”আমি একবার যাব ভাবছি।”
”এখন যাসনি, আর একটু থিতোতে দে, স্বাভাবিক হতে দে লোকটাকে। ভীষণ আপসেট হয়ে গেছল, একবার তো বলেও ফেলেছিল সুইসাইড করবে। তবু ভাল ধারে—কাছে ভদ্দরলোকের বাস নেই যে খবরের কাগজ পড়ে ওকে উত্ত্যক্ত করবে। ধূ ধূ ক্ষেত, খাল, পুকুর, গাছ আর চাষাভুসো মানুষ, মনে হয় বাকি জীবন এদের নিয়ে ভালই কাটাতে পারবে। আমরা গিয়ে ওকে ডিস্টার্ব না করাই ভাল।”
বীয়ারের ছ’টা খালি বোতল দেয়ালের ধারে সাজিয়ে রাখা। নাণ্টু আর দুটো বোতল বার করে আনল ফ্রিজ থেকে।
”জ্যোতি, এ বছরটা সারথির পক্ষে খুবই ভাইটাল। নতুন কোচ আসছে, টিমও নতুন ভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। তোকে কিন্তু এ বছর খেলতে হবে…জান—মান লড়িয়ে খেলতে হবে।”
দাশুদা এক চুমুকে গ্লাস শেষ করে তাকিয়ে রইল। চকচক করছে চোখ। মুখটা ঈষৎ ফুলো, গলার স্বর একটু চড়া। ভিতর থেকে একটা উত্তেজনা বেরিয়ে আসার জন্য দাপাচ্ছে ওর চাহনিতে।
”কাগজে যা বেরিয়েছে, যতই প্রতিবাদ কর কেউ তোর কথা বিশ্বাস করবে না। সবাই বলবে, নিশ্চয় কিছু অন্তত বলেছে, নইলে অমনি কি লিখে দিল? টিমে যত ঝগড়াঝাটি, খেয়োখেয়ি সব তোকে কেন্দ্র করে। তোর জন্য টিম স্পিরিট নষ্ট হয়েছে।”
”বলছেন কি দাশুদা?” জ্যোতি গ্লাস নামিয়ে রাখল।
”ঠিকই বলছি। কিন্তু এসবের জন্য ক্লাব সাফার করেনি। তুই একাই খেলা দিয়ে সেটা পুষিয়ে দিতিস। কিন্তু এখন আর তা পারছিস না। ভাল প্লেয়ার আর আসছে না, তোকে খেলাবার মত যোগ্যতা এখন আর কারুর নেই। এইসব সাধারণ স্ট্যাণ্ডার্ডের প্লেয়ার দিয়েই এবার কাজ চালাতে হবে। তুই এদের মধ্যে মিস ফিট। তুই ফালতুর মত এখন মাঠে দাঁড়িয়ে থাকিস মাত্র। তোর খেলা এরা বোঝে না, একটা বল দিতে পারে না, তোর কাছ থেকে নিতেও পারে না। তোর দিন ঘনিয়ে এসেছে জ্যোতি। এখন ছ্যাকরা গাড়ির ঘোড়াদের আমল আসছে, এর মধ্যে রেসের ঘোড়া বেমানান, তাই নয় ক্ষতির কারণও।”
জ্যোতি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে দেখে দাশুদা আরো উত্তেজিত হয়ে পড়ল। খালি গ্লাসটায় বোতল উপুড় করে ভরে নিতে নিতে চিৎকার করল, ”নাণ্টু…পকৌড়া দে।” গ্লাস বেয়ে বীয়ারের ফেনা মেঝেয় পড়ছে। দাশুদা গ্লাসে চুমুক দিতেই ঠোঁটের উপর ফেনা আটকে গেল।
”যে টিমে ট্যালেণ্ট নেই সেই টিমকে অন্যভাবে কোচ করে খেলাতে হয়। স্কিলের ঘাটতি এনডিওরেন্স আর স্ট্যামিনা দিয়ে পোষাতে হয়। হ্যাঁ, ছক কেটে অঙ্কের মত করেই সারথি খেলবে, তাই সাধন নাথকে আনা। ওর কথা মত তোকে চলতে হবে, খেলতে হবে এবার থেকে। ইনডিভিজুয়াল প্লেয়ার, ব্রিলিয়ান্স এসব এখন ভুলে যা, টিমের স্বার্থে তোকে এবার অন্যভাবে, সবার সঙ্গে মানিয়ে খেলতে হবে। যদি খেলতে না পারিস তা হলে…।”
