”এখন আমি কাকে আবার যোগাড় করি।”
গোঁজ হয়ে রইল দাশুদা। জ্যোতি গ্লাস শেষ করে নাণ্টুর হাতে দিল ভরে দেবার জন্য। প্লেট থেকে চিকেন পকৌড়া তুলে মুখে দিল। কিছুক্ষণ পর দাশুদার চিন্তাবিকৃত মুখটা স্বাভাবিক হয়ে এল। চোখে—মুখে হালকা স্বাচ্ছন্দ্য ফুটে উঠল।
জ্যোতির বলতে ইচ্ছে করেছিল, গৌরী আর এই জীবনে ফিরে আসবে না, ওকে দিয়ে আর কোন কাজ তুমি করাতে পারবে না। সে নিজের একটা ব্যবস্থা করে নিয়েছে। কিন্তু পরিবেশটা অস্বস্তিকর করে তুলতে সে চাইল না।
”জ্যোতি চাকরি—বাকরিতে এবার ঢুকে পড়। খেলা তো চিরকাল থাকবে না, এই দরও তোর থাকবে না। বাকি জীবনটা টানবি কি করে? দেখছিস তো দিনকাল কেমন বদলে যাচ্ছে। কাগজে তোর পেছনে মিথ্যেমিথ্যি যে রকম লেগেছে…এসব জিনিস দশ বছর আগেও ছিল না, ভাবাই যেত না।”
”তখন প্লেয়ারদের এত টাকা দেয়া হত না বলেই নোংরামিটা ছিল না।
”হবে।” দাশুদা চিকেন পকৌড়া তুলল। ”আচ্ছা জ্যোতি তুই যে বলেছিস, সারথিতে তোর বিরুদ্ধে একটা চক্রান্ত অরবিন্দ মজুমদারের আমলেই তৈরি, তার গাছাড়া ভাবের জন্য…”
জ্যোতিকে হাত তুলতে দেখে দাশুদা থামল।
”আবার বলছি আমি বলিনি। বলেছিলাম, স্টার স্টাডেড টিমের এই হাল অরবিন্দদার শেষদিকে গাছাড়া ভাবের জন্য আর অফিসিয়ালদের জন্য হয়েছে। খুব কি ভুল বলেছি?”
”তোর কি মনে হয়েছে কখনো অরবিন্দদা আর পারছে না, সারথিকে ডোবাচ্ছে, এবার সরে যাওয়া উচিত? মনে হয়নি কি, টিমের একটা নতুন অ্যাপ্রোচ এবার দরকার, নতুন আইডিয়া নিয়ে সারথি খেলুক।”
”হ্যাঁ, মাঝে মাঝে মনে হতো।”
”কিন্তু অরবিন্দ মজুমদার থাকলে তা সম্ভব নয়। কিন্তু ওকে সরানও সম্ভব নয়।”
”তুমি ওকে সরে যেতে বলেছিলে?”
দাশুদা পিটপিট করে তাকিয়ে, মুখে ক্ষীণ হাসি।
”আমার কাছে এটা চেপে গেছলে।” জ্যোতি ঈষৎ অভিমান দেখাল।
”সব কথা কি বলা যায়? সারথির ভাল—মন্দ আমার কাছে প্রথম প্রায়রিটির ব্যাপার। সারথির জন্য এমন কোন কাজ নেই, তা যত খারাপই হোক, করতে না পারি!”
”সেজন্য তুমি আমাকে ছুরি মারতে পার?”
”যদি মনে হয় তোর জন্য সারথির ক্ষতি হচ্ছে…তা হলে…যদি মনে হয় তোকে সরিয়ে দিলে সারথির ভাল হবে…তা হলে…।”
দাশুদা গ্লাসটা মুখে তুলল। জ্যোতির মনে হল, কণ্ঠস্বর যতই লঘু হোক না, ‘তা হলে’ শব্দটায় ইস্পাত—ফলার তীক্ষ্নতা ছিল। সিরসির করে উঠেছে কলিজা। তার অদ্ভুত ধরনের অস্বস্তি লাগছে। সোফায় গা এলিয়ে দেওয়া, শান্ত মুখ, পাজামা—পাঞ্জাবি—পরা লোকটি, পরিশ্রমী, বহু টাকা রোজগেরে ব্যবসায়ী কিন্তু নিজের কোন অস্তিত্বই নেই! ফুটবল ক্লাবই ওর ধ্যান—জ্ঞান! অথচ ক্লাব থেকে একটা পয়সাও নেয় না।
”দাশুদা একটা কথা বলব?”
