”কি জন্য?”
”বলতে পারব না।” রথীন গাম্ভীর্য রক্ষায় ব্যস্ত রইল। সাধন নাথ এসে তার চাকরিটা খায়নি, এ জন্য সে তার প্রতি কৃতজ্ঞ।
এই প্রথম সে সাধন নাথের সঙ্গে একা মুখোমুখি হল। এর আগে ড্রেসিং রুমে অন্য সবার সঙ্গে আরো বেশি ওয়ার্ক রেটের প্রয়োজন সম্পর্কে কথাবার্তা ছাড়া আর তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি।
সাধন নাথের ঘরে, যেটা আগে অরবিন্দ মজুমদারের ঘর ছিল, পা দেওয়ামাত্রই, ”কেমন লাগছে তোমার, এখানে?” এমন প্রশ্নের সামনে জ্যোতি পড়ল।
”লাগছে কেমন?” সাধন নাথ আবার বলল।
”আমার তো এখানে সাত বছর হয়ে গেল!”
”আমি যা জিজ্ঞাসা করলাম তার উত্তর দাও।”
”বুঝলাম না।”
”সহজ সরল প্রশ্ন। সাত বছর বলতে কি বোঝাচ্ছ?”
”সোজা স্পোর্টিং ইউনিয়ন থেকে।”
”তুমি অতীতের কথা বলছ আর আমি বর্তমান নিয়ে। কতদিন সারথিতে আছ বা অতীতে কি করেছ তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। এখানে আমি যেদিন শুরু করব, সেদিন অন্যদেরও শুরু বলে আমি ধরে নেব। সবাইকেই আমি খুঁটিয়ে দেখলাম, কে কি রকম তাও আমি জানি। একটা কথা প্রথমেই বলে রাখছি, টিমে কারুরই জায়গা বাঁধা নয়। অনেক ঢিলেঢালা জিনিস নজরে পড়েছে, অবশ্য যেভাবে টিম চালান হচ্ছিল তাই থেকেই এসব এসেছে। বৃহস্পতিবার টিম মিটিং, কিন্তু তার আগে তোমার সঙ্গে দু—চারটে কথা বলে নিতে চাই।”
জ্যোতি দাঁড়িয়ে আছে ডেস্কের সামনে। সাধন নাথ তাকে বসতে বলেনি, কথা বলার সময় মুখের দিকেও তাকায়নি। তার উপস্থিতির কোন গুরুত্বই সাধন দিতে চায়নি।
”আমি মিড ফিল্ডে তোমাকে খেলাব। অ্যাটাক আর মিড ফিল্ডের মধ্যে বড় একটা ফাঁক রয়ে গেছে। ওখানেই দেখেছি সারথির মুভগুলো ভেঙে যায়। ওপরে আরো পেনিট্রেশন চাই, কিন্তু সেটা হয় না যেহেতু মিড ফিল্ডে আরো বেশি স্কিমিং দরকার। এখানেই তোমাকে আমি চাই। অসিত চলে গেছে, বাচ্চচুকে আমি অ্যাটাকে আনব, তুমি তার পিছনে থেকে খেলবে, অ্যাটাক তৈরি করাবে, দরকার হলে নিজেও উঠবে।”
”তার মানে আমাকে আপনি হাফ—ব্যাক লাইনে খেলাতে চান?”
”মিড ফিল্ডে, উপর দিকে। এতে তুমি আরো স্কোপ পাবে।”
”আমি মিড ফিল্ডের প্লেয়ার নই।”
সাধন নাথ চোখ তুলে জ্যোতির মুখটা দেখে নিল। চশমাটা খুলে ডেস্কের উপর রেখে চেয়ারে অলস ভঙ্গিতে এলিয়ে পড়ল।
”তুমি সারথির প্লেয়ার, আর যেখানে তুমি সব থেকে কার্যকরী হবে বলে আমি মনে করব, সেখানেই তুমি খেলবে।”
”কিন্তু আমি তো স্ট্রাইকার।”
”তুমি টিমের একজন, আর আমি ঠিক করব টিম সাজানোর ব্যাপারটা।”
”স্ট্রাইকারের পিছনে থেকে কোনদিন খেলিনি, আমি আনকমফর্টেবল ফিল করব অনভ্যস্ত জায়গায়।”
”তা হলে তোমায় আনকমফর্টেবলই থাকতে হবে। এখন থেকে তোমার কাজটা কি হবে সেটাই তোমায় বলে দিলাম।”
”এভাবে আমি কখনো খেলিনি।”
”ওসব অতীতের কথা। কে কবে কী করেছে তাই নিয়ে আমি মাথাব্যথা করতে চাই না। সারথিতে যদি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে চাও, তা হলে যা বলেছি তাই করো। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?”