ঝনঝন করে গ্লাসটা ভেঙে গেল দেয়ালে লেগে। দাশুদা উঠে দাঁড়াল, ”মেসে ফিরে যেতে হবে না, এখানেই শুয়ে পড়। আমার ঘুম পাচ্ছে। গুড নাইট।”
দাশুদা বেরিয়ে গেল। একটু পরে নীচ থেকে গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার শব্দ এল। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত জ্যোতি বসে রইল। ‘তোর দিন ঘনিয়ে এসেছে জ্যোতি’ কথাগুলো তার মাথার মধ্যে ঘুরে ঘুরে বড় হয়ে উঠছে কর্কশ থেকে আরো বীভৎস কর্কশ হয়ে।
তার ভয় করছে। হয়তো অরবিন্দদার মতই বদনামের বোঝা মাথায় নিয়ে তাকে বিদায় নিতে হবে। তখন সে যাবে কোথায়? সারথির বাইরে কিছুই সে চেনে না, জানে না। ফুটবলের বাইরে জীবনটা কেমন তা সে কখনো খোঁজেনি। সোফায় হেলান দিয়ে মুখটা সিলিংয়ের দিকে তুলে জ্যোতি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।
.
কিছুদিন পর প্রভাত সংবাদে সাধন নাথের ছবিসহ সাক্ষাৎকার ছাপা হল। সারথির আঙিনায় বেঞ্চে বসা, চোখে পুরু ফ্রেমের চশমা, হাসি—খুশি মুখ, হাতের মুঠো ঘুঁসির মত পাকিয়ে তুলে ধরা। সতর্ক, মাপা কথাবার্তা। তার মূল বক্তব্য মোটামুটি এই রকম—সারথি সঙ্ঘের বিরাট ঐতিহ্য সম্পর্কে আমি সচেতন। আমি যথাসাধ্য করব, ক্ষমতায় যতটা কুলোয় আমি নিজেকে নিংড়ে দেব ক্লাবের সম্মান রক্ষার জন্য, ক্লাবকে আরো বড় সম্মান এনে দেবার জন্য। কিন্তু এ কাজ একার দ্বারা সম্ভব নয়। কোন কোচই তা পারে না। আমি নির্ভর করব প্লেয়ারদের টিম স্পিরিটের ওপর, কর্মকর্তাদের সহযোগিতার ওপর। মেম্বার—সাপোর্টারদের শুভেচ্ছাই হবে আমার প্রেরণা, সব কিছুর উপর আমি চাইব কঠিন পরিশ্রম। প্রপার ওয়ার্ক রেট ছাড়া কোন দলই সফল হতে পারে না, বিশেষত আজকের এই কম্পিটিশনের যুগে। যদি আমরা কঠিন পরিশ্রম করি, সবাই যদি নিজেকে উজাড় করে দিই, তা হলে আমাদের সাফল্য কেউ আটকাতে পারবে না।”
প্রশ্ন ছিল, টিমে কোন অদলবদল করবেন কি না। তাইতে সাধন নাথ, একটু হেসে বলেন, ”এই তো সবে এলাম। আগে আমায় ছেলেদের দেখতে বুঝতে দিন।”
”জ্যোতি বিশ্বাসকে কিভাবে খেলাবেন, কিছু ভেবেছেন কি?”
”কিভাবে খেলাব, মানে?”
”আপনি যে ধরনের মেথডিক্যাল ফুটবল চান, জ্যোতি তো সেরকম ভাবে খেলায় অভ্যস্ত নয়।”
”ক্লাবের স্বার্থে, টিমের স্বার্থে তা হলে তাকে খেলা বদলাতে হবে।” অতঃপর সাধন নাথ এই বিষয়ে আর আলোচনায় রাজি হলেন না।
.
।।নয়।।
সিজনের প্রথম দিন প্র্যাকটিসের সকালে ড্রেসিং রুমে জ্যোতি বুট পরছে তখন রথীন বলল, ”সাধনদা তোকে আগে একবার দেখা করতে বলেছেন।”