”বল।”
”ভোরবেলা অরবিন্দদার বাড়িতে গাড়ি নিয়ে গিয়ে তাকে আর বৌদিকে তুলে দেশের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এলে ওদের লোকলজ্জার হাত থেকে কি না বাঁচাতে। কিন্তু ব্যাপারটা তো এতদূর না—ও গড়াতে পারত, মানে কোর্ট পর্যন্ত যেতই না যদি সেই রাত্তিরেই থানা থেকে অরবিন্দদাকে বার করে আনা হত।”
”নিশ্চয়, কোর্টে কেস উঠতই না যদি একবার কেউ তখন আমায় জানাত। কিন্তু আমি তো জানলুম খবরের কাগজের রিপোর্ট পড়ে।”
”অত ভোরেই তুমি রিপোর্ট পড়ে গাড়ি নিয়ে ছুটে গেলে। তুমি তো অনেক দেরিতে ঘুম থেকে ওঠ জানি।”
”সেদিন অনেক রাতে জামশেদপুর থেকে ফিরেছিলুম, আর ঘুমোইনি। ভোরে কাগজ খুলে খবরটা পড়েই তো স্তম্ভিত। প্রথমেই মাথায় হিট করল, এ খবর পড়ে ওর বৌ, যে পঙ্গু দুর্বল, সে তো হার্টফেল করবে! তাই গাড়ি নিয়ে ছুটলাম।”
জ্যোতি লক্ষ্য করে যাচ্ছিল দাশুদার মুখ। প্রথমেই একটা চকিত ইতস্তত ভাব ফুটে উঠেছিল। তারপর স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যে কথাগুলো বললেও তার মনে হচ্ছিল দাশুদা বানিয়ে বলছে।
হঠাৎই তার মনে পড়ল, সেদিন সল্ট লেকে অরবিন্দদার ফ্ল্যাট থেকে এখানে এসে নীচে বাইকটা রাখার সময় দরোয়ানকে সে দাশুদার কথা জিজ্ঞাসা করেছিল। দরোয়ান জানিয়েছিল, দাশুদা গত রাত্তিরে এসে আবার বেরিয়ে গেছে গাড়িতে। এক রাত্তিরেই কি জামশেদপুর গিয়ে আবার সেই রাতের মধ্যে ফিরে আসা যায়? হয়তো যায়! কিন্তু দাশুদা যে মিথ্যা কথা বলেছে, সে বিষয়ে তার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কেন?
”আমিও খবরের কাগজ থেকে প্রথম জানলাম। আগে যদি জানতাম তা হলে থানা থেকে ছাড়াবার চেষ্টা করতাম।”
”নিশ্চয়, যে কেউ করত। জ্যোতি, আমি শুধু ভাবছি অরবিন্দ মজুমদার সেই রাতে থানা থেকে কাউকে, চঞ্চল বা কিরণ বা সন্তাোষদা কিংবা আমাকেও যদি একবার ফোন করত তা হলে ব্যাপারটা হাস—আপ করে দেওয়া যেত। পার্ক স্ট্রিট, হেস্টিংস, বৌবাজার কোন থানায় না আমার চেনা ও সি আছে? অত বড় নামী কোচ, তা ছাড়া অনেক পুলিসও তো ফুটবল নিয়ে মাতামাতি করে, ওকে যদি চিনত তা হলে ছেড়েই দিত। পরে শুনলাম সেদিন থানায় উনি নিজের নাম না বলে অন্য নাম বলেছিলেন। আর থানায় তখন ছিল ছোটবাবু, সে ফুটবল কেন কোন খেলা নিয়ে একদমই মাথা ঘামায় না তাই চেহারাও চিনতে পারেনি। ব্যাপারটা বড় স্যাড, বড় দুঃখের হয়ে রইল।”
”তুমি আর দেখা করেছ অরবিন্দদার সঙ্গে?”
”না। একদম অজ পাড়াগাঁ, সেই রূপনারায়ণ নদীর ধারে রাজপুর, যাওয়ার সময় আর পেলাম কোথায়।”