জ্যোতি বুঝল কথা বাড়িয়ে কোন লাভ হবে না। সাধন নাথ নানান আইডিয়া নিয়ে এসেছে, কিন্তু জ্যোতি জানে তার একটাও খাটবে না। এই ধরনের অদল—বদল আগেও করা হয়েছিল অরবিন্দদার আমলে, আবার বাতিলও করতে হয়েছে। সাধন নাথকেও কাঠ—খড় পুড়িয়ে শেষকালে তা জানতে হবে।
”বেশ, চেষ্টা করে দেখব।”
”চেষ্টা নয়, করতেই হবে।”
”আপনি যখন কোচ, তখন তো করতেই হবে।”
”সেটা মনে থাকে যেন।”
টিম মিটিংয়ে জনাম কুড়ি প্লেয়ার হাজির হয়। তার মধ্যে ছিল শৈবাল, বিপ্লব, পরিতোষ, যাদের আবার সারথিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। গৌতম গত দু বছর অধিনায়ক ছিল। সাধন নাথের পরামর্শে নতুন অধিনায়ক হয়েছে শৈবাল। গৌতম এতে খুশি নয়।
”সিজনের শুরুতে সিংহের মত গর্জন তুলে সিজনের শেষে ভেড়ার মত ব্যা ব্যা করা আমার স্বভাব নয়।” টিম মিটিংয়ে এই ভাবে শুরু করল সাধন নাথ। ”কোন সিদ্ধান্তে আসার আগে সব কিছু ওজন করে, মেপে নেওয়াই আমার রীতি। এতদিন প্র্যকটিসে যা দেখেছি তাতে এইটুকু বুঝলাম সব বিভাগেই শান পড়া দরকার, পালিস দরকার। ডিফেন্সে গলদ দেখা যাচ্ছে, অ্যাটাকেও কিছু পারছি না। এর সিক্রেটটা রয়েছে মিড ফিল্ডে। মিড ফিল্ডে দখল নাও তা হলে ম্যাচও দখলে পাবে। তোমাদের এক—দু’জনকে ইতিমধ্যেই বুঝিয়ে দিয়েছি কি আমি চাই। একজন মধ্যমণি কিংবা বলা যায় পিভট যাকে কেন্দ্র করে টিমটা ঘুরবে। এটা শৈবালের কাজ, তাই ওকে ক্যাপ্টেন করা হয়েছে। এর আগে গৌতম ক্যাপ্টেন ছিল। কিন্তু মাঠের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত চিৎকার করে গলা ব্যথা করা ছাড়া গোলকীপার ক্যাপ্টেনের পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। রেফারির হুইসল মত খেলবে আর খেলবে শৈবাল যেভাবে খেলাবে।”
জ্যোতি আড়চোখে দেখল গৌতম মুখ নীচু করে জুতোর ডগা দিয়ে মেঝেয় আঁচড় কাটছে আর শৈবাল ক্লাসের ফার্স্টবয়ের মত মনোযোগে সাধন নাথের কথাগুলো শুনছে।
”আর একটা কথা। লক্ষ্য করছি ক্রসফিল্ড পাস আমরা ভালমত কাজে লাগাচ্ছি না। আর একটা জিনিস, ডিফেন্সকে সাহায্য করতে ফরোয়ার্ডরা খুব কমই ফানেল করে নামছে। আমাদের একটা ছক তৈরি করতে হবে জোনাল ডিফেন্সের। আমার মতে, ডিফেন্স আর অ্যাটাক পরস্পরের পরিপূরক, এটা মিলে যায় একটা জায়গায়—মিড ফিল্ডে…”
