এইভাবে আরো মিনিট পনের সাধন নাথ কথা বলে গেল। জ্যোতি একটি প্রশ্নও তোলেনি। শুধু মনে মনে বলল, ডেসিং রুমে কথা বলেই যদি ম্যাচ জেতা যায় তা হলে সারথি এবার অবধারিত লিগ চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে।
.
।।দশ।।
প্রথম আটটি ম্যাচে সারথি পাঁচ পয়েণ্ট নষ্ট করল তিনটি ড্র ও ইস্টবেঙ্গলের কাছে এক গোলে হেরে। তাঁবু রক্ষার জন্য এখন পুলিস পাহারা থাকছে খেলার পর। তবে এখনো ইঁটপাটকেল ছোঁড়া শুরু হয়নি। শুধু খেলার পর বাপ—মা—তোলা অশ্রাব্য গালাগালির মধ্য দিয়ে সারথির খেলোয়াড়দের মাঠ থেকে তাঁবুতে ফিরতে হয়। গত ম্যাচে তাঁবুতে ফেরার সময় জ্যোতির মুখে থুথু দিয়েছিল একজন গ্যালারি থেকে। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে লোকটির পাঁজরে ঘুঁষি মারে। তখন কয়েকজন জ্যোতিকে মারার চেষ্টা করেছিল। ব্যাপারটা অনেক দূর গড়াত যদি না গৌতম ও শৈবাল তাকে টেনে তাঁবুতে আনত।
পরের ম্যাচ বান্ধব সমিতির সঙ্গে। কিক অফের সময় জ্যোতি দাঁড়াল বাচ্চচুর পিছনে। সমিতির সেন্টার ফরোয়ার্ড কিক অফ করে বল দিল তার ইনসাইড লেফটকে, সে পিছনে ঠেলে দিতেই অভ্যাসমত জ্যোতি পাসটা ধরার জন্য বাচ্চচুর সামনে এগিয়ে ছুটল। তারপরই মনে পড়ল, তার পিছিয়ে থাকার কথা। সঙ্গে সঙ্গে সে পিছিয়ে এল।
পাঁচ মিনিট পর সে প্রথম বল স্পর্শ করল। সারথির হাফলাইনের মাঝখান থেকে বলটা যখন এল সে তখন চোখের কোণ থেকে দেখে নিয়েছে শৈবাল, বাচ্চচু, এবং সত্যমূর্তির সঙ্গে সমিতির ডিফেণ্ডাররা সেঁটে রয়েছে। সমিতির এক ডিফেণ্ডার বল কাড়ার জন্য তার দিকে এগিয়ে আসছে দেখে জ্যোতি ট্যাকল এড়িয়ে বল নিয়ে ছুট দিল।
পেনাল্টি এলাকার কিনারে তিনজন ডিফেণ্ডার তার অপেক্ষায় পথ আটকে রয়েছে। জটলা এড়াতে, প্রকৃষ্ট উপায় লেফট উইংকে হাই লব করে বল দেওয়া।
”ব্যাকপাস।” জ্যোতি তার পিছনে শৈবালের চিৎকার শুনেই ব্যাক হিল করল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পিছন থেকে প্রচণ্ড জোরে নেওয়া শটটা তার ডান কাঁধে লাগল এবং সে মুখ থুবড়ে পড়ল।
”নীচু হবি তো?” তাকে হাত ধরে টেনে তুলে শৈবাল বলল।
”ওখান থেকে কি শট নেয়?” রেগে জ্যোতি বলল।
”সোজা বলটা গোলে যেত যদি তুই মাথাটা ঝোঁকাতিস। গোলি বল দেখারই সময় পেত না।”
হাফ টাইমে সাধন নাথ তাকে বলল, ”বলটা যদি প্রথমেই শৈবালকে দিয়ে দিতে তা হলে এখন এক গোলে এগিয়ে থাকতাম। তুমি অত উঠে খেলছ আবার?”
”ওকে মার্ক করে ছিল, তাই ডিফেন্সকে সরাবার চেষ্টা করেছিলাম।”
”শৈবালকে পিছনে রেখে দিয়েছিলে বলেই গাধার মত ব্যাকপাসটা করতে হল।”
”ও বল চাইল।”
”চাইবে না তো কি করবে? যা খেলছ, সেটা কি ফুটবল ম্যাচ না দাড়িয়া—বান্ধা? এবার একটু বুদ্ধি খরচ করে খেল।”
”আমিই কি শুধু বুদ্ধি খরচ করব?”
