যন্ত্রণায় অধীর হয়ে জ্যোতি বাঁ পা চালাল লেফট ব্যাকের পায়ের নিষ্পেষণ থেকে মুক্তি পেতে। লাথিটা লাগল তার ডান হাঁটুতে। ”বাবা রে” বলে লেফট ব্যাক হাঁটু ধরে ঘুরে পড়ল।
কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটল। রেফারি প্রায় পনেরো গজ দূরে। পকেট থেকে লাল কার্ড বার করতে করতে তিনি ছুটে এলেন। কার্ডটা সদর্পে মাথার উপর তুললেন জ্যোতির সামনে দাঁড়িয়ে। সারথির খেলোয়াড়রা ছুটে এসে তাকে ঘিরে ধরল। আবেদন, নিবেদন, চোরা খিস্তি, সামান্য ধাক্কা, সব কিছুই রেফারি অগ্রাহ্য করলেন।
”জ্যোতিকেই কিন্তু আগে ফাউল করা হয়েছিল, সেটা তো আপনি…” বাচ্চচু প্রতিবাদ করে। তাকে থামিয়ে রেফারি তর্জন করে ওঠেন, ”তুমিও কি বাইরে যেতে চাও? এইসব বন্ধ করে এক্ষুনি যদি শুরু না কর তা হলে ম্যাচ অ্যাবানডণ্ড করে দেব।”
মাঠভরা লোকের চোখের সামনে, জ্যোতি মন্থর পায়ে বেরিয়ে আসছে। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন শূন্যে টানা দড়ির ওপর দিয়ে চলা। দর্শকরা শুধু তাকেই এখন দেখছে। জীবনে এই প্রথম তাকে মাঠ থেকে বার করে দেওয়া হল।
ফেন্সিং দরজা পেরিয়ে আসতেই তার চোখ ও কানের ক্ষমতা আবার চালু হয়ে উঠল। সে দেখল গ্যালারির মাঝ দিয়ে তাঁবুতে যাবার সরু পথে ক্রুদ্ধ জটলা। অশ্রাব্য গালিগালাজ উড়ে আসছে।
”এটাকে আর নামায় কেন সাধন নাথ! শেষ হয়ে গেছে তো!”
”নামে কাটছে শালা, একসময় খেলেছে, তাই বলে কি চিরকাল চলবে?”
”ব্যাটা পলিটিক্স করছে। ইচ্ছে করে ডোবাচ্ছে। অরবিন্দ মজুমদারের দলের লোক তো, তাই সাধন নাথকে অপদস্থ করে তাড়াবার জন্য প্ল্যান করে এইসব হচ্ছে।”
”খানকির বাচ্চচাটাকে ওই অরবিন্দর সঙ্গেই বিদায় করা উচিত ছিল…ভাবতে পারেন আটটা ম্যাচে এগারো পয়েণ্ট!”
”এ বছরও আর চ্যাম্পিয়ন হবার আশা রইল না।”
জ্যোতি জটলায় বাধা পেল।
”এই যে শুওরের বাচ্চচা, দুটো ম্যাচ বিশ্রাম নেবার ব্যবস্থা করে এলে!”
জ্যোতির মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। কতবার ভক্তদের কাঁধে চড়ে সে এই পথ দিয়েই তাঁবুতে ফিরেছে।
কতবার এই পথেই জড়িয়ে ধরার জন্য ভক্তরা কাড়াকাড়ি করত তার পা নিয়ে।
‘সারথির সারথি…সারথির সারথি…’
দূর থেকে মেঘ গর্জনের মত গড়িয়ে আসত শব্দগুলো। গ্যালারির দিকে তাকিয়ে সে দু হাত মাথার উপর তুলে নাড়ত।
কবেকার কথা?
