সমস্যার কথা শুনতেন তাতেই ভরসা পাওয়া যেত, স্বস্তি আসত।
অরবিন্দ মজুমদারই সারথিকে ছুটিয়ে টেনে নিয়ে গেছলেন। একজন কোচের পক্ষে যতটা একটা ক্লাবকে তোলা যায়, তা তিনি তুলেছিলেন। এখনো মেম্বাররা অরবিন্দর সফল দিনগুলোর কথা বলে। জ্যোতি আসার কয়েক বছর আগের দিনগুলোকে আজও বলে ‘সারথির সোনালী দিন।’ ওরা চায় সেই আমলের পুনরাবৃত্তি অবিরত হোক। কিন্তু তাই কি কখনো হয়।
অরবিন্দ মজুমদার চলে গেলেও সারথির ভাবমূর্তি এখনো অবিকৃত রয়েছে। এটা ওঁরই তৈরি করা। লিগে প্রথম চারটি দলের মধ্যে সারথিকে দশ বছর ধরে রেখে গেছেন। ‘দৃষ্টিটা সব সময় উপর দিকে নিবদ্ধ রাখবে’ এটাই ছিল তাঁর কথা। প্লেয়ারদের ওপর আস্থা রাখতেন, যথোপযুক্ত শ্রদ্ধাও দিতেন। তাঁর ব্যক্তিগত পরশ থাকত সব কিছুতেই। খবরের কাগজের লোকেদের সঙ্গে কেউ কথা বললে আপত্তি করতেন না। বিশ্বাস করতেন তাঁর খেলোয়াড়রা এমন কিছু বলবে না বা করবে না যাতে ক্লাবের সম্মান নষ্ট হয়।
জ্যোতি ভেবে অবাক হল সাধন নাথ অরবিন্দ মজুমদারের মধ্যে পার্থক্য আকাশ থেকে পাতালের অথচ ফুটবল জগতে দুজনের জায়গা একই স্তরে হল কি করে?
যদি বুঝতাম এই রকম দশায় পড়তে হবে তা হলে ট্রান্সফার নিতাম। জ্যোতি টেণ্ট থেকে বেরোবার সময়ও চিন্তা করে যাচ্ছিল। পিছনের দরজায় সিঁড়ির পাশে তার মোটরবাইকটা থাকে। বাইরে থেকে দেখা যায় না। এখন ঘুষি মারছে, থুথু ছিটোচ্ছে, খিস্তি করছে, কোনদিন হয়তো বাইকটাকে ওরা জ্বালিয়ে দেবে।
কিন্তু সাধন নাথ ড্রেসিং রুমে সবার সামনে এভাবে তার সঙ্গে ঝগড়া করল কেন? কথাগুলো তো আলাদা ডেকে নিয়ে বলা যেত। নাকি বাইরে দাঁড়ান রিপোর্টারদের কাছে যাতে ঝগড়ার কথাটা পৌঁছে যায় সেইজন্য ইচ্ছে করেই সে ঝগড়াটা ঘটাল! এসব খবর পৌঁছে দেবার লোক তো প্লেয়ারদের মধ্যেই আছে। এরপর সাধন নাথ কাগজের লোকেদের কাছে বলতে শুরু করবে, জ্যোতি তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নিয়ে কাজ করছে, জনসাধারণের কাছে ক্লাবকে হেয় করছে। জ্যোতির মনে হচ্ছে, তাকে খুঁচিয়ে উত্ত্যক্ত করে, তার মুখ দিয়ে কথা বার করিয়ে আসলে মেম্বার—সাপোর্টারদের তার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়াই বোধহয় সাধন নাথের উদ্দেশ্য।
যার তাঁবুর বাইরে, রেলিংয়ের ওপার থেকে চিৎকার করে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিল তারা চলে গেছে। রাস্তার আলো জ্বলে উঠেছে। ময়দানে বেড়াতে—আসা নর—নারীর ভিড় জমছে। বিকেলের ক্ষিপ্ত, উত্তপ্ত ময়দানের মন্থর প্রশান্তি এবার নেমে আসছে। বাইক ঘুরিয়ে নিয়ে জ্যোতি গঙ্গার দিকে রওনা হল। ভিড় ট্র্যাফিকের মধ্য দিয়ে এখনি মেসে ফেরার ইচ্ছে তার নেই। মাথাটা জুড়িয়ে নেওয়া দরকার। এখন যদি অরবিন্দদা থাকতেন।
সে এলোমেলো কিছুক্ষণ ঘুরল। বাইক থামিয়ে খুব ঝাল দেওয়া আলুচাট খেল। একটু পরে চারটে এগরোল ও দু কাপ আইসক্রীম। ঘণ্টা দুই পর মেসে ফিরে সূর্যর কাছে শুনল খবরের কাগজের লোক তার জন্য ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করেছিল। জবেদ আর অজিতের সঙ্গে গল্প করে দুটো ডবল ডিমের মামলেট খেয়ে গেছে।
”আজ নাকি অনেক কাণ্ড হয়েছে মাঠ, তোমার সঙ্গে নাকি কোচের ফাটাফাটি হয়ে গেছে!” সূর্য বলল।
জ্যোতি সচকিত হল। আজকের ব্যাপারগুলো নিয়ে নানান ধরনের রটনা যে হবে, তা সে অনুমান করছে। মাঠ থেকে বেরিয়ে আসার সময় তার অপমান ও হেনস্থায় প্লেয়ারদের মধ্যে অনেকেই যে খুশি হয়েছে, সেটা বুঝে নিতে জ্যোতিষী জানার দরকার হয় না।