”ম্যাচ উইনার তুমিই।”
দ্বিতীয়ার্ধে জ্যোতি যতই পিছিয়ে খেলার চেষ্টা করুক না কেন চুম্বকের আকর্ষণের মত সে এগিয়ে যাচ্ছিল গোলের দিকে। রথীন সাইডলাইনে হাত তুলে লাফাচ্ছে তাকে পিছিয়ে যাবার জন্য। অবশেষে খেলা থামিয়ে রেফারি তার কাছে গিয়ে জানিয়ে এল, আর একবার এমন করতে দেখলে ফেন্সিংয়ের ওধারে তাকে পাঠিয়ে দেবেন।
মিড ফিল্ডে তার কাছ থেকে বল ছাড়া খেলার এবং আক্রমণে তার কোন ভূমিকা নেই এমন আক্রমণ গড়ে তোলার প্রত্যাশা জ্যোতির কাছে করাটাই অবাস্তব ব্যাপার। এটা তার স্টাইল নয়। নেমে গিয়ে এবার খেলা উচিত, এই রকম চিন্তা যখন সে নিজে করে তখনই সে পিছিয়ে এসে খেলতে পারে, নয়তো অন্যের নির্দেশে বাধ্য হয়ে খেলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। ভেবে—চিন্তে কাজ ঠিক করে নিয়ে সেটা করা তার দ্বারা হয়ে ওঠে না। অনুভূতির উপর দ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠতে না পারলেই সে গোলমালে পড়ে যায়। পথভ্রষ্টের মত তখন সে নির্দেশের মুখাপেক্ষী হয়।
ডিফেণ্ডার ও অ্যাটাকারের মধ্যবর্তী স্থানই মিড ফিল্ড খেলোয়াড়ের, তার মধ্যে উভয়েরই সম্মেলন, কোনটিতেই পুরোপুরি এককভাবে নয়। জ্যোতি বরাবরই অ্যাটাকার, তার পক্ষে ডিফেণ্ডার হওয়া অসম্ভব, আবার একই সঙ্গে উভয় ভূমিকা পালনেও সে অপরাগ।
সাধন নাথ তাকে এমন জোরে উল্টো দিকে টেনে দিয়েছে যার ফলে তার খেলাটাই ছিঁড়ে গেছে।
”আমি ওপরে উঠছি” শৈবালকে সে বলল, ”বাচ্চচুকে নামিয়ে নাও।”
”সাধনদা যা বলেছে তাই কর।” শৈবাল খিঁচিয়ে উঠল।
”আমি খেলতেই পারছি না, এখন গোল দরকার।”
”ভাল করে বল বাড়া।”
”তুমি কি করছ, দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া?”
”সেটা তোর দেখার কথা নয়।”
সাধন নাথ কি ভাববে, তার পরোয়া না করেই মিড ফিল্ডারের কাজ ফেলে দিয়ে জ্যোতি উপরে উঠে গেল।
একতার লেফট ব্যাকের ঘাড়ে অনেক বোঝা, খেলার শেষ দিকে বোঝাটা আরো বাড়ুক এটা তার অভিপ্রেত নয়। জ্যোতি মিড ফিল্ডে থাকায় সে স্বস্তিতে ছিল। এখন তাকে উঠে আসতে দেখে তার মনে হল সারথি এবার আক্রমণ জোরদার করার মতলব নিয়েছে। খেলায় এখনো একটাও গোল হয়নি। জ্যোতিকে অকেজো করার জন্য কিছু একটা না করলে একতা গোল খেয়ে যেতে পারে।
সুযোগ এল। রেফারি তখন অন্য দিকে তাকিয়ে। জ্যোতি একটা ছুটকো বলের দিকে দৌড় শুরু করেছে। লেফট ব্যাক কুড়ুলের মত জ্যোতির পায়ে লাথি কষাল। পড়ে গিয়েও যন্ত্রণা অগ্রাহ্য করে জ্যোতি লাফিয়ে উঠল, ছুটে গিয়ে বলটা ধরল। তার এই কাণ্ডে বিভ্রান্ত লেফট ব্যাক হুড়মুড়িয়ে জ্যোতির ঘাড়ে পড়ল। এবং তার ডান পা বুট দিয়ে ইচ্ছে করেই মাড়াল।