”বাঞ্চোৎ পলিটিক্স এবার বন্ধ কর, নইলে জ্যান্ত চামড়া তুলে নেব।”
থরথর করে উঠল তার সারা শরীর। জটলা ভেদ করে শ্রান্ত নিজেকে ঠেলে নিয়ে যাবার সময় জ্যোতি পিঠে, পাঁজরে তীক্ষ্ন যন্ত্রণা পেল। মাথায় থাপ্পড়ের আঘাতটা গরম শিকের মত তার স্নায়ুকেন্দ্রে ঢুকে তাকে এলোমেলো বিপর্যস্ত করে দিল।
জ্যোতি টলতে টলতে নির্জন ড্রেসিং রুমে এসে বেঞ্চে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। অক্ষম নির্দয় ক্রোধ তাকে অবশ করে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সে গোঙানির মত একটা শব্দ করে বেঞ্চে মাথা ঠুকতে শুরু করল।
জ্যোতির খুবই পরিচিত একটা আওয়াজ একসময় ড্রেসিং রুমে আছড়ে পড়ল। গোল হল। আওয়াজের বহর থেকে সে বুঝল সারথি গোল করেছে। কিন্তু বিন্দুমাত্র উল্লাস তার মনে জাগল না।
ওরা ফিরে এল। ড্রেসিং রুম মুখর হয়ে উঠল। গোল দিয়েছে শৈবাল। বেঞ্চের একধারে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে জ্যোতি বসে ছিল। শৈবালের হাতটা ধরে সে ঝাঁকুনি দিল। কথা বলল না।
খবরের কাগজের তিন—চারজন লোক ঘরে ঢুকে পড়েছে। তাদের মধ্যে রঞ্জনও আছে।
”জ্যোতি, এই কি প্রথম রেড কার্ড দেখলি?” রঞ্জন জানতে চাইল।
”হ্যাঁ।”
”আরে এইটাই তো কালকের খবর।”
”কি রকম লাগল আপনার যখন কার্ডটা দেখাল।” অল্পবয়সী একজন প্রশ্ন করল।
”তোমাকে দেখালে কি রকম লাগত?”
”রেফারি কি বলল তোমাকে জ্যোতি?”
”বলল গায়ে বড় গন্ধ যাও চান করে এস।”
”অ্যাঁ!”
”বলল চান করে এস।”
”তুমি কি বললে?”
”বললাম, আসুন গায়ে সাবান ঘষে দেবেন।”
রিপোর্টাররা হেসে উঠল।
”রেফারিং সম্পর্কে তোর কোন বক্তব্য আছে?” রঞ্জন প্রশ্ন করল।
”আছে, কিন্তু তা ছাপা যাবে না।”
”বলেই দ্যাখ, ছাপা হয় কি না হয়।”
”মানহানির মামলায় পড়তে চাই না।”
”কি ব্যাপার, এখানে এত ভিড় কিসের। যান, যান, এখন সব যান।”
সাধন নাথ ঢুকল। চোখে—মুখে বিরক্তি।
”আপনারা এখানে কেন? জ্যোতি, একটা কথাও রিপোর্টারদের বলবে না।”
প্রায় ঠেলেই ওদের বার করে দিয়ে সাধন নাথ দরজা বন্ধ করে দিল।
”আমি কিছুই বলিনি।”
”ভাল, কিছু বলে আর কাজ নেই, এমনিতেই তো যথেষ্ট ক্ষতি করেছ।”
”আমি কি ক্ষতি করলাম? কি করেছি আমি?”
সাধন নাথ অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে বলল, ”তুমি কি জান, কি বলছ? কি করেছি আমি? মাঠ থেকে বার করে এনেছ নিজেকে, এটাই তুমি করেছ। নিজেরই মর্যাদা লুটোওনি, ক্লাবেরও মাথা হেঁট করেছ। ভাল কথা, তবে এটাও জেনে রাখ ব্যাপারটা খুব খারাপ হল।”
”আপনি তো দেখেছেন, কিভাবে বল ছেড়ে পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে রইল।”
”হ্যাঁ দেখেছি, কিন্তু তুমি কি লাথি চালাওনি?”
”আমি নিজেকে বাঁচাতে চেয়েছি। আমাকে পঙ্গু করে ফেলতে চেষ্টা করেছিল।”
”রেফারি তা হলে ওকে কার্ড দেখাল না কেন?”
”আমি তার কি জানি হয়তো টাকা খেয়েছে।”
”হয়তো তুমি রিট্যালিয়েশন আইনটা জান না।”
”অমন ঝাড় খেলে আপনি তখন কি করতেন?”
ঘরের সবাই চুপচাপ। দুজনের কথা কাটাকাটিতে ওদের মাথা গলাবার কোন ইচ্ছাই কারুর নেই। কেউ কেউ ফিসফিসিয়ে দু—চারটে কথা নিজেদের মধ্যে বলল। কারুর মুখে বিস্ময়, কারুর চোখে মজা।
